বাংলাদেশ বিমানের আঞ্চলিক ম্যানেজার আসেন। আমরা ব্যাংকক হয়ে ঢাকা ফিরব। সেই যাত্রার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে দেন। দশ দিন সিঙ্গাপুর বাসের। পর আমরা ব্যাংকক পৌঁছাই।
সার বলেন, একটা দেশকে জানতে হলে যেতে হয় তার কাঁচাবাজারে আর বইয়ের দোকানে। কাঁচাবাজারে যেতে আমার উৎসাহের অভাব। পথের ধারে ফলের দোকান, তরকারির দোকান অজস্র। তারই কয়েকটায় সার থামেন, কিছু কেনাকাটা করেন। ঢাকায়ও কিছু ফলমূল আনবেন, সে-ব্যবস্থা হয়। বইয়ের দোকানে যাই আমরা। কিছু বই কিনি, নাড়াচাড়া করি তার চেয়ে বেশি। সেখানে অনেক সময় কাটে।
রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময়ে একবার সার বললেন, আপনার যা পছন্দ, তা অর্ডার দেন। আমি একটু অবাক হই। আমার পছন্দসই বলেই তো বিফস্টেক আনতে বলেছি। পরে বুঝি, খাদ্য নয়, উনি পানীয়ের কথা বলছেন। গুরুবাক্য পালনে আমি তৎক্ষণাৎ তৎপর হই।
তিন দিনের মাথায় ঢাকায় ফেরা। বিমানে। আমরা বেশ নির্ভার। স্বদেশি যাত্রীদের হাতে ব্যাগ আর ব্যাগ। একজন দুহাতে ব্যাগ নিয়েছেন বলে বোর্ডিং কার্ডটা দাঁত দিয়ে ধরেছেন। বিমানের যিনি বোর্ডিং কার্ড নিচ্ছেন, তিনি হাত বাড়াতেই যাত্রী তাঁর মুখটা এগিয়ে দিলেন। উদ্ভাবনী প্রতিভা আর কাকে বলে!
২৭.
বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতে একটা সংকট ঘনিয়ে আসছিল অনেকদিন ধরে। হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করে আসছিলেন যে, অযোধ্যায়–রামের জন্মভূমিতে-মন্দির ভেঙে ওই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, এখন তারা মসজিদ ভেঙে মন্দির পুনর্নির্মাণ করবেন। ভারতের অনেক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রবন্ধ লিখে ও বিবৃতি দিয়ে বলেন যে, এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এবং স্বয়ং রামেরই জন্ম কবির মনোভূমিতে। তাতে হিন্দুত্ববাদীদের ক্রোধ কেবল বৃদ্ধি পায় এবং জনশ্রুতি, লোকবিশ্বাস ও ইতিহাস একাকার হয়ে যায়। সারা ভারত থেকে স্বেচ্ছাসেবক অযোধ্যায় জড়ো হতে থাকে ধর্মযুদ্ধ করতে। ভারত সরকারের এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর তারা বাবরি মসজিদের আংশিক ধ্বংসসাধন করে।
বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে–এমন মিথ্যা খবরের ভিত্তিতে ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-নির্যাতন ও মন্দির-ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছিল, সেকথা আগে বলেছি। সে-মসজিদ যখন সত্যিই ভাঙলো, বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া হলো তীব্র এবং সবটা ক্ষোভ গিয়ে পড়ল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসহায় ব্যক্তিদের এবং তাদের উপাসনালয়ের ওপর। বীর চট্টলায় বড়োরকম দুর্যোগ ঘটে, রাজধানী ঢাকাও পিছিয়ে থাকে না। বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র নিন্দাজ্ঞাপন করে, কিন্তু নিজের নাগরিকদের রক্ষার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় না। সরকারের বাইরে অনেক রাজনৈতিক দল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তি এই নির্যাতন রোধ করতে এগিয়ে আসে বটে, কিন্তু তা ঘটে অনেক অসংগঠিতভাবে এবং কম শক্তি নিয়ে। অন্যদিকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ করতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় নামধারী সংগঠনগুলি যেসব কর্মসূচি দেয়, তা ছিল বেশ জঙ্গি। সাধুভাষায় যাকে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি বলে, এতে তাই হয়। শুনেছি, খুলনার ডেপুটি কমিশনার তখন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দলের নেতাদের ডেকে বলেছিলেন, আপনারা অনুগ্রহ করে প্রতিবাদ মিছিল করবেন না, শান্তি মিছিলও করবেন না, দুবৃত্তদের আমি সামলাতে পারবো-আপনারা পথে নামলে আমার কাজ অনেক কঠিন হয়ে যাবে। সে কর্মকর্তা সেখানে সত্যি সত্যি পরিস্থিতি সামাল দেন। সরকারের ভাবটা ছিল এমন যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, তাদের রক্ষার ভার আওয়ামী লীগই নিক। আওয়ামী লীগ মনে করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের, সরকার সংখ্যালঘু-নির্যাতন বন্ধ করুক, নইলে ব্যর্থতার দায়ভার তার ওপরেই বর্তাবে। মাঝে পড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন অবর্ণনীয় কষ্ট ও অসম্মানের সম্মুখীন হয়। ক্ষেত্রবিশেষে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানেরাও আক্রান্ত হয় এবং বৌদ্ধমন্দির ও গির্জায়ও হামলা চলে। যেখানে আমলারা ব্যক্তিগতভাবে দাঙ্গা বন্ধ করতে উদ্যোগী হন, সেখানে কিছুটা কাজ হয়।
ডিসেম্বরের ৭ তারিখে ঢাকায় আমরা নিষ্ফল দৌড়াদৌড়ি করেছি। ৮ তারিখেও কোনো শান্তি মিছিল করা সম্ভব হয়নি, সংগঠিত প্রতিরোধও নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা দাঙ্গাপ্রতিরোধে তেমন ভূমিকা এবার পালন করেনি–এ ছিল আমার বড়োরকম দুঃখ। ৯ তারিখে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে শান্তি সমাবেশ ও মিছিল করা হয়। সেদিন বিএনপিও একটা লোকদেখানো মিছিল করে। ১০ তারিখ থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। এ-কয়দিনে দেশের অন্যান্য জায়গায়ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ক্ষুব্ধ হয়ে আমি ভোরের কাগজে একটি প্রবন্ধ লিখি ‘সাম্প্রদায়িকতার প্রত্যাবর্তন’ নামে, তাতে কারো কোনো লাভ হয় না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বিজয়মেলা-উপলক্ষে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রচারণা চালায়, কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছে।
যেসব মূল্যবোধের জন্যে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া, তার পরাজয়ের গ্লানি বুকে বড়ো বাজে।
