জাহানারা ইমামের বাড়িতে ফোন করলাম, তিনি নেই। শাহরিয়ার কবিরের বাড়িতে ফোন করলাম, তিনি নেই। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাড়িতে ফোন করলাম, সেও নেই।
বুঝলাম, সকলেই খবর পেয়ে গেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। মনে একটু ক্ষোভও জন্মালো-যারা খবরটা পেলেন, তাঁরা কেউ আমাকে কিছু জানাবার প্রয়োজন বোধ করলেন না!
গুলশানে আমার বন্ধু মসিহুর রহমানকে ফোন করে বললাম বাড়ির গেট খোলা রাখতে। একটা ব্যাগে সামান্য কিছু কাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিস আর ওষুধ নিয়ে নিলাম। আবদুল আলীর গাড়িতে করে মসির বাড়ি এলাম। আমার হাতে ব্যাগ দেখে মসি বললো, ‘কিছু একটা ঝামেলা বাধিয়েছিস, বুঝতে পারছি।’
খানিক বাদে বাড়ি থেকে ফোন এলো। সমন্বয় কমিটির হয়ে কেউ ফোন করে জানিয়েছেন, কাল সকাল দশটায় যেন হাইকোর্টে উপস্থিত থাকি।
রাতটা মসির বাড়িতে কাটালাম। সকালে খবরের কাগজ এলেই দেখতে পেলাম, এটাই বিশাল শিরোনামযুক্ত প্রথম সংবাদ। আসামি ২৪ জন হলেন গণ আদালতের বিচারক জাহানারা ইমাম, গাজীউল হক, আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, শফিক আহমেদ, ফয়েজ আহমদ, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, মওলানা আবদুল আউয়াল, কর্নেল নূরউজ্জামান, কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী ও শওকত আলী খান; উভয় পক্ষের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, শামসুদ্দীন বাবুল, উম্মে কুলসুম রেখা ও নজরুল ইসলাম (আসিফ নজরুল); অভিযোগকারী আনিসুজ্জামান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও সৈয়দ শামসুল হক; গণ-আদালতে সাক্ষ্যদাতা শাহরিয়ার কবির, মওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ, আলী যাকের ও ডা. মোশতাক হোসেন; এবং সমন্বয় কমিটির সদস্য-সচিব আবদুল মান্নান চৌধুরী। যে-পাঁচজন সাক্ষী অভিযুক্ত হননি, তাঁরা হলেন মেঘনা গুহঠাকুরতা, মুশতারী শফী, সাইদুর রহমান, অমি কায়সার ও হামিদা বানু–এঁরা সকলেই শহীদ পরিবারের সদস্য। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেআইনি সমাবেশের, রাষ্ট্রদ্রোহিতার, সরকারের বিরুদ্ধে বৈরিতা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর, বিশৃঙ্খলাসৃষ্টির, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার, জনশৃঙ্খলার ক্ষতিসাধনের ইত্যাদি ইত্যাদি।
মসির গাড়িতে করে হাইকোর্টে এলাম। হাইকোর্টে যে কোথায় যাবো, তা জানা ছিল না। তবে বার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে যেতেই কেউ না কেউ এদিকে এদিকে’ বলে আমাকে নিয়ে গেলেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির কক্ষে। আমার ব্যাগ রয়ে গেল মসির গাড়িতে। সে বললো, ‘যদি জেলে যাস, তাহলে সেখানে পৌঁছে দেবো। আর যদি বাড়ি ফিরে যেতে পারিস, তাহলে সেখানে দিয়ে আসবো। মসি ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে জেল খেটেছিল।
বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির কক্ষে অভিযুক্তদের অধিকাংশই ততক্ষণে জমা হয়েছেন। গাজীউল হক প্রস্তাব করলেন, অভিযুক্তেরা সবাই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে মিছিল করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতের দিকে যাবেন। পথে যদি পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে তো তাই সই।
কথাটা আমার একেবারেই পছন্দ হলো না। তবু অন্যেরা কী বলেন, তা শুনতে চুপ করে রইলাম। কবীর চৌধুরীই প্রথমে মুখ খুললেন। বললেন, এমন সিদ্ধান্ত হবে হঠকারী। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আইনি লড়াই চালানো।
আমি তাকে সমর্থন করলাম। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কলিম শরাফী, জেড আই পান্নাও কবীর চৌধুরীর বক্তব্যের সঙ্গে মতৈক্য ঘোষণা করলেন। . প্রথমে সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ এবং তারপরে ড. কামাল হোসেনের মত চাওয়া হলো। তারা বললেন, হাইকোর্ট বিভাগে জামিন চেয়ে আবেদন করা উচিত। তাঁরা দুজনেই আমাদের পক্ষে আবেদন পেশ করার আশ্বাস দিলেন।
খানিক বাদে ওই দুজনের পেছনে আমরা সবাই এবং অনেক আইনজীবী গিয়ে হাজির হলাম বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী ও বিচারপতি এম এ করিমের এজলাসে। সেখানে আমীর-উল ইসলাম ও সুধাংশুশেখর হালদারও এলেন। ইশতিয়াক আহমেদ ও কামাল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার! কামাল হোসেন সামান্য একটু বলতেই তিনি বললেন, আমি তো এদের চাই না। যে-আদালত এঁদের চান, আপনারা সেখানে যান। যে-আদালত পরওয়ানা জারি করেছেন, সেখানে আত্মসমর্থন করেই জামিন প্রার্থনা করা বিধেয়।
কামাল হোসেন বললেন, এই মামলাটি খুব ভিন্ন ধরনের, এদেশের ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই। অভিযুক্তরা এদেশের অত্যন্ত মান্যগণ্য মানুষ। তাদের বিরুদ্ধে যে-ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তারা করেননি, তাঁদের পক্ষে করাও সম্ভবপর নয়। কষ্টকল্পিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিম্নআদালত গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করেছেন, সেখানে গিয়ে সুবিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই আমরা এই আদালতে এসেছি।
বিচারপতি টি এইচ খান–যার কাছে জগন্নাথ কলেজে আমি লজিক পড়েছি, তিনি–উঠে দাঁড়ালেন, কামাল হোসেনের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে। তিনি বেশ উত্তেজিত ছিলেন। এক পর্যায়ে আদালতকে উদ্দেশ করে বাংলায় বললেন, ‘এরা তো আপনাকে মানে না, দেশের কোনো আদালতই মানে না, এরা নিজেদেরকে আদালত ঘোষণা করে বসে আছে। এরা এখানে এসেছে কেন?
বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী পালটা প্রশ্ন করলেন, আমাকে যদি না ই মানে, তবে আমার কাছে আসবে কেন? মানে বলেই তো এসেছে।
আমাদের পক্ষে ইশতিয়াক আহমেদ, কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম কিছু নিবেদন করলেন।
