পরে শ্রীলঙ্কায় যখনই গেছি, নিশ্চিত করে নিয়েছি, যাতে মাদ্রাজ হয়ে যেতে না হয়।
শ্রীলঙ্কায় সেবারে যে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেকথা বলা যাক।
আমরা দল বেঁধে সৌজন্য-সাক্ষাৎকার করতে গিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টের স্পিকারের সঙ্গে। তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তাঁর জামাতা তখন বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার হাই কমিশনার। আমরা বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে স্পিকার একটু বাড়তি সমাদর করলেন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, শ্রীলঙ্কার জনগণকে প্রথাগতভাবে তিনভাগে ভাগ করা হয়–সিংহলা, তামিল ও মুসলমান। দুটি গোষ্ঠীর পরিচয় নৃতাত্ত্বিক, অপরটির ধর্মীয় কেন, তার সদুত্তর পেলাম না। দেশব্যাপী সিংহলা-তামিলের বিরোধের পটভূমিকায় সিংহলা মুসলমান ও তামিল মুসলমান একযোগে তৃতীয় একটি পক্ষ, তা আশ্চর্যের বিষয়। পরে জানলাম, এ-কারণে অনেকে, বিশেষ করে সিংহলারা, মুসলমানদের সুবিধাবাদী বলে গণ্য করে। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তখন সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। এ-অবস্থায়ও সিংহলাদের কারো কারো মত এই যে, সলোমন বন্দরনায়েকের সরকার যদি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চাপের কাছে অতটা নতিস্বীকার না করতেন, অর্থাৎ বৌদ্ধধর্ম ও সিংহলি ভাষার অতটা পৃষ্ঠপোষকতা না করতেন, তাহলে হয়ত তামিলদের সঙ্গে সিংহলাদের দূরত্ব এই পর্যায়ে পৌঁছোতো না। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সমর্থন নিয়ে সলোমন বন্দরনায়েকে ক্ষমতায় এসেছিলেন বটে, তবে ভিক্ষুদের একদেশদর্শিতার সঙ্গে পেরে ওঠাও সম্ভবপর ছিল না তার। পক্ষে। পরিণামে তো বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো কয়েক বছরের মধ্যে।
সলোমনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন–পৃথিবীর প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো এক দফা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, কয়েক দফা বিরোদী দলীয় নেত্রী। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন প্রেমাদাসার কাছে। আপসোর সম্মেলনে আগত সকল প্রতিনিধিকে তিনি মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করবেন পার্লামেন্টের রেস্টুরেন্টে। আমরা যথাসময়ে সেখানে পৌঁছে গেছি, কিন্তু শ্রীমাভো আসতে পারেননি–তার শরীর ভালো নেই। তার হয়ে আমন্ত্রণকর্তার ভূমিকা পালন। করলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। ভদ্রলোক বেশ হাসিখুশি ও লম্বা-চওড়া। বললেন, আমার নাম রানাতুঙ্গা। আমার ছেলে অর্জুন ক্রিকেট খেলে–আপনারা অনেকে হয়তো তাকে চিনবেন। মিসেস বন্দরনায়েকের শরীর একটু খারাপ, তাই তিনি আসতে পারেননি। তিনি আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। খাওয়াদাওয়ার পরে আপনারা যদি তাঁর বাড়ি যেতে সম্মত হন, তাহলে তিনি আপনাদের সঙ্গে কফি খেতে পারেন।
বেশির ভাগ অতিথি এই কষ্ট স্বীকার করতে চাইলেন না। আমরা কয়েকজন। মাত্র গেলাম।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের বাড়ি প্রাসাদোপম নয়, বরঞ্চ প্রত্যাশার তুলনায় ছোটোই বলা যেতে পারে। ড্রইং রুমটি সুসজ্জিত। তাতে শোভা পাচ্ছে সলোমন ও শ্রীমাভোর একটি ছবি এবং ইন্দিরা গান্ধির স্বাক্ষরযুক্ত একটি প্রতিকৃতি। আমরা ছবি দেখতে দেখতে শ্রীমাভো দেখা দিলেন। তার বয়স তখন ৭৭/৭৮। রাজনীতিতে থাকলেও সক্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছে–কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজনৈতিক মঞ্চে স্থান করে নিয়েছেন।
কথায় কথায় শ্রীমাভো বললেন, সলোমন একবার কলকাতায় গিয়েছিল লুকিয়ে। বোধহয় ১৯৪৬ সালে। কলকাতায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কোনো একটি সভায় সে উপস্থিত ছিল নেহরুর আমন্ত্রণে–নেহরুর সঙ্গে তার খুব সখ্য ছিল।
সেদিন তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রতি খুব ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বললেন, বিশ্বব্যাংক কৃষিতে ভর্তুকি দিতে নিষেধ করছে আমাদের। এর ফল কী হবে জানেন? শ্রীলঙ্কায় অন্তত অনেকে চাষবাস ছেড়ে ছোটোখাটো ব্যবসা ধরবে বা দোকান খুলবে। তাতে তারা টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু কৃষি-উৎপাদন অনেকখানি ব্যাহত হবে। বিশ্বব্যাংক এই নীতি প্রয়োগ করবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়। সবাই মিলে যদি তা প্রতিরোধ না করা যায় তাহলে আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন মিলিয়ে যাবে।
ওই বয়সেও শ্রীমাভোর কথাবার্তা স্পষ্ট এবং সৌজন্যবোধ অসাধারণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সেটা যথেষ্ট প্রীতিকর না হওয়ার সম্ভাবনায় আর তুললাম না।
৩১.
বাংলাদেশের এক সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের নেতা হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলাম ১৯৯৩ সালের মার্চে–সেকথাটাও বলা হয়নি। প্রতিনিধিদলে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মনসুর মুসা, সেলিনা হোসেন, আরো অনেকে। ড. আশরাফ সিদ্দিকীও ছিলেন–প্রতিনিধিদলের নেতা হওয়া উচিত ছিল তাঁরই, কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় মনসুর মুসা আমার নাম প্রস্তাব করে ফেলায় আশরাফ সিদ্দিকী তা সমর্থন করে বসলেন। আমিও মজা পেলাম। তখন আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঝুলছে। এক মন্ত্রণালয় মামলা করছে, আরেক মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি করে আমাকে বিদেশ পাঠাচ্ছে। সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগমের উদারতার কথা স্বীকার করতে হয়।
