পরদিন জানা যায়, বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৪টি আসনে জয়লাভ করেছে।
৩৫টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি নিয়েছে তৃতীয় স্থান। সেদিন নাকি সংবাদ-সম্মেলন করে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হয়নি বলে বিএনপির অভিযোগ করার কথা ছিল। এখন পট বদলে গেল। শেখ হাসিনাই বললো, নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচনে তিনি অবশ্য পরাজিত হন–অনেকে সে-পরাজয়ের কারণ মনে করেন আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ। তবে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা সম্পর্কে কামালের এই মন্তব্য তার দলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরই জের ধরে কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর গাড়ি আক্রান্ত হয়, তিনিও কটুকাটব্যের শিকার হন।
খালেদা জিয়া ও এরশাদ পাঁচ-পাঁচটি আসনেই নির্বাচিত হলেন। তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শেখ হাসিনা জিতলো একটিতে।
নির্বাচনের আগে বেতারে-টেলিভিশনে শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিল, সেটি তার অনুকূলে যায়নি বলে অনেকেই মনে করেন।
পরে দলীয় ব্যর্থতার দায়স্বীকার করে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করে। আরো পরে দলীয় নেতা ও কর্মীদের অনুরোধে পদত্যাগপত্রটি সে প্রত্যাহার করে নেয়।
দুই প্রধান দলের সংসদ-সদস্যরাই এরশাদ-আমলের স্পিকারের কাছে শপথগ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ শপথবাক্য পাঠ করান।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠন নিয়েও কিছু টানাপোড়েন হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একবার বলেন যে, কোন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, সে-সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাউকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে আমন্ত্রণ জানাবেন না। এতে বিএনপি শঙ্কিত হয়ে প্রতিবাদ করে। আওয়ামী লীগ বলে, সাংবিধানিক বিষয়টির আগে নিষ্পত্তি হোক, পরে মন্ত্রিসভা-গঠনের আমন্ত্রণ। বিএনপির প্রতি জামায়াতে ইসলামী সমর্থন জানালে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে আমন্ত্রণ জানান। আওয়ামী লীগ তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে রাষ্ট্রপতি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
২৩.
১৯৯১ সালের ২৮ ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ঘোষণা করে যে, অধ্যাপক গোলাম আযম এই সংগঠনের আমির নির্বাচিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিতপূর্বে গোলাম আযম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশি ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই তিনি বাংলাদেশে আসেন তার অসুস্থ মাকে দেখতে। সেই থেকে তিনি। এদেশে রয়ে যান এবং নেপথ্য থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেননি, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রার্থনা করেও তিনি বারবার ব্যর্থ হন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার। জাতীয় সংসদে জানান যে, তাঁর নাগরিকত্ব প্রত্যর্পণ করার ইচ্ছা সরকারের। নেই। সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে এহেন ব্যক্তির প্রকাশ্যে এদেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পেছনে গূঢ় অভিসন্ধি কাজ করছে। বলে সকলের মনে হয়।
গোলাম আযমকে আমির ঘোষণার প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশ থেকে তাঁকে বহিষ্কারের দাবিতে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ছাত্র-সংগঠন এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিবৃতি দেয়। বড়ো দুটি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই তার মধ্যে ছিল না, তবে আওয়ামী লীগের ছাত্র-সংগঠন ছাত্রলীগ ছিল। ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে গোলাম আযম সম্পর্কে আলোচনায় আওয়ামী লীগ তাঁর বহিষ্কার দাবি করে।
জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকেই শাহরিয়ার কবির আমাকে জানান যে, একটি গণ-আদালত গঠন করে গোলাম আযমের বিচারের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। এমন একটা উদ্যোগ নেওয়া হলে আমি তাতে অংশ নেবো কি না তিনি তা। জানতে চান। আমি বলি, অবশ্যই নেবো। পরে তিনি আমাকে কর্নেল কাজী নূরউজ্জামানের বাড়িতে আহূত দুটি সভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানান। আমি এর কোনোটিতেই যেতে পারিনি। প্রথম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শাহরিয়ারের কাছ থেকে শুনে আমি একাত্মতা প্রকাশ করি। দ্বিতীয় সভায় গণ আদালত আহ্বানের জন্যে কমিটির নাম স্থির হয় ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। ‘নিমূল’ শব্দটি আমার পছন্দ হয়নি, সেকথাও আমি শাহরিয়ারকে জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন সর্বসম্মতিক্রমে নামটি গৃহীত হয়েছে, এখন আর তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। এই দ্বিতীয় সভাতেই জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক করে ১০১ জন সদস্যের কমিটি গঠিত হয়। তার মধ্যে আমাকেও রাখা হয়।
এই সংবাদ প্রকাশিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী আমাকে বলেন যে, তিনি এই উদযোগে সংশ্লিষ্ট হতে চান। আমি তাঁকে শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিই। এরপরই অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরীর উদযোগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্র প্রতিরোধ মঞ্চ’ গঠিত হয়, মান্নান চৌধুরী তার একজন নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তারা আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনলাভ করেন। কয়েক দফা আলোচনার পর দুটি সংগঠন মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামকেই আহ্বায়ক রেখে। পরে আবদুল মান্নান চৌধুরী হন এর সদস্য-সচিব। স্থির হয়, ২৬ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত প্রকাশ্যে বসবে এবং গোলাম। আযমের বিচার অনুষ্ঠিত হবে।
