জাহানারা ইমাম আমার ছাত্রী ছিলেন। সেই দাবিতে তিনি বললেন, গণ আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আমাকেই অভিযোগ উত্থাপন করতে হবে। আমি তাকে বললাম, এতে আমার আপত্তি নেই, তবে যেহেতু ১৯৭১ সালে আমি দেশ ছেড়ে গিয়েছিলাম, তাই গোলাম আযমের তখনকার কার্যকলাপ সম্পর্কে আমার অভিযোগ হবে শোনা কথার সামিল। আমি বরঞ্চ ১৯৭২ সাল থেকে গোলাম আযম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যা যা করেছেন, সে-সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ আনবো। আর কেউ ১৯৭১ সালে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগ করুক।
আলোচনার পরে স্থির হলো, গণ-আদালতে অভিযোগকারী হবো আমরা তিনজন : বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গোলাম আযমের ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করবেন সৈয়দ শামসুল হক; মুক্তিযুদ্ধকালে তার ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করবে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর; আর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পৃথিবীর নানাদেশে তার বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করবো আমি।
গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিচার হবে–এমন একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ামাত্র মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেল। ছাত্রেরা ছিল সামনের কাতারে। প্রজন্ম ‘৭১ ছিল খুব সক্রিয়। জাতীয় কবিতা উৎসবে উপস্থিত প্রায় সকলেই বিচারকার্যের সমর্থনে গণস্বাক্ষরে অংশগ্রহণ করলেন। ৩ মার্চে ঢাকায় সমন্বয় কমিটি-আহূত জনসভায় শেখ হাসিনা বললো, বাংলার মাটিতে গোলাম আযমসহ একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার হবেই।’ কয়েকদিন পরে ১০০ জন সংসদ-সদস্য গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিচার সমর্থন করে বিবৃতি দেন। ৫২ জন আলেম বিচারের উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। কয়েকটি নারী-সংগঠনও একযোগে আমাদের সমর্থন করে। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসে।
জাহানারা ইমাম যেখানেই যান, সেখানেই মানুষ তাঁর কথা শুনতে ছুটে আসে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তার সন্তান রুমীর সূত্রে তিনি শহীদ-জননী আখ্যা লাভ করেন। দেখতে দেখতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত গণ আদালতের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন গড়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সরকার এতে বিচলিত হয়। এক পর্যায়ে জাহানারা ইমাম এবং সমন্বয় কমিটির নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। সরকার গণ আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলে। সমন্বয় কমিটি থেকে বলা হয়, ২৫ মার্চের মধ্যে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে গণ আদালত বসানোর প্রয়োজন হবে না। কোনো পক্ষই অপর পক্ষের প্রস্তাবে সম্মতি না হওয়ায় আলোচনা নিষ্ফল হয়।
জামায়াতে ইসলামী এবং তার সমর্থকেরাও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। নানাভাবে গণ-আদালতের বিরুদ্ধে তারা প্রচার চালান। জাহানারা ইমামকে জাহান্নামের ইমাম ও ঘসেটি বেগম নামে অভিহিত করা হয়। পুরো উদ্যোগকে সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে লাভবান হতে চাইছে, একথাও বলা হয়। বায়তুল মোকাররমের খতিব খুব তীব্র ভাষায় সমগ্র প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করেন।
১৭ মার্চ গোলাম আযমের প্রতি নির্দিষ্ট দিনে গণ-আদালতে হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমন জারি করা হয়। ২০ মার্চ আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং বাম রাজনৈতিক দলগুলি গণ-আদালতের কর্মসূচি সফল করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানায়। ২২ মার্চ লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গোলাম আযম আইনের ঊর্ধ্বে নন, তবে গণ-আদালতে তার বিচার সমর্থনযোগ্য নয়। ২৩ মার্চ সরকার গোলাম আযমকে কারণ দর্শানোর একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। তাতে বলা হয়, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও কেন তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করছেন না এবং আইনভঙ্গ করে জামায়াতের আমিরের পদ গ্রহণ করায় কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার ব্যাখ্যা করতে। একই দিনে সমন্বয় কমিটিকেও সরকার কারণ দর্শানোর বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। গণ-আদালতের কার্যক্রম কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তাতে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। পরের দিন গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। জাহানারা ইমামকে গ্রেপ্তার করা হবে বলেও গুজব ছড়িয়ে যায়। সরকারি প্রচারমাধ্যমে গণ-আদালতে বিচার-প্রক্রিয়াকে আইন ও সংবিধান পরিপন্থী বলে অভিহিত করে তার অধিবেশন বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় জাহানারা ইমাম আবার ঘোষণা করেন যে, পরদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত বসবে এবং গোলাম আযমের বিচার হবে।
২৫ মার্চ রাতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালতের মঞ্চ নির্মাণ করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে আনীত মাইক্রোফোনগুলি জব্দ করা হয়। চারুকলা ইনসটিটিউটের ছাত্রেরা ব্যানার নিয়ে সেখানে পৌঁছোলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করতে উদ্যত হয় এবং তাড়া করে ইনসটিটিউট পর্যন্ত নিয়ে আসে। ২৬ মার্চ সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবদিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এই অবস্থায় স্থির হয়, গণ-আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির কক্ষে আগে মিলিত হবেন। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলো। গাজীউল হক রায় লিখে নিয়ে এসেছিলেন। কিছু সংশোধনের পরে বিচারকেরা তাতে স্বাক্ষর দিলেন।
