অল্পবয়সী একটি মেয়ে চায়ের দোকানটি চালায়। তার স্বামীকেও দেখা যায় মাঝে মাঝে তাকে সাহায্য করতে। সহজেই ভাব হয়ে যায় মেয়েটির সঙ্গে। সে আমাকে দাদা বলে ডাকে, বসার জায়গা পরিষ্কার থাকলেও গামছা দিয়ে নিজে হাতে আরেকবার মুছে নিয়ে তবে আমাকে বসতে দেয়। আমরা বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে বলে, ওদের বাড়িও এককালে ছিল খুলনা অঞ্চলে, তবে মেয়েটি তা দেখেনি কখনো। তার বাপ-মা কোনকালে পাকিস্তান ছেড়ে চলে এসেছে এদিকে। একসময়ে বেশ কষ্টে গেছে দিন। এখন মোটামুটি চলে যাচ্ছে। তারপর সে কৌতূহলভরে জানতে চায়, বাংলাদেশে কি এখনো অনেক বাঙালি আছে?
আমি বুঝি, বাঙালি বলতে সে কী বোঝাচ্ছে। তবু, সে-ভুল না ভাঙিয়ে বলি, আছে বইকি, বাঙালিরাই তো নিজেদের জন্যে দেশটা গড়েছে।
মেয়েটির মনে এবারে সন্দেহের ঝিলিক দেখা দেয়। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সে জানতে চায়, আমরা কোন জাতের মানুষ।
মুসলমান শুনে তার মুখে বেদনার একটা স্পষ্ট ছাপ ফুটে ওঠে। তা দেখে আমারই কষ্ট লাগে। তাড়াতাড়ি করে নিজেকে সামলে নেয় মেয়েটি। কথা ঘুরিয়ে চলে যায় অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে।
পরদিনও সে আগের মতোই বসবার জায়গা মুছে দেয়, যত্ন নিয়ে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। তবু আমার মনে হয়, সরু একটা তার কোথাও ছিঁড়ে গেছে।
যেদিন সকালে ওকে বললাম আমরা ফিরে যাচ্ছি দেশে, তার দু চোখ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। মুখ ঘুরিয়ে নিলো সে বিস্কুটের টিনের দিকে। অস্ফুটকণ্ঠে জানতে চাইলো, কবে আমরা আবার আসবো কলকাতায়। বললাম, ঠিক নেই। যে-কথা বললাম না, তা এই যে, কলকাতায় এলেও এখানে উঠবো না, সুতরাং এমন করে তার দোকানে চা খাওয়া হবে না।
সেদিন ওকে সামান্য কয়েকটা টাকা বেশি দিয়েছিলাম। দিতে বেশ জোর করতে হয়েছিল। পরে কলকাতায় গিয়ে অনেকবার মেয়েটির খোঁজ করতে ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু খোঁজ করা হয়নি।
কলকাতায় বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে অনেক সময় চলে যায়। এবারেও তার ব্যত্যয় হলো না। নতুন করে যাওয়া হলো অধ্যাপক রামকৃষ্ণ মুখার্জীর বাড়িতে।
নিউ মার্কেট থেকে ফোন করতেই তিনি কোলাহল শুরু করে দিলেন। বললেন, সেখান থেকে দুপা হেঁটে মেট্রো ধরতে। তারপর টালিগঞ্জে নেমে দুটো রিকশা নিয়ে ওঁর বাড়ি যেতে। আমরা একটা ট্যাকসি নিয়ে গেলাম। ফাঁকিটা উনি ধরে ফেললেন সহজেই। বললেন, আমার মনে হচ্ছিল, আমার কথা ঠিক তোমার মনঃপূত হচ্ছিল না। ট্যাকসি করে আরামেই এসেছে, তবে অনেকগুলো টাকা খরচ করলে। আমাদের মেট্রো কিন্তু বেশ ভালো।
আনন্দকে নিয়ে ম্যানেজার, ম্যানেজার করে বেশ কিছুক্ষণ হইচই করলেন। তারপর আমার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা। উঠতে চাইলে বলেন, ‘আহা বোসোনা আরেকটু।
এক ফাঁকে প্রভাতী মুখার্জী আমাকে বললেন, প্রফেসর আর কে মুখার্জীর জন্য একটা ফেলিসিটেশন ভলিউম হচ্ছে–তাতে কেউ লিখতে বলেছে আপনাকে?
বললাম, যশ নন্দনের একটা চিঠি পেয়েছি কিছুকাল আগে–আমেরিকা থেকে লেখা। কিন্তু কী লিখবো, তা ভেবে পাচ্ছি না। এদিকে সময়ও বোধহয় বেশি নেই।’
প্রভাতী মুখার্জী বললেন, আপনাকে একটা লেখা দিতেই হবে–উনি (রামকৃষ্ণ খুবই খুশি হবেন। যে-কোনো বিষয় নিয়ে লিখুন–বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে লিখলেই বা অসুবিধে কোথায়?
যশ নন্দনের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়। রামকৃষ্ণ মুখার্জীর ৭০ বছরপূর্তিতে যে-বই বেরোবার কথা, তা বের হলো ৭৫ বছরপূর্তিতে। আমি একটা লেখা প্রভাতী মুখার্জীর কাছে পাঠালাম–On the periodization of Bengali Literary History and some related issues নামে। প্রভাতী সেটা জায়গামতো পাঠালেন। R. K. Bhattacharya ও Asok K Ghosh-সম্পাদিত Sociology in the rubric of Social Sciences (Calcutta: Anthropological Survey of India, 1995) বইতে সেটা বের হলো, কেবল সূচিপত্রে আমার নামে s-এর জায়গায় r ছাপা হলো। সে অবশ্য অনেক পরের কথা।
রামকৃষ্ণ মুখার্জীর বাড়ি থেকে সেদিন সপরিবারে ফিরেছিলাম ওই দম্পতির আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে। বিশেষ করে রামকৃষ্ণ মুখার্জীর নিরভিমান আচরণ তাঁর পাণ্ডিত্য ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে যেভাবে আড়াল করেছিল, তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মতো মনে হয়েছিল।
সেবারে কলকাতা থেকে ফিরে আসার মাসতিনেকের মধ্যে রুচির বিয়ে হয়ে গেল–১৯৮৯ সালের ১০ মার্চে।
১৭.
১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংসদ (ডাকসু) এবং সবকটি আবাসিক হলের ছাত্র-সংসদের নির্বাচন হলো বহু বছর পর। ডাকসুর নির্বাচন-পরিচালনার জন্যে উপাচার্য শিক্ষকদের যে-দল গঠন করেছিলেন, তাতে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। কলাভবনে কর্তব্য পালন করতে হলো–খানিকটা ভোটগ্রহণকেন্দ্র পরিদর্শন, বেশির ভাগ সময়ে উপাচার্যের কাছাকাছি থাকা–এই ছিল দায়িত্ব।
এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিকায় এই নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকারপক্ষীয় যে-অল্পসংখ্যক ছাত্র ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাদের নির্ভরতা ছিল পেশীশক্তিতে, ছাত্রসাধারণের সমর্থনে নয়। নির্বাচনে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল যারাই জয়লাভ করুক না কেন, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধীদের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই কর্তৃত্ব নিয়ে আবার বিরোধী দলীয় ছাত্র-সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা।
