বস্তুতপক্ষে অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা পদত্যাগ করেননি। তিনি উপাচার্য হয়েছেন মাত্র মাসছয় আগে। তার দিক থেকে পদত্যাগ করার কোনো কারণ ঘটেনি। তিনি নিজমুখেও কাউকে বলেন নি যে, তিনি পদত্যাগ করেছেন। ফয়েজ আহমদের কথার জন্যে তিনি তো আর দায়ী হতে পারেন না। সে-কথায় পদত্যাগ করার জন্যে তার ওপরে চাপ যদি কমে যায়, তাতে তিনি কী করতে পারেন!
ফয়েজ আহমদকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ-কাজটি তিনি কেন করতে গেলেন! তিনি বললেন, ছাত্রেরা যেমন চাপ সৃষ্টি করছিল, তাতে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো। সেই পরিস্থিতি এড়াতেই তিনি মুহূর্তের একক সিদ্ধান্তে এমন কাজটি করলেন।
পরবর্তী তিন-চারদিনে আন্দোলন আরো জোরালো হলো, আরো প্রাণহানি ঘটলো। সচিবালয় এবং সরকারি-আধা সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এবারে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে রাজপথে মিছিল করে নামলেন। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলগুলির কাছে নানারকম প্রস্তাব দেওয়া হলো, কিন্তু সরকারের পদত্যাগ ছাড়া অন্য কিছুতে তাঁরা রাজি নন বলে জানিয়ে দিলেন। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতাগ্রহণের জন্য যথেষ্ট প্ররোচণা দিলেন এরশাদ, কিন্তু সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট-জেনারেল নূরউদ্দীন তাকে বলে দিলেন যে, এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সে-পথে পা বাড়াবে না। ৪ ডিসেম্বর জানা গেল, এরশাদ পদত্যাগ করবেন এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদে তিন রাজনৈতিক জোট প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নিয়োগদানে একমত হয়। তাঁর সম্মতি পেতে দেরি হচ্ছিল। তখন বিকল্পের সন্ধান শুরু হয়। মঈদুল হাসানের পরামর্শে আমি এয়ার ভাইস-মার্শাল (অব) এ কে খোন্দকারের নাম প্রস্তাব করি ড. কামাল হোসেনের কাছে। কামাল তখন আত্মগোপনে ছিলেন। এই নাম আলোচিত হতে হতে জানা গেল, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এই দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছেন এই শর্তে যে, দায়িত্বকালশেষে তাকে আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যেতে দেওয়া হবে।
৫ তারিখ রাতের খবরে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, এরশাদ যাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল নামলো রাজপথে। মুহূর্তের মধ্যে বেবী ও আনন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মিছিলে যোগ দিতে। আমি ঘরে বসে রইলাম টেলিভিশন সেটের সামনে। তাতে মানুষের আনন্দের যে-প্রকাশ দেখা গেল, তা বহুকাল দেখিনি।
৬ তারিখে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগের জন্যে বেচারি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি পরিস্থিতির বিকল্প সমাধানের প্রস্তাব করছিলেন। সেখান থেকে বের হয়েই তাকে যেতে হলে ক্ষমতার কেন্দ্রে এবং তাকেই প্রথম ক্ষমতা ছাড়তে হলো। রাষ্ট্রপতি তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করলেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।
২২.
এরশাদের পতনের পর সারাদেশে মানুষের মনে যে-উল্লাস ও আশাবাদ দেখা দেয়, তার একমাত্র তুলনা হতে পারে স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পরে দেশবাসীর আনন্দ ও প্রত্যাশার সঙ্গে। ১৯৯০ সালের বিজয় দিবস সংখ্যা সংবাদ-এ ‘এবারে’ নামে আমি একটা ছোটো লেখায় এই আশাবাদের কথা উল্লেখ করে বলেছিলাম, এবারে তাকে কোনোক্রমে মিথ্যে প্রতিপন্ন হতে দেওয়া চলবে না। হায়, ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কত কঠিন!
৩১ ডিসেম্বর কমরেড মণি সিংহের সংগ্রামময় জীবনের অবসান হলো। পুস্পার্ঘ্য দিয়ে আমরা শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলাম।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা যাঁরা হলেন, তাঁদের অধিকাংশই আমাদের চেনাজানা মানুষ, আপনজনই বলা যেতে পারে। তাদের সততা ও যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না। একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন যে অনুষ্ঠিত হবে, সবার মনে সেই প্রত্যয় দেখা দিলো।
এরশাদকে প্রথমে আটক রাখা হয় স্বগৃহে। বিবিসিকে দেওয়া তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি হলে দুর্নীতির দায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলশানের একটি বাড়িকে সাব-জেল ঘোষণা করে সেখানে তাঁকে সপরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। বেশ পরে তাকে স্থানান্তরিত করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। তাঁর দলের অনেকে গ্রেপ্তার হন বটে, কিন্তু জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়।
দেশের সরকারপদ্ধতি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলতে থাকে। আওয়ামী লীগ এবং বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে মতপ্রকাশ করে। বিএনপির স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় না। শেষকালে অবশ্য তারাও সংসদীয় পদ্ধতির আনুকূল্য করে।
নির্বাচনী প্রচারণা প্রায় প্রথম থেকেই শুরু হয়ে যায়। আট দলের শরিকদের মধ্যে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে মতৈক্য না হওয়ায় প্রত্যেক দল স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র পেশ করে। পরে মনোনয়ন-সমন্বয়ের প্রয়াস নেওয়া হয়। তারপরও মনোমালিন্য রয়ে যায়।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, ভোটার তালিকায় বেবীর নাম আছে, আনন্দের নাম আছে, আমার নাম নেই। দিনশেষে সংবাদ-সম্মেলনে ভোটার-তালিকার অসম্পূর্ণতার দৃষ্টান্ত হিসেবে শেখ হাসিনা এই বিষয়টির উল্লেখ করে। কয়েকটি পত্রিকা থেকে ফোন করে আমার কাছে প্রকৃত অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের সচিব আইয়ুবুর রহমানও আমাকে ফোন করে তার অফিসে যেতে বলেন এবং প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দেন।
