গণ-আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন জাহানারা ইমাম (চেয়ারম্যান), অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শরাফী, মওলানা আবদুল আউয়াল, কর্নেল (অব.) কাজী নূরউজ্জামান, কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী ও ব্যারিস্টার শওকত আলী খান। বিচারকমণ্ডলীতে বেগম সুফিয়া কামাল ও শওকত ওসমানের নাম ছিল। সরকার ২৬ মার্চ কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে এবং ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সুফিয়া কামাল তা কতটা মোকাবেলা করতে পারবেন, তা চিন্তা করে শেষ মুহূর্তে বিচারকমণ্ডলী থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। শওকত ওসমান নির্দিষ্ট সময়ে এসে পৌঁছোতে পারেননি–তাকে যারা আনতে গিয়েছিলেন, তারা তাকে বাসায় পাননি, তাই তাকে বাদ দিয়ে সাক্ষীদের একজন, সাংবাদিক মওলানা আবদুল আউয়ালকে বিচারকের আসন দেওয়া হয়। তার জায়গায় সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন মওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ। অভিযোগকারীদের কৌসুলি ছিলেন অ্যাডভোকেট জেড আই পান্না, অ্যাডভোকেট শামসুদ্দীন বাবুল ও অ্যাডভোকেট কুলসুম রেখা। গণ আদালতের সমনের কোনো জবাব গোলাম আযম দেননি। তাঁর পক্ষসমর্থনের জন্যে গণ-আদালত অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে (আসিফ নজরুল নামে অধিকতর পরিচিত) নিযুক্ত করেন। আমাদের অভিযোগগুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। অপরাপর সাক্ষী ছিলেন ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, শাহরিয়ার কবির, মুশতারী শফী, সাইদুর রহমান, অমি কায়সার, ড. হামিদা বানু (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), মওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ, আলী যাকের ও ডা. মুশতাক হোসেন। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ গণ-আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। তিনিও সুপ্রিম কোর্ট ভবনে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। তার অভিযোগ ছিল প্রধানত তার স্বামী শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদের হত্যায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে। তাঁকে বলা হলো, সাঈদীর বিচারের জন্যে আরেকটি গণ-আদালত বসবে, তখন তিনি হবেন সেই মামলার প্রথম সাক্ষী। তিনি এরপরও আমাদের সঙ্গে থাকেন এবং হেঁটে আসেন সুপ্রিম কোর্ট থেকে সোসাহরাওয়ার্দী উদ্যানে। কুষ্টিয়া থেকে তিনজন বীরাঙ্গনা এসেছিলেন সাক্ষ্য দিতে। ওই পরিস্থিতিতে তাঁরা সাক্ষ্য দিতে পারেননি। তাঁদেরকে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমেছিল উদ্যানে। জামায়াত-সমর্থক পত্রিকায় তাঁদের সম্পর্কে অমার্জিত কটাক্ষ করা হয়েছিল।
দশটা বাজতে না বাজতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষ বিভিন্ন দিক দিয়ে। প্রবেশ করতে শুরু করে। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ও তার কয়েকজন সঙ্গী দুটি ট্রাক সেখানে ঢুকিয়ে দেয়। তা জোড়া দিয়ে তৈরি হয় গণ-আদালতের মঞ্চ। সুপ্রিম কোর্ট ভবন থেকে আমরা হেঁটে যাই উদ্যানে সাড়ে এগারোটা থেকে। বারোটার মধ্যে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমরা যখন প্রবেশ করি, তখন লোকে লোকারণ্য। যদিও আমাদের পথ করে দেওয়া হচ্ছিল, তবু চলতে অসুবিধে হচ্ছিল। আমি একসময়ে পড়ে যাই–বোধহয় হোঁচট খেয়ে। আমার সঙ্গে যারা ছিলেন, তাঁরা ভয় পেয়ে গেলেন এবং আমাকে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিতে বাধ্য করলেন। ফলে আমি অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। বিচারকেরা ট্রাকে উঠেছেন, অন্য এত লোকে তাঁদের সঙ্গে উঠে পড়েছে যে আমরা অভিযোগকারীরা কাছে যেতে পারলাম না। এদিকে নতুন করে মাইক বসানোর চেষ্টা সফল হয়নি। জাহানারা ইমাম একটি ছোটো বক্তৃতা দিয়ে আবদুল মান্নান চৌধুরীকে রায় পড়ে শোনাতে। বলেন। কিন্তু তার আগেই কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন–যদিও তার কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন ছিল না।
গণ-আদালতের সাক্ষ্য ও দাখিলকৃত প্রদর্শনী বিবেচনা করে বিচারকেরা রায়ে বলেন, অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করি এবং আনীত প্রতিটি অভিযোগের প্রত্যেক অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করছি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশে উপরোক্ত অপরাধ দৃষ্টান্তমূলক মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
‘যেহেতু গণ-আদালত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর করে না, সেহেতু গোলাম আযমকে আমরা দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে বাংলাদেশ সরকারের নিকট অনুরোধ জানাচ্ছি।’
একে মাইক্রোফোন নেই, তার ওপর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস, সর্বোপরি ট্রাকে দাঁড়ানো নেতাকর্মীদের কোলাহল–কেউ কিছু শুনতে পেলেন বলে মনে হলো না। কর্তাব্যক্তিরা স্থির করলেন, উদ্যান থেকে প্রেস ক্লাবে গিয়ে জাহানারা ইমাম সাংবাদিকদের কাছে বিচার-প্রক্রিয়া ও রায় ব্যাখ্যা করবেন। তাঁর সঙ্গে আবদুল মান্নান চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, সৈয়দ শামসুল হক, ফয়েজ আহমদ ও মওলানা আবদুল আউয়াল গেলেন, সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জাসদের কয়েকজন নেতাও।
প্রেস ক্লাবে যাওয়ার পরে ধীরস্থির হয়ে বসার আগেই জাহানারা ইমামের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, রায় কী হয়েছে। তিনি বলেন, গোলাম আযমের ফাঁসির আদেশ হয়েছে।
আমি পরে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি এ কথা বললেন কেন–রায়ে তো ফাঁসির কোনো কথা নেই। তিনি বলেন, উত্তেজনাবশত তিনি অমন বলে ফেলেছিলেন–তার ভুল হয়েছে।
