আন্দোলন থেকে আমিও খানিকটা সরে আছি। আমি বলেছিলাম, আমরা গোলাম আযমের বিচার চাইবো, কিন্তু কোনো শাস্তি (যেমন, ফাঁসি) নির্দিষ্ট করে দাবি করবো না। শাস্তি দেবেন সাংবিধানিক আদালত, আমরা তা মেনে নেবো। আমার বক্তব্যের প্রতি তেমন সমর্থন মেলেনি। তবে সমন্বয় কমিটির জনসভা প্রভৃতিতে আমি তারপরও উপস্থিত থেকেছি। সুফিয়া কামালকে প্রধান করে যে তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়, তার রিপোর্ট প্রদানের সময়েও আমি জনসমক্ষে হাজির ছিলাম।
একটি কাকতালীয় ঘটনা এই যে, গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার অব্যবহিত পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাহানারা ইমামের মৃত্যু হয়। মাঝখানে দিন চারেকের ব্যবধান ছিল, তখন তিনি সম্পূর্ণ চেতনও ছিলেন না। তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনতে কয়েকদিন সময় লাগে। তার লাশ গ্রহণ করতে আমরা বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম, বহুসংখ্যক মানুষও সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। ১৯৯৪ সালের ৫ জুলাই তিনি ঢাকায় সমাহিত হন।
২৬.
একটু আগের কথায় ফিরে যাই। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে আবুল খায়ের লিটু একদিন জানালো যে, চিকিৎসার জন্যে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে নেওয়া। দরকার সিঙ্গাপুরে, কিন্তু তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, আমাকে সঙ্গে যেতে হবে। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, লিটুর বুঝতে কোনো ভুল হয়নি। উপরন্তু সারের ইচ্ছে, আমিও যেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করিয়ে আসি।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে যাত্রা। কলকাতায় যাত্রাবিরতি। সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে নেমে ভিসা সংগ্রহ। তারপর হলিডে ইনে ওঠা। সেখানে লিটু আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। সে অবশ্য ফিরে আসবে আগে। সারুকে সামলানো হবে আমার কাজ।
রাজ্জাক সাহেবের চিকিৎসকেরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে উপদেশ দিলেন। আমি এক অর্শ-বিশারদের শরণাপন্ন হলাম। আমার হৃদয়ঘটিত কাহিনি শুনে তিনি বললেন, অস্ত্রোপচারের আগে তাহলে হৃদ্রোগ-বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সার বললেন, ঝামেলা বাড়িয়ে কী হবে! আপনিও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান।
আমরা দুজনেই গ্লেনইগলস হাসপাতালে ভর্তি হলাম। সার আর আমার কেবিন এক সারিতে, তবে কয়েকটা কেবিনের ব্যবধানে। ব্যবস্থা অতি উত্তম।
সেদিন বিকেলে এক নার্স এসে আমাকে বললেন, তোমার বন্ধু, মানে তোমার সঙ্গী, তিনি কি ইংরেজি জানেন?
নার্সকে সারের পরিচয় দেওয়া বাহুল্য। বললাম, জানেন বইকি!
তা শুনে তিনি মুখ আরো বেজার করে বললেন, আমি তাকে ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে বলতে গিয়েছিলাম। তিনি হা-না কিছুই বললেন না। কথা শুনলেন কি না, বুঝলেন কি না, কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। তুমি কি অনুগ্রহ করে তাকে এই কথাগুলো বুঝিয়ে বলবে?–বলে সে ওষুধসংক্রান্ত একটা ফিরিস্তি দিয়ে গেল।
সারের কেবিনে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সার, নার্স আপনাকে ওষুধের বিষয়ে কী বলতে এসেছিল, শুনেছেন কি?
তিনি বললেন, ‘হ।’
‘তা আপনি তার কথার জবাব দেন নি কেন?’
‘হে বেডি তো যা কওনের কইয়া গেল। আমারে তো কিছু জিগগাস করে নাই। আমি কী কমু?’
‘একটা হ্যাঁ-না বলতে পারতেন।’
‘তার যা কওনের কইয়া গ্যাছে। আমি শুনছি। তার লগে তো আমার গল্প করার কথা নাই।’
আমি আর কী বলব!
সারের নানারকম পরীক্ষা চলতে থাকল।
আমার ইসিজি ইত্যাদি হলো। স্ট্রেস টেস্ট দেখে ডাক্তার খুশি হলেন না। বললেন, অ্যানজিওগ্রাম করতে হবে।
আমি রাজি হলাম না।
ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে সারের অবস্থা জানতে লিটু ফোন করেছে। সার তাঁকে আমার সংবাদ দিয়েছেন। সে ফোনে আমাকে বললো, ডাক্তার যা পরীক্ষা করতে চায়, আপনি তা করিয়ে আসবেন। অবশ্যই।
অ্যানজিওগ্রাম হলো। লন্ডনে যে-ধমনিতে ব্লক পাওয়া গিয়েছিল এবং যেটায় অ্যানজিওপ্লাস্টি করা হয়েছিল, দেড় বছরের ব্যবধানে সেটা আবার বন্ধ হয়ে এসেছে। অ্যানজিওপ্লাস্টির আগের অবস্থায় প্রায় ফিরে গেছে।
রিপোর্ট দেখে অর্শ-বিশেষজ্ঞ বললেন, তোমার অস্ত্রোপচার করা যাবে না। অর্শ থেকে যে-রক্তক্ষরণ হয়, হাজার হোক, তাতে তুমি মরবে না। কিন্তু অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে তোমার হৃদযন্ত্র যদি বন্ধ হয়ে যায়, সেটা ভালো কাজ হবে না।
অতএব, যেমন এসেছিলাম, তেমনি ফেরা। মাঝখানে ভেতর থেকে হাসপাতাল দেখা।
চিকিৎসকেরা সারুকে পরামর্শ দিলেন, ফুসফুসের জন্যে ইনহেলার ব্যবহার করতে আর কানের জন্যে হিয়ারিং এইড নিতে। ইনহেলার তিনি নিচ্ছিলেনই, এখন বেশি বেশি মাত্রায় নিতে হবে। হিয়ারিং এইড কেনা হলো, কিন্তু অস্বচ্ছন্দ বোধ করায় সিঙ্গাপুরে থাকতেই তার ব্যবহার বন্ধ করে দিলেন তিনি।
গ্লেনইগলস হাসপাতালের পাশেই চমৎকার উদ্যান। তাতে আমরা বেড়াই।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরে সমাজতত্ত্ব পড়ায় হাবিব খোন্দকার। সে রাজ্জাক সাহেবের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তার সঙ্গে পরিচয় হলে জানতে। পারি, তার দু ভাইকে আমি চিনি। আমরা হাসপাতালে ঢোকার আগে সে আর তার স্ত্রী ঝোরা রেস্টুরেন্টে নিয়ে আমাদের খাওয়ায়। হাসপাতাল থেকে বেরোবার পর তার বাড়িতে যেতে হয় খেতে। তার বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেখানকার বাঙালি শিক্ষক আরো কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কিছুকাল আগে শেখ হাসিনা হাবিব খোন্দকারের এই বাড়িতে এসে থেকে গেছে। শেখ কামালের সঙ্গে হাবিবের বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল।
