আমি তাকে আমাদের ঢাকার অনুষ্ঠানের কথা বললাম। তিনি হাসলেন। করমর্দনের সময়ে হাতে মৃদু চাপ দিয়ে চলে গেলেন।
পরদিন সকালে নাশতা খেতে যাচ্ছি। দেখি, মাদাম বিন্ আমার সামনে। তিনি বসতে বললেন, তার টেবিলে। আমি কাছে এসে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি আবার বললেন, বোসো।
বললাম, আপনি আগে বসুন। প্যারিস সম্মেলনে বসা নিয়ে কী কাণ্ডই না আপনি করেছিলেন!
মাদাম বিন্ হাসলেন। বললেন, তখন আমি শত্রুদের সঙ্গে বসতে যাচ্ছিলাম। আর এখন তো বন্ধুদের সঙ্গে বসছি। এখন আমার তো কোনো শর্ত থাকার কথা নয়।
তিনি খুব আন্তরিকভাবে আমাকে ভিয়েতনামে আমন্ত্রণ জানালেন। তবে যাওয়া তো সহজ নয়। অল্পকালের মধ্যে মাদাম বিন ভিয়েতনামের উপরাষ্ট্রপতি হয়ে যান। তখন তার নিমন্ত্রণের কথা আবার মনে পড়ে।
সেমিনার ভালোই হলো। আমার লেখাটি বড়ো হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত নির্ধারিত সময়ে আমি বক্তব্য শেষ করতে পারি। এবার পারিনি। সভাপতির তাড়া খেয়ে এত দ্রুত পড়তে লাগলাম যে, যে-মহিলা ইংরেজি-আরবি দোভাষী, তিনি ইংরেজিতেই বললেন, ‘হি ইজ রিডিং টুউ ফাস্ট ফর মি।’ তারপর থেমে গেলেন।
নিজের স্বভাববিরুদ্ধ আচরণে অনুতপ্ত হয়েছিলাম। তবে লেখাটি অনেকের ভালো লেগেছিল। বিদ্যাশেখরা বললো, প্রফেসর, তুমি তো দেখছি থিসিস লিখে ফেলেছ।
কায়রোতে সেই আমার প্রথম সফরে দ্রষ্টব্য অনেক কিছু দেখলাম। নীল নদ, পিরামিড, স্ফিংস। সন্ধ্যার পর হোটেলে আড্ডা।
আপসোর সভাপতি ড. মোরাদ গালিব এককালে মিশরের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। আনোয়ার আবদেল-মালেকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা তাঁকে বললাম। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ছেলেটি ভালো।
আনোয়ার আবদেল-মালেক যদি তার কাছে ছেলে হয়, তাহলে আমি তো এখনো জন্মাই নি! আর কথা বাড়ালাম না।
২০.
মৃত্যুর আগে আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে যে আবার আমার মনোমালিন্য হয়ে গেল, সে কথা ভাবতে এখনো খারাপ লাগে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি খুশিই ছিলেন। উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরীর সৌজন্যে মহসিন হলের প্রোভোস্ট নিযুক্ত হন তিনি, প্রশস্ত বাসগৃহ পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করেন। কিন্তু তার মধ্যে অস্থিরতা ছিল, নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল, নানাক্ষেত্রে নিজের দক্ষতাপ্রমাণের অভিপ্রায় ছিল। তাই যখন আমন্ত্রণ পেলেন শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালকের পদে যোগ দেওয়ার, তখন শিক্ষকতা থেকে ছুটি নিলেন। সেখান থেকে হলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তিনি উদযোগ নিয়ে আমাকে বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য করলেন এবং একাডেমির নানাকাজে যুক্ত করলেন। এর মধ্যে একটি ছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাংলা বৈদ্যুতিক টাইপরাইটারের কী-বোর্ড তৈরির কাজ। একইসঙ্গে কী-বোর্ডের বিন্যাস এবং হরফের আদলসৃষ্টি। বিন্যাসের বিষয়ে মূল কাজটি করলেন জামিল চৌধুরী। মুনীর অপটিমার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে ছিল, তার বিন্যাস সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের কিছু সমালোচনা বা পরামর্শ আমরা গণ্য করেছিলাম। হরফের বিষয়ে কাইয়ুম চৌধুরীকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করে একাধিক নমুনা আঁকিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে আমরা তখনই প্রশ্ন তুলেছিলাম, কম্পিউটারে বাংলা সফটওয়্যারের উদ্ভাবনের বিষয় যখন আমাদের চিন্তা করা উচিত, তখন আমরা ইলেকট্রিক টাইপরাইটারের জন্য চেষ্টিত হচ্ছি কেন? দেখা গেল, মন্ত্রণালয় মনে করছে, কম্পিউটারে বাংলার ব্যবহার করতে সময় নেবে, ততদিনে ইলেকট্রিক টাইপরাইটারের ব্যবহার আমাদের কাজে গতি দেবে।
আবু হেনা আরেকটি কাজে আমাকে যুক্ত করেছিলেন–বাংলা ভাষাপ্রয়োগে সাধারণ ভুলগুলো সংকলন করে সকলের সামনে তুলে ধরা। এখানে মোহাম্মদ আবদুল কাইউম আমাদের সঙ্গে ছিলেন, একাডেমির একাধিক কর্মকর্তাও এতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ (১৯৮৭) নামে বইটি যখন বের হলো, তখন তা সমাদৃত হয়।
‘সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা’র আদলে বাংলা একাডেমী থেকে জীবনী গ্রন্থমালা’র প্রকাশও ছিল আবু হেনার নিজের পরিকল্পনার অংশ। তিনি আমাকে দিয়ে মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯৮৮) বইটা লিখিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা’য় যাদের জীবনী আছে,
‘জীবনী-গ্রন্থমালা’য় তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। একাডেমীর কর্মকর্তারা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে, পূর্ববাংলায় জন্মগ্রহণকারী যেসব সাহিত্যিকের জীবনী চরিতমালা’য় আছে, তাঁদেরও নতুন জীবনী লেখার সুযোগ আছে এবং সেক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে পুনরাবৃত্তি বলে মনে হলেও এঁদের নতুন জীবনী প্রকাশ করা উচিত। সেটাই হয়েছিল।
এই দৃষ্টান্তটি ব্যতিক্রম হিসেবেই গণ্য হতে পারে, সাধারণত তিনি আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায়ও তিনি অনেক সময়ে প্রকাশ্যেই আমার মতামত প্রথমে শুনতে চাইতেন। একবার একটি বইয়ের সংকলন ও মুদ্রণ নিয়ে একজন পরিচালকের কাজে গাফিলতির অভিযোগ আনলেন এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের প্রস্তাব করলেন। কাজের ত্রুটি দৃশ্যমান ছিল। আমি বললাম, আগে পরিচালকের কৈফিয়ত চাওয়া হোক, সেটা সন্তোষজনক না হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তিনি ভাবলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে আমি পরিচালকের পক্ষ নিচ্ছি মহাপরিচালকের মতের বিরুদ্ধে। তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। আমি বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া অসংগত হবে–তা তার ত্রুটি যত বড়ড়াই হোক না কেন। আমার বাধাদানের কারণেই পরিষদের ওই সভায় সেই পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, কিন্তু আবু হেনা খুবই খারাপ বোধ করলেন, এটাকে তার পরাজয় হিসেবে দেখলেন, তাঁর মধ্যে প্রবল তিক্ততা দেখা দিলো।
