তবে এরই প্রতিক্রিয়ায় বেরিয়ে এসেছিল শামসুর রাহমানের ‘সুধাংশু যাবে নার মতো অনবদ্য কবিতা এবং হাসনাত আবদুল হাইয়ের বাবুরের প্রার্থনা’র মতো গল্প। শফি আহমদ ও পূরবী বসুর সম্পাদনায় প্রকাশ পায় প্রবন্ধ-সংকলন এখনো গেল না আঁধার (ঢাকা, ১৯৯২) এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের রচনা নিয়ে মফিদুল হক ও অরুণ সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ধ্বংসস্তূপে আলো/বাবরি মসজিদ-রামমন্দির বিবাদ (ঢাকা ও কলকাতা, ১৯৯৩)। বহু অকীর্তির মধ্যেও এমনি করে ঘোষিত হয় মানুষের বিবেকের কণ্ঠস্বর, এই এক সান্ত্বনা। তসলিমা নাসরিনের লজ্জাও লেখা হয়েছিল এ সময়ে। বিষয়বস্তুর সাহসী উপস্থাপনা সত্ত্বেও উপন্যাস হিসেবে তা সার্থকতা লাভ করেনি, তবে নানাকারণে বইটি ব্যাপক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
২৮.
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে–ড. কামাল হোসেনের এই মন্তব্য শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের কিছুসংখ্যক কর্মী প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কামাল হোসেনের কিছু কিছু মন্তব্যে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনাও প্রকাশ পায়। অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে, কামালের পক্ষে আওয়ামী লীগে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগের অনেকের সঙ্গে কামাল হোসেন পরামর্শ করেন। তাঁরা অনেকে তাকে বিকল্প পথ সন্ধান করতে বলেন। তারা কামালকে এমন ধারণা দেন যে, তিনি কোনো বিকল্প সংগঠন গড়ে তুললে তারাও তাতে যোগ দেবেন। তেমন ইচ্ছে হয়তো এঁদের অনেকের আদৌ ছিল না, কামাল আওয়ামী লীগ ছাড়লে দলের মধ্যে নিজেদের গুরুত্ব আরো বাড়বে, এমন কথা হয়তো তাদের মনে ছিল। কামাল ধরে নেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে তার বড়োরকম সমর্থন আছে।
কামাল আমাকে যা বলেন, তাতে সেই মুহূর্তে তার রাজনৈতিক দল গড়ার অভিপ্রায় আছে বলে আমার মনে হয়নি। তিনি নাগরিক সমাজের একটি মঞ্চের কথা বলছিলেন। যারা রাজনীতি করেন, তাঁদের চেয়ে যারা রাজনীতি করেন না, এমন মানুষের কাছে তিনি বেশি যাচ্ছিলেন। যেমন, শিক্ষকদের মধ্যে খান সারওয়ার মুরশিদ, ফজলুল হালিম চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। এক পর্যায়ে কামালের কয়েকজন সহকর্মী–কম্যান্ডার আবদুর রউফ, গোলাম মরতুজা, শাহেদ আলী–আমাকে অনুরোধ করেন প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক ফোরামে যোগ দিতে। আমার অনিচ্ছার কথা তাদের জানালে কামাল একদিন এ-বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর চেম্বারে বসে প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা হয়। আমি কামালকে বলি, তিনি রাজনীতিবিদ, আজ যে-অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলছেন, কাল তা রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত করতে তিনি ইচ্ছুক হবেন। তাঁর সহকর্মীরা সেদিকে তাঁকে টানবেন। যারা তাকে আওয়ামী লীগে চান না, তাঁরাও তাঁকে সেপথে ঠেলবেন। গণতান্ত্রিক ফোরাম রাজনৈতিক দল হলে তাতে আমি থাকতে পিরবো না। এখন যোগ দিয়ে পরে বেরিয়ে আসার চেয়ে বরঞ্চ গোড়া থেকেই আমার পক্ষে বাইরে থাকা ভালো। বাইরে থেকে আমার পক্ষে যতটুকু সাধ্য তার সঙ্গে সহযোগিতা করবো।
১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসে গণতান্ত্রিক ফোরামের উদ্বোধন হলো। সে উপলক্ষে বড়ো সমাবেশ ঘটলো ঢাকায়। সুফিয়া কামাল, মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিশিষ্ট আরো কয়েকজনের সঙ্গে আমিও সে-সভায় কিছু বললাম। ধুমধাম করে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো।
পরের মাসে আওয়ামী লীগ থেকে ড. কামাল হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২৯.
দিল্লির ইন্দিরা গান্ধি ন্যাশনাল সেন্টার ফর দি আর্টস থেকে আমন্ত্রণ এলো, ইউনেসকোর সহায়তায় দিল্লিতে তারা ইন্টারফেস অফ কালচারাল আইডেনটিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সভা করছেন ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে, তাতে প্রবন্ধ পড়তে হবে। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সেমিনারে উন্নয়ন-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই একটা প্রবন্ধ দাঁড় করালাম, নামটা ভারীই দিলাম, ইউনিভার্সালিটি, ইউনিফর্মিটি অ্যান্ড স্পেসিফিসিটি : এ ভিউ ফ্রম এ ডেভেলপিং কান্ট্রি’। এপ্রিলের ১৯ থেকে ২৩ পর্যন্ত আইজিএনসিএর ক্যাম্পাসেই সেমিনার হলো। আমি প্রবন্ধ পড়লাম, একটা অধিবেশনে সভাপতিত্বও করলাম। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, নেপাল, মঙ্গোলিয়া ও শ্রীলঙ্কা থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন। ভারতের তো অনেকে ছিলেন–তাঁদের মধ্যে কপিলা বাৎস্যায়নের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ছিল একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তার যেমন পাণ্ডিত্য, তেমনি বলবার ক্ষমতা। আমার সঙ্গে কিছু কিছু বাংলাও বললেন। বি এন [বৈদ্যনাথ সরস্বতী–সবটা আয়োজনের দায়িত্ব যার কাঁধে–তিনি সদাশিব মানুষ, খুবই পণ্ডিত, কিন্তু বিনয়ের আবরণে তা ঢেকে রাখেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন রবীন্দ্র জৈন, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ আর মোমিন এবং নর্থ-ইস্ট হিল ইউনিভার্সিটি থেকে মৃণাল মিরি। ইউনেসকোর প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন ফ্রানসিস চাইল্ড–তাঁর সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। প্যারিসে গেলে যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি, এমন অনুরোধ তিনি করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে অনুরোধ রাখতে পারিনি। আমার সঙ্গে ভালো আলাপ হয় তুরস্কের প্রবীণ নৃতত্ত্ববিদ বোজকুর্ট গুঁজেন্চ এবং ইরানের নবীন গবেষক ফাতেমা ফারাহানির। ফাতেমা ইরানের সরকার অনুমোদিত পোশাকে আচ্ছাদিত থাকতো। আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই পোশাক সে স্বেচ্ছায় পরেছে, না তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে তার সরাসরি জবাব দেয়নি। বলেছিল, তার এমন পোশাক পরার ফলে সবার যদি কল্যাণ হয়, তবে সেটা অনেক বড়ো পাওয়া হবে।
