ইতিমধ্যে রাষ্ট্রধর্মের বিধানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হাইকোর্টে দায়ের হয়ে গেল। একটি মামলা করলেন এক হিন্দু ভদ্রলোক। তিনি বললেন, ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ায় হিন্দু হিসেবে তিনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং এমন বৈষম্য সংবিধানবিরোধী। আরেকটি মামলা করলেন এক মুসলিম মহিলা। তিনি বললেন, ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ায় মহিলা হিসেবে তিনি বৈষম্যের শিকার হতে যাচ্ছেন।
এবারে আর আমাদের মামলা না করার কোনো অর্থ রইলো না। প্রধানত সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ আবেদনটি তৈরি করলেন। আবেদনকারী হলেন দশজন : বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, বিচারপতি কে এম সোবহান, বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, কবীর চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর, ফয়েজ আহমদ ও আনিসুজ্জামান। মামলা রুজু করতে দাঁড়ালেন সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। আবেদনকারীদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত থাকলাম ফয়েজ আহমদ ও আমি। আদালত বললেন, এমন মামলা তো আরো দুটি হয়ে গেছে, সুতরাং এটি বাহুল্যমাত্র। সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ড. কামাল হোসেন বললেন, এই আবেদনটির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে–তার একটি আবেদনকারীদের নাম থেকে প্রতীয়মান হবে। এই বলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের তিন প্রাক্তন বিচারক এবং সাবেক অ্যাটর্নি-জেনারেল হিসেবে ইশতিয়াকের নাম বললেন। তারপর তিনি আবেদনের কয়েকটি অনুচ্ছেদের প্রতি বিচারপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, এতে সংবিধান-সম্পর্কিত কিছু মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
আমাদের মামলা গৃহীত হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এটি নিয়ে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর হয়নি। তার প্রধান কারণ মামলার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আমাদের দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা। ফলে মামলাটি নথিভুক্ত হয়ে রইলো, তার আর শুনানি হলো না। তবে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি বেশ কিছুকাল সক্রিয় ছিল। একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে আমরা সভা করেছি, একটি প্রবন্ধসংকলন প্রকাশ করেছি। কয়েকটি ঘরোয়া বৈঠক হয় আমার বাসায়। তাতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন।
আমার বন্ধু ও সংগীতশিল্পী মনোতোষ বড়ুয়া তখন ভিক্ষুজীবন যাপন করছেন। আমার বাসায় এক ঘরোয়া বৈঠকের শেষে সবাই চলে গেলে তিনি রয়ে গেলেন। পোশাকের ভেতর থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেসের একটা প্যাকেট বের করে তিনি সিগারেট ধরালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, ‘আমার তো মনে হয়, স্বতন্ত্র নির্বাচন ফিরিয়ে আনা ছাড়া সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার উপায় নেই।’
এই অপ্রত্যাশিত উক্তি শুনে আমি বললাম, তাহলেই ধর্মনিরপেক্ষতার সম্পূর্ণ পরাজয় হবে। আমাদের নেতারা স্বতন্ত্র নির্বাচন-ব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন অনেক আন্দোলন করে। এখন তা ফিরিয়ে আনলে স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানকেই ফিরিয়ে আনা হবে।’
তবে তিনি কী গভীর বেদনা ও হতাশা থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন ফিরিয়ে আনার কথা বলেছিলেন, তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
১৬.
রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) এক রাতে এসে জানতে চাইলেন, বড়ো মেয়ের বিয়ের বিষয়ে কিছু ভাবছি কি না।
রুচি তখন অর্থনীতিতে অনার্স পাশ করে এমএ পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার ইচ্ছে, আগে সে এমএ পাশ করুক, তারপর বিয়ের কথা ভাবা যাবে। রুচির কাউকে পছন্দ নেই, পছন্দ করার আগ্রহও নেই। সেক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব সবটাই তার বাপ-মায়ের।
দাদাভাই বললেন, তাঁর হাতে সৎপাত্র আছে। মরহুম বিচারপতি আবদুল মওদুদের কনিষ্ঠ পুত্র আবু রায়হান আজিমুল হক। বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকসে মাস্টার্স করেছে। বছরখানেক পড়াশোনা করেছে লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। এখন ঢাকায় আইসিডিডিআরবিতে কাজ করে। থাকে তার বড়ো বোন বেবী মওদুদের সঙ্গে। ইচ্ছে করলে আমি গিয়ে তাকে দেখে আসতে পারি। এখানে বিয়ে দিলে মেয়ের পড়াশোনার কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।
বিচারপতি মওদুদের সঙ্গে আব্বার পরিচয় ছিল কলকাতায়। আমি তাকে চিনতাম লেখক হিসেবে তো বটেই, বিশেষ করে, অধ্যাপক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। তিনি যখন কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন সেখানে প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা হতো। আমাদের চিন্তাভাবনা ছিল বিপরীতমুখী, তা সত্ত্বেও আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম, তিনিও আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন। বেবী মওদুদকে দাদাভাই খুব ভালোবাসতেন, আমিও স্নেহ করতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথমবারের শিক্ষকতাকালে সে ছিল আমার ছাত্রী।
এক সকালে বেবীর বাড়ি গিয়ে অপ্রস্তুত রায়হানকে দেখে এলাম। কথাবার্তা আরেকটু এগোলে জানা গেল, তার বড় ভাবি নাজমা অনতিদূর সম্পর্কে আমার খালাতো বোন এবং তার সেজো ভাই হুমায়ূন আমার সাবসিডিয়ারি ক্লাসের ছাত্র ছিল।
বিয়ের সিদ্ধান্ত স্থির হয়ে গেল।
এবারে আমরা সপরিবারে কলকাতায় গেলাম–বহুদিন পরে একসঙ্গে সবাই মিলে বেড়াতে।
জিল্লুর রহিম ওরফে দুলালের সৌজন্যে তার এক বন্ধুর খালি ফ্ল্যাট পাওয়া গেল আলিপুরে। সেখানে ওঠা গেল। সারাদিন বাইরে কাটিয়ে রাতটা সেখানে থাকি। কাছাকাছি মিষ্টির দোকান থেকে সকালের নাশতা আনা হয়। তারপর সবাই মিলে নেমে ফুটপাতের দোকানে চা খেয়ে আমাদের দিন শুরু হয়।
