পুলিশ ও গোয়েন্দাবিভাগকেও এই নির্বাচনের বিষয়ে উৎকণ্ঠিত মনে হলো। আরো মনে হলো, নির্বাচনে বিরোধী দলীয় ছাত্রদের বিজয় যে অবধারিত, সরকার তা বুঝে গেছেন। সেক্ষেত্রে ছাত্রদলের চেয়ে ছাত্রলীগ তাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য।
নির্বাচনে ডাকসুতে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্যানেল জয়ী হলো।
ফলাফল ঘোষণার পরে শিক্ষার্থীদের বিজয়-মিছিল বের হয় ক্যাম্পাসে। রোকেয়া হল থেকে ছাত্রীদের যে-মিছিল বের হয়, সেটি সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত হয়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে সভাপতি করে তিন সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করেন বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ। আমরা রোকেয়া হলে গিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করি। দেখা যায়, তদন্ত কমিটির কাছে কারা আসছে, দূর থেকে কিছু ছাত্রী তা লক্ষ করছে।
এক ছাত্রী সে-কথাই বললো তদন্ত কমিটির কাছে। আমি যে সাক্ষ্য দিতে আসছি, সেটা দেখছে সবাই। আপনারা কি আমার নিরাপত্তা দিতে পারবেন?
কবুল করতে হলো, আমরা নিরুপায়। সে-মেয়েটি প্রত্যয়ের সঙ্গে বললো, ‘এসব তদন্তে কিছু হবে না, সার। যারা আমাদের মারধর করেছে, তারা বহালতবিয়তে আছে। তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিলে পরিণাম ভালো হবে না বলে শাসাচ্ছে। ভয়ে কেউ সত্য কথা বলতে আসছে না। তাছাড়া ওরা এত শক্তিশালী, ওদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যাবে না।’
এরপরও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আমরা যা আঁচ করতে পেরেছিলাম, তার। ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করা হলো, কাউকে কাউকে ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত করাও গেল।
কিন্তু, সাক্ষ্যদাতা মেয়েটি যেমন আশঙ্কা করেছিল, এ-সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হলো না। ব্যবস্থা নিতে গেলে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। বলে কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করেছিলেন।
ওই মেয়েটি পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী হয়েছিল। আমাদের রিপোর্টে যার সম্পর্কে গোলযোগে সংশ্লিষ্টতার সর্বাধিক অভিযোগ আনা হয়, সে মেয়েটিও যথাসময়ে আমাদের সহকর্মী হয়েছিল।
১৮.
জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী ইয়েমেনের আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদ (আপসো) থেকে আকস্মিকভাবেই আমন্ত্রণ এসে গেল। এডেনে তাঁরা এক আন্তর্জাতিক সভা আহ্বান করেছেন–তাতে যোগ দিতে হবে। তাদের চিঠি নিয়ে ঢাকায় এরোফ্লোত অফিসে যেতেই টিকিট পাওয়া গেল–যাতায়াত করতে হবে মস্কো হয়ে। বোঝা গেল, টিকিটটা আসছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৌজন্যে। তাতে ভালোই হলো। সেই ১৯৭৩ সালে রাশিয়া গিয়েছিলাম, তারপর কত বছর ওমুখো হইনি।
১৯৯০ সালের জানুয়ারি। প্রচণ্ড শীত মস্কোতে। অবশ্য খোলা আকাশের নিচে বের না হলে ঠান্ডা বোঝার উপায় নেই। এডেন যাওয়ার পথে দুদিন এবং ফেরার পথে একদিনের কম থাকার কথা। সোভিয়েত অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের ইনসটিটিউট অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিজের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে রেখেছেন কর্তৃপক্ষ–তাছাড়া সবটা সময়ই আমার নিজের।
যে-তরুণীটি আমার দোভাষী, মনে হলো, সে একটু দায়সারাভাবে কর্তব্য পালন করছে। আসতে একটু দেরি করে ফেলে, চলে যেতে চায় তাড়াতাড়ি। এক সন্ধ্যায় প্রশ্ন করলো, আমার কুপন দিয়ে হোটেল থেকে খাবার নিয়ে যদি চলে যাই, আপনি কি কিছু মনে করবেন?
বললাম, মনে করার কি আছে? আমার সঙ্গে খাওয়া তোমার পক্ষে আবশ্যিক হতে পারে না।
সে বললো, আমি যে খাবার নিয়ে চলে গেলাম, অনুগ্রহ করে তা কাউকে বলবেন না।
বললাম, আমার তো মনে হয় না, এটা একটা আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
যেটা তাকে বললাম না কিন্তু স্পষ্ট বুঝলাম, সে নিয়ম ভঙ্গ করছে এবং নিয়মভঙ্গের বিষয়টা স্বভাবতই গোপন রাখতে চাইছে।
এর পরে বুঝলাম, মেয়েটি সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। এই যে শুনতে পাই স্কুল থেকেই এদের মগজ ধোলাই শুরু হয়, সে-ব্যবস্থা বোধহয় এর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
পথে যেতে খাদ্যসামগ্রীর দোকানে লম্বা লাইন দেখি। আমার প্রশ্নের উত্তরে দোভাষী বলে, আমাদের এমন লম্বা লাইন দিয়েই জিনিসপত্র কিনতে হয়। মস্কোতে যত দোকান দেখবেন, সর্বত্রই এ রকম অবস্থা। শুধু রাইসাকে (গর্বাচেভের স্ত্রী) কিউতে দাঁড়াতে হয় না। তার জন্যে অন্য ব্যবস্থা। হয়তো
আরো দু-একজনের জন্যে। কিন্তু আপামর জনসাধারণকে ভোগ্যপণ্য কিনতে হলে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময়ে কেউ দোকানে। ঢুকে দেখে, তার দরকারি জিনিসের মজুদ শেষ হয়ে গেছে, কখনো দোকানের সিঁড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে কারো মুখের ওপর দোকানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
কথাগুলো যে সত্যি, তা আমাদের স্বদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেই জানতে পারি। তারপরও মেয়েটির প্রতি বাক্যে যে-তীব্র ক্ষোভ লক্ষ করি, তা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।
গর্বাচেভের পেরেসত্রোইকার কি এই হাল? তাঁর গ্লাসনস্তে কি এই ফল? মেয়েটি তো পারলে চোখের আগুন দিয়েই সোভিয়েত সমাজব্যবস্থা ভস্ম করে ফেলে!
বন্ধু দ্বিজেন শর্মা অনেককাল আছেন মস্কোতে। তরুণ-তরুণীর মধ্যে এই বিক্ষোভ তিনিও লক্ষ করেছেন। আমাদের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলামও কিউ নিয়ে নাগরিকদের বিক্ষোভের কথা বললেন।
ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিজে যেতেই এক মহিলার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আগের বছর দিল্লিতে আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের কংগ্রেসে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। সৌজন্য-বিনিময়ের বাইরে তার সঙ্গে কোনো কথা হয় না।
