খানিক বাদে মূর্তিমান সশরীরে হাজির। চেহারা দেখে বোঝা গেল, বকুনি খেয়েছে। হাসি-হাসি মুখ করে বলতে থাকলো, সে সময়মতোই বিমানবন্দরে গিয়েছিল, আমাদের পায়নি। বোধহয় একদিকে সে খুঁজেছে, অন্যদিক দিয়ে আমরা বেরিয়ে এসেছি।
মোস্তাফিজ যখন জানালেন যে, আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, তারপরও সে ভাঙে কিন্তু মচকায় না।
ছেলেটি যে স্বভাবতই মিথ্যেবাদী, তার পরিচয় সে পরেও দিয়েছে। তার ওপর সে পাশ্চাত্যজগতের পরম ভক্ত। মুখে বলছে বটে তার অনুরাগ পাশ্চাত্য সংগীতে (তার মধ্যে তো রুশ সংগীতজ্ঞেরাও আছেন), কিন্তু পাশ্চাত্য জীবনযাত্রার যতটুকু সে জেনেছে তার সবটুকুই তার ভালো লেগে গেছে। তার মতে, স্বদেশে সেই প্রাণশক্তির প্রকাশ নেই, যা পশ্চিমে আছে।
আমি কোন কোন দেশে গেছি, তা সে সাগ্রহে জানতে চায়। ফ্রান্সে গেছি শুনে সে এমন ভাববিহ্বল হয়ে পড়ে যেন আমার পাদুকাযুগলের পূজা করবে।
১৯৭৩ সালে যে-ছেলেটি আমাদের দোভাষী ছিল, তার কথাবার্তার বিষয়, রসবোধ, চালচলনের সঙ্গে এর এমনই পার্থক্য যে, দু-একজনকে দিয়ে একটা দেশের বিচার করা অনুচিত জেনেও আমার মনে হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত পতনের দিকে ধাবমান।
মস্কোর হোটেলে মাদাম গুয়েন থি বিনের সঙ্গে দেখা হয়। তার সঙ্গে আগের বছরে দেখা হয়েছিল দিল্লিতে। ভিড়ের মধ্যে পরিচয় হয়েছিল–কথাবার্তার তেমন সুযোগ হয়নি। এবারে হলো।
ভদ্রমহিলা বয়সে আমার বছর দশেক বড়ো হবেন। ফরাসি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন ছাত্রাবস্থায়। কমিউনিস্টদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অপরাধে জেল খেটেছেন কয়েক বছর। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টে যোগ দিয়ে দ্রুত তার নেতৃস্থানীয় পদে উন্নীত হয়েছেন। দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। পূর্বাপর প্যারিস শান্তি আলোচনায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শেষ দফা আলোচনায় টেবিল ঘিরে কীভাবে বসা হবে, সে-সম্পর্কে আপত্তি তুলে সভার কাজ বন্ধ রেখেছিলেন দীর্ঘক্ষণ। তাঁর দৃঢ়চিত্ততা পাশ্চাত্য সাংবাদিকদের প্রশংসা অর্জন করেছিল।
মস্কোতে তাকে আমি দেখলাম অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র, মৃদুভাষী মানুষ হিসেবে। এমনিতে গম্ভীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ রসবোধেরও পরিচয় দেন। তাঁকে আমার খুবই ভালো লাগতে থাকে।
লেখালেখির কাজ আমি কখনোই সময়মতো শেষ করতে পারি না। মস্কোতে ঘোরাঘুরি বাদ দিয়ে হোটেলের কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ রেখে প্রবন্ধ লিখি। আর প্রায় সেভাবেই পৌঁছে যাই কায়রোতে। সেখানে নেমে আমাদের ভিসা পাওয়ার কথা–তাতে একটু দেরি হয়।
হোটেলে পৌঁছে দেখি, ঘরে দুটো আমন্ত্রণপত্র রাখা। সেদিনই বিকেলে আফ্রিকা হাউজে নেলসন মান্ডেলা বক্তৃতা দেবেন। রাতে মান্ডেলাকে মিশরের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবর্ধনা দেবেন এক হোটেলে। ২৮ বছর পর কারাগার থেকে বেরিয়ে এটাই বোধহয় তাঁর প্রথম বিদেশসফর।
গত বছরে নেলসন মান্ডেলার মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশ আপসোর পক্ষ থেকে খুব ভালো একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম আমরা ইন্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউশনে। এতে আমাদের প্রধান সহায় ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে মান্ডেলার বিবৃতির কিছু কিছু অংশ আমি। অনুবাদ করে দিয়েছিলাম। কবরী সারোয়ার প্রমুখ কয়েকজন শিল্পী তা পাঠ করেছিল। আমার অনুরোধে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান একটি গান রচনা করেছিলেন–তাতে সুর দিয়ে গেয়েছিল বেবী নাজনীন। পরে ডা. সাইদুর রহমান এই অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রদর্শন করেছিলেন আপসোর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সকলেই তা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে যার মুক্তির দাবি জানিয়েছিলাম, সেই লোকনায়কের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনায় রোমাঞ্চিত হলাম বই কি!
কোনোমতে চা খেয়েই দৌড় দিলাম আফ্রিকা হাউজে। যানজটের কারণে বেশ খানিকটা আগে নেমে যেতে হলো। আফ্রিকা হাউজে পৌঁছে দেখি, লোকে লোকারণ্য-তিলধারণের জায়গা নেই। মান্ডেলা তখনো আসেননি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমরা ঠিক করলাম, বরঞ্চ সংবর্ধনার জায়গায় চলে। যাই আগে আগে।
সেখানেও মান্ডেলার আসতে দেরি। পান-পর্বের শেষে ভোজের সূচনা হয়ে গেল। মান্ডেলা পৌঁছোলেন না। অতিথিরা বিদায় নিতে শুরু করলেন। কেবল আমরা কয়েকজন মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম।
অতিথিদের ভিড় কম হলে নিমন্ত্রণকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো। পাতলা গড়নের লম্বা মানুষ, সদালাপী, নিরহংকার। কূটনৈতিক শিষ্টাচারে পারদর্শী বলে যার সঙ্গে কথা বলেন, মনে হয়, তার সম্পর্কে কিংবা তার দেশ বা পরিপার্শ্ব সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।
অল্পকাল পরে জাতিসংঘের নতুন সেক্রেটারি-জেনারেল বুট্রোস বুট্রোস গালির ছবি যখন দেখলাম খবরের কাগজে, তখন বুঝতে পারলাম, কায়রোর সেই রাতের নিমন্ত্রণকর্তা ছিলেন তিনিই। আমি তার নাম মনে রাখতে পারিনি।
সেই রাতে অবশেষে মান্ডেলা এলেন। এসেই মাফ চাইলেন। বললেন, কোথাও তিনি সময়মতো যেতে পারছেন না, সময়মতো বের হতে পারছেন না। মানুষের ভালোবাসা, কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা তাঁর কর্মসূচি নষ্ট করে দিচ্ছে।
মান্ডেলা দেরি করে আসায় আমাদের লাভ হলো। তিনি প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলার শ্রম স্বীকার করতে পারলেন।
