৪. অনুরূপভাবে গোলাম আযম ১৯৭৩ সালে বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য লবিং করেন। একই বছরে ত্রিপলিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি যুব সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে হানিকর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
৫. ১৯৭৩ সালে গোলাম আযম মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেনটস অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা অ্যান্ড কানাডার বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানভুক্ত করার জন্য সবাইকে কাজ করতে আহ্বান জানান।
৬. ১৯৭৭ সালে গোলাম আযম ইসতামবুলে অনুষ্ঠিত ইসলামিক ফেডারেশন অফ স্টুডেনটস অরগানাইজেশনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা করেন।
মাননীয় আদালত,
আমি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করছি। ইনি সেই গোলাম আযম-যাকে ফেরার ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজ এলাকার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেন; ১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনবলে বাংলাদেশ সরকার যার নাগরিকত্ব বাতিল করে দেন; যিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ই জুলাই বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যিনি বেআইনিভাবে এ দেশে রয়ে যান; ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেও যিনি নাগরিকত্ব ফেরত পাননি; বাংলাদেশ সরকার যাকে ১৯৮৮ সালের ২০শে এপ্রিলের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিলেও যিনি বাংলাদেশে থেকে যান; যার নাগরিকত্ব ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা বাংলাদেশ সরকারের নেই বলে ১৯৮৮ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছেন; সেই গোলাম আযমের উপযুক্ত শাস্তি বিধানের জন্য এই গণ আদালতের কাছে আমি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করলাম।
২৪.
গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিচার সারাদেশে অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সঞ্চার করে। মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের সম্পর্কে সরকার কিছু করুক আর নাই করুক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর যে ধ্বনিত হয়েছে, এটাই বড়ো কথা। জাহানারা ইমামকে দেশবাসী অত্যন্ত অল্পসময়ে জাতীয় নেতার সম্মানে ভূষিত করে। অন্তত এই একটি বিষয়ে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হতে তাদের ইচ্ছা ব্যক্ত করে। বিভিন্ন জায়গায় গণ-আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকারকে আহ্বান জানানো হয়।
গণ-আদালতের সাফল্য, মনে হয়, সরকারকে ক্রুদ্ধ করে। গণ-আদালতের অধিবেশনে জনসমাবেশের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়ে শেখ হাসিনা এক চিঠি লিখেছিল জাহানারা ইমামকে। তার একটা ফটোকপি জোগাড় করে সংবাদপত্রে ছেপে দেন কোনো সাংবাদিক। সরকার নিশ্চিত হয় যে, গণ-আন্দোলনের মূলে আছে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র।
পরে জানতে পারি, ২৮ মার্চে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শাহরিয়ার কবির ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফকে ডেকে পাঠিয়ে গণ-আদালতের বিষয়ে আলাপ করেন। এই আলোচনার বিবরণ শাহরিয়ার কবির লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর গণ আদালতের পটভূমি (ঢাকা, ১৯৯৩) গ্রন্থে। প্রধানমন্ত্রী তাদের কাছে জানতে চান, গোলাম আযমের বিষয়ে প্রচলিত আদালতে না গিয়ে কেন তারা গণ আদালত বসাতে গেলেন। তিনি অভিযোগ করেন, গণ-আদালত গঠন করে দেশের প্রচলিত আদালতকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। নির্বাচিত সরকার যখন দেশে গণতন্ত্র-প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, তখন সেই সরকারকে বিব্রত করতে এই উদযোগ নেওয়া হয়েছে। গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করার পরেও এ-ধরনের উদযোগ নেওয়ায় দেশে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে, ব্যাংকে এলসি খোলা কমে গেছে। আওয়ামী লীগ দেশের সৃষ্টিশীলতা নষ্ট করতে চায়, আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের হাতে খেলছে। গণ আদালতের অনুষ্ঠান কোনোভাবেই অনুমোদনযোগ্য নয় এবং গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার জন্যে অবিলম্বে এই আন্দোলন বন্ধ করা দরকার।
শাহরিয়ার কবির ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু এসব অভিযোগের যথাযথ জবাব দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাদের কথায় সন্তুষ্ট হননি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে শাহরিয়ার চলে যান কর্নেল নূরউজ্জামানের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যে, গণ-আদালতের প্রশ্নে ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা বেরিয়েছে তার মধ্যে তিনিও আছেন। তখন তারা জাহানারা ইমামের বাড়িতে যান বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে।
সে-সময়ে আমি ঘরে বসে গল্প করছি। বন্ধু এ জেড এম আবদুল আলী আছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের গোলাম মুস্তাফা আছে, আছে আরো দু-একজন। এমন সময়ে টেলিফোন এলো এক সাংবাদিকের : একটু আগে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত থেকে জাহানারা ইমাম ও আরো ২৩ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা বেরিয়েছে, তার মধ্যে আমার নামও আছে। দণ্ডবিধির ১২০, ১২১, ১২৪ (ক), ১৪৮, ৫০৪ এবং ৫০৫ (ক ও খ) ধারায় অভিযোগ আনীত হয়েছে। সাংবাদিক আমাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য খবর দিচ্ছেন।
খবর শুনে আমি ফোন করলাম, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদকে। তাকে না। পেয়ে ফোন করলাম অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলামকে (পরে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি-জেনারেল)। তিনি বললেন, যেসব ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে, তার মধ্যে কোনো কোনোটি জামিনের অযোগ্য। আজকের রাতটা বাড়িতে না থাকাই ভালো। কাল হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে।
