ইনস্টিটিউটের পরিচালক কথাপ্রসঙ্গে বললেন, দেখুন, আমাদের গবেষণাক্ষেত্রে বহু বাধা, বহু বিঘ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে মেধাবী ছাত্রকে আমি নিয়োগ করতে চাইবো। আমি তাকে যে-মাইনে দেবো, ট্রাক-ড্রাইভার হলেও সে তার কয়েকগুণ বেশি পাবে। কেন সে গবেষণা করতে আসবে? আপনি তো আমাদের জার্নালের সঙ্গে পরিচিত। সরকার বলছে, তোমরা স্বাবলম্বী হও, যত্র আয় তত্র ব্যয় করো। আপনি বলুন, পৃথিবীর কোন গবেষণা পত্রিকার আয়-ব্যয় সমান। আমরা ভাবছি, ইংরেজি জার্নালটা বন্ধ করে দেবো।
বলেন কী! তাহলে অন্য দেশের বিদ্বানেরা কী করে আপনাদের গবেষণার খোঁজ-খবর রাখবে?
রুশ ভাষার জার্নালটা তো বন্ধ হতে দিতে পারি না। যারা রুশ জানে, তারা আমাদের গবেষণার খবর পাবে। এক-আধটা অ্যাবসট্রাক্ট আছে ইংরেজিতে–তারা আমাদের গবেষণা-প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ ছাপে। তাতে যতটুকু চলার, ততটুকু চলবে। আমি আর কী করতে পারি!
হোটেলের রেস্টুরেন্টে অনেক রুশ দেখি। সোভিয়েত আপসোর এক কর্মকর্তা বললেন, মনে হয়, এরা নব্য ধনী। ব্যবসা করে দু-পয়সা করেছে। একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না। আমাদের যেসব ব্যবসায়ী স্মাগলিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছে বাংলাদেশি তরুণদের খুব সমাদর। বাংলাদেশি আর প্যালেস্টিনিয়ানদের। বিমানে করে ওদের সিঙ্গাপুর-হংকং পাঠায়, ওরা সেখান থেকে জিনিসপত্র স্মাগল করে নিয়ে আসে–খুব পটু এ ব্যাপারে। ধরা না পড়লে তারাও বেশ করে খাচ্ছে। তোমার দেশের অনেক ছেলেই এখন লেখাপড়া স্থগিত রেখে এই কাজে নেমেছে। নগদ পয়সার বিকল্প নেই।
আমি ভাবি, সোভিয়েত ইউনিয়ন কোথায় যাচ্ছে!
সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানেই যাক, আমাকে যেতে হবে এডেন বন্দরে–জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী ইয়েমেনের রাজধানী এডেনে।
শৈশব থেকে এডেন বন্দরের নাম শুনে আসছি–পাঠ্যপুস্তকে ও সংবাদপত্রে তার কথা পড়ে আসছি। এডেনের ডাকটিকিট ও ধাতব মুদ্রা দুইই এক সময়ে আমার সংগ্রহে ছিল। উনিশ শতকে ব্রিটিশ অধিকারে চলে যাওয়ার পরে এডেন কিছুকাল শাসিত হয়েছিল বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত এলাকা হিসেবে, তারপর তা ভারতে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চলে যায় এবং আরো পরে একটি স্বতন্ত্র ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। বন্দরটি ইয়েমেনের একেবারে দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত। ষাটের দশকে ইয়েমেন রাজ্য উত্তর-দক্ষিণে দু ভাগ হয়ে যায়। উত্তরের ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র পাশ্চাত্যের এবং দক্ষিণের ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র সোভিয়েত বলয়ের প্রভাবাধীন হয়। সত্তরের দশকের শেষে দুই অঞ্চলে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সম্প্রতি দুই দেশের একত্রীকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ দেশের সংবিধান প্রণীত হয়েছে মাত্র আগের মাসে। আর কয়েক মাসের মধ্যেই দুই দেশ এক হয়ে প্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন গঠন করবে। তখন উত্তরের সানা হবে ইয়েমেনের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক রাজধানী, আর এডেন হবে তার অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক রাজধানী।
এডেনে গিয়ে আমি দেখতে পাই আসন্ন একত্রীকরণের নানা নিশানা। চারদিকে উৎসবের একটা ভাব। তা থেকে মনে হয় একত্রীকরণের সম্ভাবনায় লোকজন খুশি। উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাললা–তার সুফল গোটা রাজ্যে পড়বে বলে অনেকে আশা করছে। অনেকে আবার ভাবছে, বাজার অর্থনীতির চাপে যখন দক্ষিণের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধসে যাবে, তখন উত্তরের সামাজিক বৈষম্য দক্ষিণেও আসন গেড়ে বসবে।
এডেনের সভায় কী আলোচনা হয়েছিল, তা এখন মনে নেই। তবে ওখানকার দিনগুলো যে ভালো কেটেছিল, তা মনে আছে।
১৯.
কয়েক মাসের মধ্যে আমন্ত্রণ এলো কেন্দ্রীয় আপসো থেকে। বান্দুংয়ের ৩৫ বছরপূর্তি-উপলক্ষে কায়রোতে আন্তর্জাতিক সেমিনার। তাতে বাংলাদেশ থেকে দুজনকে নিতে চান তাঁরা, তার মধ্যে একজনকে লিখিত প্রবন্ধ পড়তে হবে। ঠিক হলো, মোস্তাফিজুর রহমান (এখন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক) আর আমি যাবো, তবে লেখাটা আমাকেই তৈরি করতে হবে। এবারো কায়রো যাতায়াত করতে হবে মস্কো হয়ে।
মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছে এবার লক্ষ করলাম, আমাদের সহযাত্রী বাঙালি তরুণের অনেকের সঙ্গেই মোটা মোটা বোঁচকা। আগেরবার চোরাচালানের বিষয়ে যা শুনেছিলাম, তা মনে পড়ল।
মস্কোতে কেউ আমাদের নিতে আসেনি। মোস্তাফিজ এখানে লেখাপড়া করেছেন, রুশ ভাষা তার অধিগত। তিনি একটু হাঁটাহাঁটি করলেন, এখানে সেখানে খবর নিলেন, কোনো লাভ হলো না। বসে বসে কিছুটা সময় কাটাবার পর ভোর হলো। তদ্দণ্ডেই দ্বিজেন শর্মাকে ফোন। তিনি তখনি তাঁর বাড়িতে চলে আসতে বললেন।
একটা ট্যাকসি নিয়ে তাঁর বাড়ি পৌঁছোনো গেল। মুখহাত ধুয়ে নাশতা-পর্ব সারা হলো। খানিক পরে দ্বিজেন ফোন করলেন আপসোর দপ্তরে। তারা বললেন, আমাদের লোক তো থাকার কথা এয়ারপোর্টে। ঠিক আছে, ওঁদেরকে আপনার বাড়িতেই অপেক্ষা করতে বলুন। আমাদের অফিস থেকে আর কেউ গিয়ে ওঁদের হোটেলে পৌঁছে দেবে।
হোটেলে যিনি পৌঁছে দিলেন, তিনি অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন। এমন তো হয় না, এমন হওয়ার কথা নয়। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট দোভাষীর উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিমানবন্দরে। সে বলছে, গিয়ে আমাদের পায়নি। যা হোক, সে এখনি এসে পড়বে হোটেলে।
