আমরা অনেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, সরকারবিরোধী আন্দোলন থামাতে। এই ধরনের পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবেই সরকার তৈরি করেছে, কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হবে না। সাম্প্রদায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলে মূল আন্দোলন আবার গতি পায়। আন্দোলনের একটি মূলকেন্দ্র বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় সরকারি নির্দেশে। সে-নির্দেশ অগ্রাহ্য করে আমরা ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ছাত্রেরাও ক্লাসে আসতে থাকে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিতে বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রধান সিরাজুর রহমান ঢাকায় চলে আসেন। এর আগে বিবিসির সংবাদদাতা আতাউস সামাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারপর এক পর্যায়ে সরকারি আদেশে বাংলাদেশে বিবিসির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিবিসির বহির্বিশ্ব বিভাগের কর্মকর্তারা দেনদরবার করে সে-কার্যক্রম পুনরায় চালু করার অনুমতি পান। খবরের যাথার্থ যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেজন্যে সরাসরি সিরাজুর রহমানকে পাঠানো হয় বাংলাদেশে। তিনি এসে ওঠেন শেরাটন হোটেলে, অবসর পেলেই আমি সেখানে চলে যাই। আমরা পরস্পর খবরাখবর বিনিময় করি, শেরাটনে ও ঢাকা ক্লাবে আড্ডা দিই। অনেক সময়ে শহরের অবস্থা দেখতে যাই একসঙ্গে।
এক বিকেলে সিরাজুর রহমান ও আমি এক রিকশায় যাচ্ছি। জিপিওর কাছে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিল যাচ্ছে মহিলাদের। আমরা দুজনেই প্রায় একইসঙ্গে সেই মিছিলে বেবীকে দেখতে পাই। বেবী যে মিছিলে যোগ দেবে, তা আমার জানা ছিল না। আমার ও বেবীর নাম না করে ঘটনাটি বিবিসিতে প্রচার করেন সিরাজুর রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারপক্ষ ও বিরোধী দলের ছাত্রদের মধ্যে একদিন প্রবল গোলাগুলি হলো। আমরা কলাভবনে আটকে রইলাম অনেকক্ষণ। সামনের রাস্তায় গাড়ি ও লোক-চলাচল বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ সেখানে অবস্থান নিলো। আমার ধৈর্যে আর কুলোচ্ছিল না। বন্ধুদের বাধা অগ্রাহ্য করে কলাভবন থেকে বেরিয়ে পড়লাম। পথচারীদের চলাচলে বাধা দিলেও পুলিশ আমাকে বাধা দেয়নি। সামনে গিয়ে দেখি, আমাদের আবাসিক এলাকার গেটে বহুজন অপেক্ষমাণ। তাদের মধ্যে দর্শন বিভাগের রাশিদা আখতার খান রোরুদ্যমানা। তাঁর মেয়ে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্রী–সেখানেই সে আটকা পড়েছে, বাড়িতে আসতে পারছে না। রাশিদা চাইছেন, নিজে স্কুলে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে, কিন্তু সকলেই তাকে বাধা দিচ্ছেন। আমাকে নির্বিঘ্নে ফিরে আসতে দেখে মেয়েকে উদ্ধার করার ইচ্ছে তার প্রবল হলো। শেষকালে আমি বললাম, স্কুলে কথাবার্তা বলে দেখি, অধ্যক্ষ বা শিক্ষকেরা কী বলেন। দরকার হলে আমি গিয়ে তার মেয়েকে নিয়ে আসবো। স্কুলে ফোন করে কথা বললাম। তারা বললেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই তারা স্কুল থেকে বের হতে দেবেন না। ছাত্রছাত্রীরা যেমন আছে সেখানে, তেমনি আছেন শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীরা। এই অবস্থায় দু-একজন চলে গেলে বাকিদের ধরে রাখা কষ্টকর হবে। খুবই যুক্তিসংগত কথা। রাশিদাকে আমি বোঝালাম। পরে তাঁর মেয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে এসেছিল।
এদিকে সংবাদপত্রের ওপর সেনসরশিপ আরোপ করলো সরকার : সাংবাদিকদের রিপোর্ট ছাপাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। এই আদেশের প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা ধর্মঘট করলেন, কালো ব্যাজ পরে মিছিল করলেন। পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেল। কেউ বললেন, এতে সরকারেরই লাভ হলোদেশবাসী সত্য খবর জানুক, এটা তারা চায়নি; এখন লোকের কাছে খবর পৌঁছোনোই বন্ধ হয়ে গেল। কেউ বললেন, কোনো দেশে সাংবাদিকেরা পত্রিকা প্রকাশ করতে অস্বীকার করছে, এটা এত বড়ো খবর এবং সরকারের এত বড়ো নিন্দাবাদ যে সারা পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের বাস্তবচিত্র সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে গেল।
ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরেও সান্ধ্য আইন জারি হলো। পুলিশ অথবা সরকারি মাস্তানের গুলিতে রোজই মানুষ প্রাণ দিতে থাকলো। সবচেয়ে উত্তেজনাকর হলো ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড। সমস্ত দেশ এতে স্তম্ভিত হয়ে গেল, প্রতিবাদের ঢেউ উঠল, সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বাজল।
২৯ নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে শিক্ষক সমিতির সভায় স্থির হলো যে, আমরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, একযোগে পদত্যাগ করবো। আমাদের মধ্যে দু-একজন প্রশ্ন তুললেন, উপাচার্য পদত্যাগ করবেন কি না। আমি বললাম, এটা তাঁর বিবেকের বিষয়; আমাদের পদত্যাগের সঙ্গে তাঁর পদত্যাগের প্রশ্নটি জড়িত করা ঠিক হবে না। আমার কথাটি সকলে মেনে নিলেন। সভাশেষে আমরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে রওনা হয়ে গেলাম। কার্জন হল পার হতেই পুলিশের বাধা। প্রথমে আমাদের গতিরোধ। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকায় একটু পরে আমাদের ওপরে উপর্যুপরি কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া। মুহূর্তমধ্যে সংকল্প ত্যাগ করে আমরা পশ্চাদপসরণ করলাম। সহকর্মীরা কেউ কেউ রাস্তার ওপরেই পড়ে গেলেন। তাদের ধরে তুলে আমরা আবার ক্লাবে ফিরে এলাম। আমাদের পদত্যাগের খবর দেওয়া হলো বিবিসিতে।
পরদিন সকালে কলাভবন-প্রাঙ্গণে শিক্ষকেরা জড়ো হলেন, তবে আগের দিনের চেয়ে অনেক কম সংখ্যায়। হলগুলো থেকে এবং বাইরে থেকে ছাত্রেরা জড়ো হতে হতে এক বিশাল সমাবেশ হয়ে গেল। পদত্যাগ করায় শিক্ষকদের অভিনন্দন জানালো ছাত্রেরা, তারা দাবি করলো উপাচার্যের পদত্যাগ। সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ সেখানে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আকস্মিকভাবে তিনি অবতীর্ণ হলেন ত্রাতার ভূমিকায়। কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে তিনি উপাচার্য ভবনে গেলেন এবং ছাত্রদের নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে একা উঠে গেলেন দোতলায়। কিছুক্ষণ পরে নেমে এসে ঘোষণা করলেন, উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। ছাত্রদের প্রবল হর্ষধ্বনি। বিবিসির সংবাদে উপাচার্যের পদত্যাগের সংবাদ প্রচার।
