শেষ পর্যন্ত আদালত তাদের কথা মেনে নিলেন এবং সেদিনই আমাদের জামিন হলো।
মাস দু-আড়াই পরে কানাডার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে আমার যোগদানের কথা। কানাডীয় হাই কমিশনের বাণিজ্য ও অর্থনীতি-বিষয়ক কাউনসেলরের সঙ্গে আমার বিলক্ষণ পরিচয় ছিল। আমি কাগজপত্রসমেত পাসপোর্টটা ভদ্রমহিলার হাতে দিয়ে বললাম, সাক্ষাৎকারের জন্যে আপনি যদি একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দিতে পারেন, তবে উপকৃত হবো।
তখন ঢাকায় কানাডার ভিসা অফিস ছিল না। প্রতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লির কানাডীয় হাই কমিশন থেকে দুজন ভিসা অফিসার ঢাকায় এসে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে ভিসা দিতেন বা দিতেন না।
কয়েকদিন পর বাণিজ্য ও অর্থনীতি-বিষয়ক কাউনসেলর ফোন করে আমাকে বললেন, আমি যেন হাই কমিশনে এসে বিশেষ একজন ভিসা অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। সে-ভদ্রলোকের নাম বলতেই আমাকে সাদরে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। ভদ্রলোকের আচরণ খুবই সৌজন্যপূর্ণ। তিনি বললেন, আপনার কাছে একটা বিষয় জানার আছে। আপনার নামে কি কোনো ফৌজদারি মামলা আছে? প্রশ্নটা এমনই আকস্মিক যে আমার প্রথমে মনে পড়ল না, তারপরই বললাম, হ্যাঁ, একটা রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের কয়েকজনের নামে ফৌজদারি মামলা করেছে সরকার। তিনি জানতে চাইলেন আমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি কি না। জানালাম, মামলার কারণে আমি জামিনে আছি–তাছাড়া অন্য সব বিষয়ে আমার জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চলছে। তিনি বললেন, দেখুন, কানাডার আইন-অনুযায়ী কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে তাকে ভিসা দেওয়া যায় না। আমি দুঃখিত। বললাম, এটাই যদি আপনাদের আইন হয়, তবে তো আমি ভিসার আশা করতে পারি না। তিনি একটু পরে বললেন, এ-কথাটা আমার আপনাকে জানাবার কথা নয়। আপনার বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি মামলা আছে, তা আমাদের জানার কথাও নয়। তবে আপনাদের সরকার আমাদের কাছে আপনাদের নামের একটা তালিকা পাঠিয়েছে–খবর হিসেবে।
আমার পাসপোর্টে একটা ছোটো সিল নিয়ে ফিরে এলাম। এত বছর ধরে যখনই কোনো দেশের ভিসার জন্যে আবেদন করি, আমাকে লিখতে হয়, ১৯৯২ সালে কানাডার ভিসার জন্যে আবেদনপত্র প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তাতে অবশ্য অন্য দেশের ভিসা পেতে কখনো অসুবিধে হয়নি। তবে তারপর বহুদিন আর কানাডীয় ভিসার জন্যে আবেদন করিনি।
২০০৫ সালে যখন আবার আবেদন করি, কানাডীয় হাই কমিশন আমাকে ওই মামলার কাগজপত্র দেখাতে বলে। আমি জানাই, আমার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজ নেই এবং কখনো ছিল না। হাই কমিশন বলে, কিছু একটা কাগজ দেখাও যে মামলা হয়েছিল এবং উঠে গেছে। আমি জাতীয় আর্কাইভস থেকে সংবাদপত্রের কিছু খবর ফটোকপি করে জমা দিই। তা দেখে ভিসা অফিসার অবাক হয়ে বলেন, শুধু এইজন্যে তোমার ভিসা হয়নি!
১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁদের মেয়াদের একেবারে শেষে জাহানারা ইমাম ও অপর ২৩ জনের বিরুদ্ধে সরকারের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেন। এতদিনে ঝামেলা থেকে মুক্ত হই।
ওদিকে ১৯৯২ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়ার পরে আটকাঁদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন গোলাম আযম। নিজের নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধেও তিনি আরেকটি মামলা করেন হাইকোর্টে। ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্ট তাঁর আটকাঁদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। নাগরিকত্বের মামলার শুনানি হয় বিচারপতি ইসমাইলউদ্দীন সরকার ও বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর আদালতে। তাঁরা দুজন দুরকম সিদ্ধান্ত দেন। ফলে মামলা যায় তৃতীয় বিচারকের কাছে। বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী–যিনি আমাদের ২৪ জনকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিলেন–নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ অবৈধ বলে রায় দেন। তারপর মামলাটি যায় আপিল বিভাগে। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে গোলাম আযমের বিষয়সংশ্লিষ্ট কোনো নথিতে কোনো আদেশ দিয়েছিলেন। তাই তিনি আপিলটি শোনেন নি। আপিল বিভাগের বাকি চারজন বিচারক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমান ১৯৯৪ সালের জুন মাসে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। ততদিনে গোলাম আযম কারাগার থেকেও মুক্তি পেয়ে যান।
এ সময়ে কেউ কেউ আমাকে বলেন, গোলাম আযমের বিচারের জন্যে আমরা অমন তৎপর না হলে হয়তো নাগরিকত্বের প্রশ্নে তিনি মামলা করতেন না এবং তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার হতো না। আমাদের আন্দোলনটি পরিণামে তাঁর পক্ষেই গেছে। আমি অবশ্য তা মনে করি না। গোলাম আযমের গণবিচারের বিষয়ে আমরা যা করেছি, তা যথার্থ ছিল। আমরা যে আরো অগ্রসর হতে পারিনি, তার জন্য দায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতা এবং আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতার সীমাবদ্ধতা।
গণ-আদালতের রায়ের পর গোলাম আযমের বিচারের দাবি তুঙ্গে উঠেছিল। এ-নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়–একাধিক দিন হরতাল পর্যন্ত হয়। জাহানারা ইমাম অসুস্থ শরীর নিয়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তাঁর পক্ষে আর সক্রিয় থাকা সম্ভবপর হয়নি, চিকিৎসা নিতে তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে হয়। তার অনুপস্থিতিতে আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে।
