কলকাতায় নন্দনে একটা সভা হয়েছিল দুদেশের সাহিত্যিক ও সাহিত্যকর্মের আদানপ্রদান নিয়ে। সেখানে আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু বলেই বসলেন, বাংলাদেশের বই আমদানি করতে তারা আগ্রহী নন, বরঞ্চ যেসব বই ওদেশে চলবে বলে মনে করবেন, তারা তার ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশে আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের জাল সংস্করণ যে বাংলাদেশে প্রকাশিত হচ্ছে এবং আমরা কিছু করছি না–এ-বিষয়েও তারা উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
আশরাফ সিদ্দিকী সেবারে পরিচয় করিয়ে দিলেন জগদীশ বসাকের সঙ্গে। ঢাকার সন্তান, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ বিল্ডিংয়ে তার বইয়ের দোকান, স্ত্রী ড. শীলা বসাক-লোকসংস্কৃতি-বিশেষজ্ঞ। পরে জগদীশ ঢাকায় আসায় তার সঙ্গে যোগাযোগটা ঝালিয়ে নেওয়া হয়। তারপরে এমনি হলো যে, তার বাড়িই হয়ে গেল আমার কলকাতার ঠিকানা।
ডিসেম্বরে আমি গেলাম হায়দরাবাদে–একটি মার্কিন সংগঠনের উদযোগে সাহিত্যের ইতিহাস-বিষয়ক এক সেমিনারে। সেমিনারের পরিচালক শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ববরিনস্কয় অধ্যাপক শেলডন পোলক। শেলি আর আমি ছাড়া আর সকলেই ভারতীয়, তবে সংখ্যায় অল্প। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সাহিত্য অকাঁদেমির সম্পাদক ইন্দ্রনাথ চৌধুরী। আমি হায়দরাবাদে পৌঁছে রাত জেগে প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেটা ভালো লেগেছিল শেলি ও ইন্দ্রনাথের এবং আরো কারো কারো।
হায়দরাবাদে সালার জঙ্গ জাদুঘর দেখবার মতো। নবাবের প্রাসাদের এক কোণে আলোছায়ায় ইতিহাস-বর্ণনাও খুব উপভোগ্য।
হায়দরাবাদ যাওয়ার পথে বেবী, শুচি ও আনন্দকে কলকাতায় জগদীশের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। স্ত্রী শীলা ও মেয়ে মিলিকে সঙ্গে নিয়ে জগদীশ। বেবীদের পুরী বেড়াতে নিয়ে গেল। তারাও পুরী-ভ্রমণ খুব উপভোগ করেছিল।
৩২.
ভারত সরকারের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনসটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর পরিচালক নিযুক্ত হন ড. বরুণ দে। ইনসটিটিউট-প্রতিষ্ঠার এবং বরুণ দের নিয়োগের পেছনে প্রবল সমর্থন ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল অধ্যাপক সৈয়দ নূরুল হাসানের। ইনসটিটিউটের দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে বরুণ নিয়ে আসেন রণবীর সমাদ্দারকে। রণবীর দুর্দান্ত ছাত্র ছিল, অত্যন্ত ভালো বক্তা, নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে কারাবাসও করে দীর্ঘকাল। কয়েকজন তরুণ গবেষক দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া নিয়ে সেখানে গবেষণাকর্মেও নিযুক্ত হয়।
১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে আমি যখন এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তৃতা দিতে কলকাতায় যাই, তখনি বরুণ দে প্রস্তাব করেন, আমি যেন দু মাসের জন্যে তাঁদের ইনসটিটিউটে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। থেকে আমি এক বছরের সাবাটিকাল লিভ নিই এবং ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ওই ইনসটিটিউটের প্রথম ভিজিটিং ফেলোর দায়িত্বপালন করি। আমার থাকার ব্যবস্থা হয় গোল পার্কে রামকৃষ্ণ মিশনের ইনসটিটিউট অফ কালচারের অতিথি-ভবনে এবং বসার ব্যবস্থা হয় বেহালায় মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটের দপ্তরে। আমাদের রাজনীতিবিদ অজয় রায়ের কন্যা পর্ণা তখন ওই অতিথি-ভবনে থেকে লেখাপড়া করছিল। তার সুবাদে আমি একদল তরুণ ছেলেমেয়ের কাকা হয়ে মহানন্দে থাকছিলাম। অতিথি-ভবনে খাওয়ার সময়ে আমার সঙ্গীর অভাব হতো না। একটি চমকপ্রদ ঘটনাও ঘটলো একদিন। অতিথি-ভবনের এক কর্মচারী আমাকে বললেন, আমাদের ল্যাংগুয়েজ প্রোগ্রামের হেড সরকার সাহেব আপনার খোঁজ করছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করার সময় কি আপনার হবে?’ ‘সরকার সাহেব কে?’ ‘আজ্ঞে, বি এন সরকার। চিনতে পারলাম না, তবু গেলাম। গিয়ে দেখি, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল বি এন সরকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন–প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। তাকে বললাম, আপনি যে জেনারেল সরকার, তা ওরা একবারও বললো না, সুতরাং আমি বুঝতেই পারিনি। তিনি মৃদু হেসে বললেন, সে তো গতজীবনের কথা। সামান্যত যা বললেন, তাতে বোঝা গেল, ব্যক্তিগত জীবনে তার ওপর দিয়ে বড়োরকম ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। সেই দুঃখশোক নিয়ে একরকম বৈরাগ্য গ্রহণ করেছিলেন, তারপর আবার মূলধারায় ফিরে এসে স্বেচ্ছাসেবা দিচ্ছেন এখানে বিদেশি ভাষাশিক্ষার কর্মসূচি দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়ে। ১৯৭১ সালে তিনি যাদের চিনতেন, তাঁদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। সুতরাং মাত্র দু-একজনের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিবিষয়ে কি সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতে চাইলেন না।
মওলানা আজাদ ইনসটিটিউট থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে চারটি লিখিত বক্তৃতা দিতে বলা হয়েছিল আমাকে। কিছু মালমশলা আমি সঙ্গে নিয়ে যাই–তার বেশ খানিকটা সংগ্রহ করতে আমাকে সাহায্য করেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের গোলাম মুস্তাফা। বাকিটা সংগ্রহ করি মওলানা
আজাদ ইনসটিটিউট, রামকৃষ্ণ মিশন ইনসটিটিউট এবং কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনের গ্রন্থাগার থেকে। শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিক ছিলেন বেবীর সহপাঠী নূরুননাহার–তিনি যথাসাধ্য সহযোগিতা করেন। তার স্বামী নজীবর রহমান ছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যাপক এবং তারও আগে আমার প্রথম জীবনের ছাত্র। নজীবর রহমান তখন অবসর নিয়ে কলকাতায় থাকেন–তাঁদের বাড়িতেও একদিন যাওয়া হয়।
