টি এইচ খান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি-জেনারেল আবদুল ওদুদ ভূঁইয়া এবং আরো দু-একজন আইনজীবী সরকারের পক্ষ নিলেন। তাদের যুক্তিতর্কের মধ্যে। আদালত-কক্ষে প্রবেশ করলেন অ্যাটর্নি-জেনারেল আমিনুল হক। বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী তাঁকে দেখে বললেন, এই যে অ্যাটর্নি-জেনারেল এসে গেছেন। আমরা এখন তার কথা শুনি।
আমিনুল হক দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, এই মামলায় তিনি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, এ-বিষয়ে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিচারপতি টি এইচ খানকে। সরকারের পক্ষে যা কিছু বলার, তিনিই বলবেন।
আমরা জানতাম, আমিনুল হক যখন অ্যাটর্নি-জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম আনুগত্য। সেই বোধ থেকে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে অস্বীকার করেছিলেন। এমন নীতিবোধের দৃষ্টান্ত সুলভ নয়।
বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীর ভাষা ও ভঙ্গি ছিল খুবই চিত্তাকর্ষক। এক পর্যায়ে টি এইচ খান তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ডু ইউ সি মাই পয়েন্ট, মাই। লর্ড? তিনি জবাব দেন, অ্যাজ ক্লিয়ার অ্যাজ দি টুইঙ্কলিং স্টার।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে এবং সমাজে অভিযুক্তদের কয়েকজনের ভূমিকার উল্লেখ করে ইশতিয়াক আহমেদ বলেছিলেন, এই যাঁদের অবদান, তাঁরা। রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কোনো কাজে জড়িত হবেন, এ-কথা অবিশ্বাস্য। তাতে বিচারপতি চৌধুরী মন্তব্য করেন, অর্থাৎ আপনি বলতে চান, যারা সন্তানের জন্ম দিয়েছে, তারা তার ঘাতক হতে পারে না?
বেলা গড়িয়ে এলো। আদালত পরদিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করলেন এবং আদেশ দিলেন, শুনানির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারীদের কাউকে যেন গ্রেপ্তার না করা হয়।
এজলাস থেকে বেরিয়ে দেখি আমার মামাতো ভাই–কামরু ভাই–অপেক্ষা করছেন। সংবাদপত্রের খবর দেখে খোঁজখবর নিয়ে তিনি আদালতে এসেছেন এবং নীরবে ও না-খেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
কেবল তিনি নন, বহুজন সেদিন আদালত-প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করেছিলেন আমাদের জামিন হয়েছে–এ খবরটি জেনে যাওয়ার জন্যে। যদিও সেদিন। জামিন হয়নি, তবু আমরা যে গ্রেপ্তার হইনি, তাতেই তারা খুশি হয়ে ফিরে যান।
আদালত থেকে আমরা তিন নেতার মাজারের পাশ দিয়ে বের হলাম। একটু এগিয়ে রিকশা পাওয়া গেল। কামরু ভাই ও আমি এক রিকশায় বাড়ি ফিরলাম। সেখানেও দেখি অনেক মানুষের ভিড়–আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীরা উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন কী হলো, তা জানার জন্যে।
পরে বেবীর কাছে শুনলাম, আমাদের বিরুদ্ধে মামলার খবর জেনে সমাজকল্যাণ ইনসটিটিউটের মুহাম্মদ সামাদের স্ত্রী রীমা তার সংসারখরচের বরাদ্দ থেকে দু হাজার টাকা নিয়ে বেবীর হাতে দিয়েছিল আমার পক্ষে মামলা চালানোর খরচ জোগাতে। টাকাটা বেবী নেয়নি প্রয়োজন হয়নি বলে, কিন্তু রীমার সহৃদয়তা তাকে ও আমাকে খুব স্পর্শ করেছিল।
সেদিন বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বারোটি রাজনৈতিক দলের এক সভা হয়। সেখানে আমাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারির নিন্দা করা হয়। সারাদেশে রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে কোথাও মিছিল নিয়ে, কোথাও সভা করে, কোথাও বিবৃতি দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়। আমাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করায় মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত অনির্দিষ্টকালের জন্যে বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতি।
৩০ মার্চে আবার হাইকোর্টে আমাদের জামিনের আবেদনের শুনানি হলো। সারাদিন কার্যক্রম চলার পরে আদালত আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মনজুর করেন। তবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিম্নআদালতে জামিনের আবেদন করতে আমাদের নির্দেশ দেন।
২৫.
হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মনজুর করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। নিম্নআদালতে যথাযথ জামিনের আবেদন করতে আমাদের নির্দেশ দেন। তবে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে আমরা যাইনি। কয়েকদিন পরে আমরা গিয়েছিলাম, যতদূর মনে পড়ে, ঢাকার অতিরিক্ত জেলা জজের আদালতে। সেদিন বোধহয় জেলা আইনজীবী সমিতির শ খানেক সদস্য আমাদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন। মামলা পরিচালনা করেছিলেন আমীর-উল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
আদালতে হাজির হয়ে আমরা দেখি, আসামীর কাঠগড়ায় জনাতিনেক দাঁড়িয়ে আছে কোমরে দড়ি পরে–তারা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত। আইনজীবীরা। আমাদের বসতে বললেন তাদের জন্যে নির্ধারিত স্থানে আর স্থানাভাবে তারা অনেকে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পরে বিচারক এসে আসন নিলেন (বিচারকের তো স্ত্রীলিঙ্গ হয় না, আর হলেও আমরা তা ব্যবহার করতাম না)। মামলা শুরু হতেই আসামীর কাঠগড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন, অভিযুক্তেরা কোথায়? আমীর-উল ইসলাম বললেন, তাঁরা সবাই আদালতে। হাজির আছেন। বিচারক আবারো কাঠগড়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তো অভিযুক্তদের দেখতে পাচ্ছি না। আমীর-উল ইসলাম বললেন, সকলেই উপস্থিত, আপনি চাইলে একেক করে নাম ডেকে তাদের উঠে দাঁড়াতে বলতে পারি। আদালত বললেন, অভিযুক্তদের যথাস্থানে থাকতে হবে। এই কথায় সমবেত আইনজীবীরা একবাক্যে আপত্তি জানালেন–সেই কোলাহলে কে যে কী বললেন, তা শোনা গেল না। এই প্রতিবাদে বিচারক বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, অভিযুক্তেরা যেই হোন, আদালতে নির্দিষ্ট স্থানে তাদের দাঁড়াতে হবে–এই হলো রীতি। আমি গাজীউল হককে বললাম, চলুন, আমরা কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াই–তবে সেখানে সকলের জায়গা হবে কি না সন্দেহ। একজন আইনজীবী তা শুনে বললেন, না, আমরা কিছুতেই আপনাদের কাঠগড়ায় উঠতে দেবো না।’ আরেকজন ততক্ষণ বিচারককে বলছেন, অভিযুক্তদের পক্ষে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক নয়–তাদেরকে আদালতে হাজির থাকতে হবে, এটাই আসল কথা। তারা যে আদালতে হাজির, এ-বিষয়ে আপনাকে সন্তুষ্ট হতে হবে। আমরা তাদেরকে একযোগে উপস্থিত করতে পারি, একজন-একজন করেও উপস্থিত করতে পারি–আপনি যেমনভাবে চান। অনুগ্রহ করে এঁদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বলবেন না। এ-কথা উপস্থিত আইনজীবীরা জোরেশোরে সমর্থন করলেন। তাদের উচ্চগ্রামের কথায় যথেষ্ট উন্মা প্রকাশ পেলো।
