এই সভা থেকে ইউনেসকো এবং ইউনেসকোর সদস্য-রাষ্ট্রসমূহের কাছে অনেকগুলো প্রস্তাব গিয়েছিল। তাতে কোনো কাজ হয়েছিল বলে আমার মনে হয় না।
এই সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধগুলো পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল : Baidyanath Saraswati (ed), Interface of Cultural Identity and Development (New Delhi, 1996).
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিল সরকারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। সে এখন এশিয়াটিক সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ। তারই উদ্যোগে এশিয়াটিক সোসাইটি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইন্দিরা গান্ধি স্মারক বক্তৃতা দিতে। সোসাইটি জানিয়েছে, এই স্মারক বক্তৃতা প্রবর্তিত হয় ১৯৮৫ সালে। এ পর্যন্ত যারা বক্তৃতা দিয়েছেন, তাঁরা হলেন, গোঁয়ার লেফটেন্যান্ট-গভর্নর ড. গোপাল সিং, বিচারপতি মুহম্মদ হিদায়েতউল্লাহ, সাহিত্যিক উমাশঙ্কর যোশী, রাজনীতিবিদ হীরেন মুখার্জি, সাংসদ ড. কিরীট যোশী, সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. শঙ্করদয়াল শর্মা। এবারে আমাকে অনুরোধ করা হচ্ছে কালচারাল প্লুরালিজম’ সম্পর্কে বলতে। প্রলুব্ধ হলাম, ভীতও হলাম। শেষ অবধি দুরুদুরু বক্ষে লেখা। নিয়ে হাজির হলাম। ১৯৯৩ সালের ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর দুদিন বক্তৃতা দিলাম। এবং যথেষ্ট প্রশংসা পেলাম।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বক্তৃতাটি ছেপে বের হলো। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভাষণটি পুনর্মুদ্রিত হলো।
৩০.
নভেম্বরের শেষে শ্রীলঙ্কায় গেলাম আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের এক সম্মেলনে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আছি আমরা তিনজন। ডা. এ এইচ সাইদুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. আবদুল গফুর ও আমি। অন্য কোনো কাজে আমি আগেই কলকাতায় পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে বাকি দুজনের সঙ্গে মাদ্রাজ হয়ে কলম্বো পৌঁছলাম। গিয়ে বুঝলাম, এটা ঠিক পথ নয়, এ-পথে বড়ো কষ্ট। মাদ্রাজ বিমানবন্দরে অপেক্ষা করা মানে ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া। সে পরীক্ষায় প্রায় অসফল হই আর কী!
তবে কলম্বো পৌঁছোবার পর সব কষ্ট দূর হয়ে গেল। আয়োজকদের ব্যবস্থা চমৎকার। অনেক চেনাজানা মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলন। নতুন পরিচয় যাদের সঙ্গে হলো, তাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের ড. হারুন রশীদ এবং শ্রীলঙ্কার গামিনি কোরিয়া ও সুশীল সিরিবর্ধনা উল্লেখযোগ্য। ডা. হারুন রশীদ মনোচিকিৎসক। পাকিস্তানে নিতান্ত নিম্নশ্রেণির মানুষ নানাধরনের উৎপীড়নের শিকার হয়। হারুন তাদের চিকিৎসা করেন এবং এই ধরনের অজানা উৎপীড়ন সম্পর্কে অনেক তথ্য প্রকাশ করেন। গামিনি শ্রীলঙ্কায় খুব শ্রদ্ধেয়। সুশীল অকসফোর্ডে ডি ফিল করে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়েছিল। এতে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। তাকে এক সময়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়। পরে আবার কারাগার থেকে বের করে শ্রীলঙ্কার স্কুল-শিক্ষাব্যবস্থার কিছু সংস্কারের কাজেও তাকে লাগানো হয়।
আমাদের সম্মেলনের মূল আয়োজক এ এম মারলিন খুব মজার মানুষ। এক অবসরে তিনি আমাদের অনেককে ক্যান্ডিতে নিয়ে গেলেন তাঁদের পারিবারিক আবাসে। সেখানে আমরা খাইদাই, ক্যান্ডি নাচ দেখি। মারলিনদের কয়েকপুরুষ মূল্যবান পাথরের ব্যবসা করেন। অতিথিদের অনুরোধে খাওয়াদাওয়ার শেষে কর্মচারীদের ডেকে দোকান খোলান মারলিন। অতিথিদের অনেকেই দামি পাথর কেনেন–তবে এটা মারলিনের উদ্দেশ্য ছিল না, তা হলফ করে বলতে পারি।
কলম্বোতে তখন শাব্বির আহমদ চৌধুরী থাকে। সে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী। একদিন শিক্ষকতা ছেড়ে সে চলে আসে শ্রীলঙ্কায়–ব্যবসায়ে অর্থ নিয়োগ করে এখানে রয়ে যায়। আমাদের আগমনবার্তা তাকে দিই। সে বলে, আপনাদের শ্রীলঙ্কা দেখাতে নিয়ে যাবো–দুদিন লাগবে। সম্মেলনের শেষে হোটেল ছেড়ে আমরা তার বাড়িতে উঠি। সে আমাকে রাত্রিবাস করতে পাঠায় আরেক স্বদেশি ড. আজহারুল হকের বাড়িতে, সেটা আরো আরামদায়ক বলে। আজহার পরে দেশে ফিরে ওয়াসার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।
আমাদের শ্রীলঙ্কা ঘোরাতে হবে, অতএব শাব্বির তার গাড়ি বেচে বড়ো ধরনের জিপ কিনে ফেলে। আমরা তিনজন ছাড়া সে সঙ্গে নেয় এক শ্রীলঙ্কানকে। তিনি মাগরেব ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। শাব্বিরের ধারণা, এই গৃহযুদ্ধরত দেশে দূরে যেতে হলে একজন দেশীয় লোক থাকলে সুবিধে হবে।
আমরা পশ্চিম উপকূল ধরে উত্তরে যেতে থাকি। এক সময়ে নিরাপত্তাবাহিনী আর আমাদের যেতে দেয় না। আমরা পুবদিকে ঘুরি। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন রাজধানী। অনুরাধাপুরে রাত্রিযাপন করি। তারপর ক্যান্ডির কাছ ঘেঁষে দেশের মধ্যভাগ ধরে ফিরে আসি কলম্বোয়। অত্যন্ত আরামদায়ক, উপভোগ্য, শিক্ষাদায়ক ভ্রমণ।
তারপর মাদ্রাজ হয়ে ফেরা। যে-ফ্লাইটে আমরা মাদ্রাজ থেকে কলকাতা ফিরি, সেটা নানা বিমানবন্দরে থামতে থামতে আসে। অনেক সময় লাগে। মাঝে একজন যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশের মানুষ, মাদ্রাজে চিকিৎসা নিয়ে কলকাতা হয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। উড্ডয়নকালে উচ্চতায় তার অসুবিধে হয়। উড়োজাহাজের ক্রুরা যাত্রীদের মধ্যে ডাক্তার খোঁজ করেন। একজনকে বোধহয় পাওয়া যায়। তিনি যান রোগীর পাশে, তবে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারেন বলে মনে হয় না। পরের বিমানবন্দরে তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর মালপত্র খুঁজে বের। করে প্রত্যর্পণ করতে অনেক সময় লাগে।
