কয়েকদিনের মধ্যে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে এই ঘটনা অনেকখানি ক্রিয়াশীল ছিল। তাঁর শরীর খারাপ হওয়ায় তাঁর স্ত্রী আমাকে খবর দিতে চান–ভাবির পক্ষে সেটাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু আবু হেনা নিষেধ করেছিলেন। তিনি চৈতন্য হারিয়ে ফেলার পরে আমি খবর পাই। বেবী ও আমি তখনই তাঁর বাসায় যাই। তার পরপরই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় হৃদ্রোগ ইন্সটিটিউটে। আমিও তার অনুগমন করি। অল্পকাল পরে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, আর কিছু করার নেই।
সেটা ছিল ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর।
পরে বাংলা একাডেমী আমাকে আবু হেনা মোস্তফা কামাল-রচনাবলী সম্পাদনার দায়িত্ব দেয়। বিশ্বজিৎ ঘোষের সহযোগে আমি তা করেছি। এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে (২০০১), দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। তার আগে শিল্পকলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত তাঁর গানের সংকলন আমি সাগরের নীলের ভূমিকাও আমি লিখেছি–তার পরিবারের ইচ্ছাক্রমে।
২১.
১৯৮৯ সালের শেষদিকে একবার কলকাতায় গিয়েছিলাম। কাজ ছিল টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দেওয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের গোলাম মুস্তাফাও সেখানে আমন্ত্রিত বক্তা ছিল।
এক ফাঁকে মুস্তাফাঁকে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি যাই। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বললেন, এবার ঢাকায় যাচ্ছি।
উৎসাহিত হয়ে জানতে চাইলাম, তাই নাকি? কী উপলক্ষে?
কবি বললেন, ‘এশীয় কবিতা উৎসবে।’
আমার উৎসাহে ভাটা পড়ল। বললাম, এ তো প্রেসিডেন্ট এরশাদের শো। আপনি যাবেন?
সুভাষ বললেন, ‘কতদিন ধরে তোমরা এরশাদকে সরাবে-সরাবে বলছ। কিছু তো করতে পারছ না! আমি আর কতদিন ঢাকায় না গিয়ে থাকব!’
তার কথার সত্যতা স্বীকার করতেই হয়।
দ্বিতীয় এশীয় কবিতা-উৎসবে সুভাষ মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন নভেম্বর মাসে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কবিতা-উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ছাড়া তাকে অধিকার করে রেখেছিল সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সে বাবা বলে সম্বোধন করত।
১৯৯০ সালে কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রবল হলো। ছাত্রদের ধর্মঘট ও সংঘর্ষ, চিকিৎসকদের ধর্মঘট, আইনজীবীদের প্রতিবাদ, শ্রমিক-সংঘর্ষ, পরিবহণ-ধর্মঘট, ছাত্র-পুলিশ সংঘাত, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, হরতাল–এসব লেগেই রইল। অক্টোবর মাসে সারাদেশে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের কর্মসূচি পালিত হলো।
ঠিক সেই সময়ে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় বড়ো বড়ো অক্ষরে খবর ছাপা হলো : বাবরি মসজিদ বিধ্বস্ত।
বাবরি মসজিদ নিয়ে অযোধ্যায় সংঘাতময় পরিস্থিতি গড়ে উঠেছিল কিছুকাল ধরেই। কিন্তু মসজিদটি তখনো বিধ্বস্ত বা আক্রান্ত হয়নি। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তা। ভেঙে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়েছে–তাদের সঙ্গে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ। পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ, কিন্তু বিস্ফোরণ তখনো ঘটেনি।
ইনকিলাবেমিথ্যা সংবাদের সঙ্গে ছিল উত্তেজনাকর সম্পাদকীয়। যেদিন এটা প্রকাশ পেল, ৩০ অক্টোবর, সেই রাতেই চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। দাঙ্গা নয়, নির্যাতন।
পরদিন, শুনেছি, মিথ্যে খবর ছাপানের দায়ে ইনকিলাব্বে কৈফিয়ত চায় সরকার। মওলানা মান্নান তাঁর পুত্রকে নিয়ে–তিনিই পত্রিকার সম্পাদক-রাষ্ট্রপতি এরশাদের দরবারে হাজির হন। সম্পাদক কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা চান এবং ভ্রম-সংশোধনী ছাপবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। ৩১ অক্টোবর কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছোটো করে তা ছাপা হয়। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সব ব্যাপারটা ছিল লোক-দেখানো এবং ৩১ তারিখে নাকি স্বল্পসংখ্যক ইনকিলাব মুদ্রিত হয়। ওই সংশোধন এবং ক্ষমাপ্রার্থনা কোনো কাজে আসেনি।
ঢাকায় সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা লেগে যাওয়ার আশঙ্কায় ৩১ তারিখ সকালেই আমরা প্রেস ক্লাবে জড়ো হলাম। কিন্তু করণীয় নির্ধারণ করতে আমাদের অহেতুক বিলম্ব হয়। দাঙ্গাবিরোধী মিছিল নিয়ে আমরা প্রেস ক্লাব থেকে শাঁখারিবাজারে যাই, সেখান থেকে ফিরে আসি প্রেস ক্লাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমরা বের হবার আগেই বিজয়নগরে মিষ্টির দোকান লুঠ হয়, নারিন্দায় বাড়ি আক্রান্ত হয়, ইসলামপুরে স্বর্ণালঙ্কারের প্রতিষ্ঠান লুষ্ঠিত হয়–তার মধ্যে মুসলমানের মালিকানাধীন দোকানও ছিল। ক্রমে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতির অবনতি হয়।
আমাদের মিছিলে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। কোতোয়ালি থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে শান্তিরক্ষা সম্পর্কে আমাদের আলোচনা। ভালোই হয়েছিল, কিন্তু আমাদের অনেকেরই মনে হয়, পুলিশকে যথেষ্ট সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ তখনো ওপর থেকে আসেনি। তবে ৩১ অক্টোবরেই কয়েকটি পাড়ায় শান্তিরক্ষার জন্যে স্কোয়াড গঠন করা সম্ভবপর হয়েছিল। ‘
শেষ পর্যন্ত ওইদিনেই সান্ধ্য আইন জারি হয়। পরদিন কিছুক্ষণের জন্যে শিথিল করে আবার তা প্রয়োগ করা হয়। কারফিউ প্রত্যাহার করা হলেও কোতোয়ালি, সূত্রাপুর ও লালবাগ থানা এলাকায় বলবৎ করা হয় ১৪৪ ধারা। পরে এই ধারার অধীন থানার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
১৪৪ ধারা জারি করায় শান্তিমিছিল বেরোনোর অসুবিধে হয়। তবু যেখানে ১৪৪ ধারা ছিল না, সেখানে মিছিল হয় এবং যেখানে তা ছিল সেখানেও শান্তিরক্ষার উদ্যোগ চলতে থাকে। সম্মিলিতভাবে শান্তিমিছিল বের হয় ৮ নভেম্বরে। ততদিনে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে, কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘুর আস্থা ভয়ানকভাবে বিচলিত হয়।
