পরদিন সকালে সম্মেলন উদৃবোধন করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি। ভাষণে যেসব অতিথিকে তিনি বিশেষভাবে স্বাগত জানালেন, তাঁরা হলেন পাকিস্তানের আবদুল ওয়ালি খান, আফগানিস্তানের উপ-রাষ্ট্রপতি আবদুর রহিম হাতিব, ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্রের উপমন্ত্রী হাসান মক্কী, ভিয়েতনামের (পরে উপরাষ্ট্রপতি) মাদাম বিন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা, তানজানিয়ার আলী আহমেদ, এ এন সির আলফ্রেড এনজো ও পি এল ওর আবদুল্লাহ হুরানি। এই ভাষণে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর পরে এশিয়া মহাদেশে আপসোর কংগ্রেস এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজীব গান্ধির বক্তৃতায় বিশ্বের রাজনৈতিক মঞ্চের নানা সংকটের বিষয় ছিল, সেই সঙ্গে ছিল স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের আশা।
সম্মেলনের একটি দিন জওহরলাল নেহরুর শতবার্ষিকী পালনে নিয়োজিত হয়। নানারকম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সম্মেলনের দিনগুলি কেটে গেল। অনেকের সঙ্গে হাসিনা আমার পরিচয় করিয়ে দেয় তার শিক্ষক বলে-ফলে কিছু অতিরিক্ত সম্মান পাওয়া গেল। হাসিনার ছেলেমেয়ের সঙ্গে ভালোরকম আলাপ জমে গেল–পুতুল ঢাকায় নানারকম চা খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিলো। ওদিকে আহমদুল কবিরের ঘরে সন্ধ্যার পর জমজমাট আড্ডা। তাতে অন্যদেশের প্রতিনিধিরাও মাঝে মাঝে এসে যোগ দিলেন।
এই সম্মেলনে আপসোর কেন্দ্রীয় সংগঠনের নতুন কমিটিতে সহ-সভাপতির একটি পদ বাংলাদেশের মনোনয়নের জন্যে শূন্য রাখা হয়। পরে সেখানে আমার নাম যুক্ত হয়।
১৪.
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. ভাস্কর রায়চৌধুরীর সঙ্গে দিল্লিতে দেখা হলো বটে, তবে তার সঙ্গে এর আগেই পরিচয় হয়েছিল। কলকাতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক নিয়োগের জন্যে যে-নির্বাচনী কমিটি গঠিত হয়, তার বিশেষজ্ঞ-সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল আমাকে। নির্বাচনী কমিটির যে-সভায় আমি যোগ দিতে গিয়েছিলাম, তাতে রবীন্দ্র-অধ্যাপক এবং একজন সহযোগী অধ্যাপক মনোনয়নের কথা ছিল। এই নিয়োগ নিয়ে উপাচার্য ভাস্কর রায়চৌধুরী ও সহ-উপাচার্য ড. ভারতী রায়ের সঙ্গে আমার মতদ্বৈধ হয়েছিল। ওঁদের মনোনয়নের সমর্থনে আরো একজন সদস্য ছিলেন। অন্যপক্ষে কলা অনুষদের ডিন, বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য এবং আমি অন্য প্রার্থীর বিষয়ে একমত হয়েছিলাম। রবীন্দ্র-অধ্যাপক নিয়োগের প্রশ্নে শেষ মুহূর্তে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে উপাচার্যদের মত সমর্থন করেন। ফলে ওঁদের প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত হয়, তবে ডিন ও আমি মতান্তরসূচক মন্তব্য লিপিবদ্ধ করি। সহযোগী অধ্যাপক বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও বোধহয় তিন-তিন ভোটে কমিটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তবে মজার কথা এই যে, এই মতবিরোধ সত্ত্বেও সহ-উপাচার্য ভারতী রায়ের সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তা এখনো অটুট রয়েছে। উপাচার্য প্রথমটায় আমার প্রতি খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন। দিল্লিতেও আমার তা মনে। হয়েছিল। আমার সদস্যপদের মেয়াদকালে নির্বাচকমণ্ডলীর আর কোনো সভা ডাকা হয়নি। পরে অবশ্য উনি যখন একবার ঢাকায় আসেন, তখন নিজের উদ্যোগেই আমাকে টেলিফোন করেছিলেন যদিও ঢাকায় আমাদের দেখা হয়নি।
কলকাতায় সেবারে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। উনি বললেন, ‘চলো দেবীর ওখানে-সে তোমাকে দেখলে খুশি হবে। প্রায় ত্রিশ বছর পরে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হলো এবং প্রথমবারের মতো তাঁর স্ত্রী বিশিষ্ট গবেষক অলকা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। দেবীপ্রসাদ জানতে চাইলেন, কলকাতায় কী উপলক্ষে এসেছি। বললাম, বাংলার অধ্যাপকের সিলেকশন কমিটির সভায়। উনি বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, আমি কি প্রার্থী? বললাম, না, আমি কমিটির সদস্য। উনি এবার আরো বিস্ময় এবং অনেকখানি আনন্দের সঙ্গে বললেন, তাহলে তো তুমি মস্ত পণ্ডিত হয়েছ!’ বললাম, এমন কিছু নয়। নিয়মরক্ষা করতে একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ রাখতে হয়। তাই আমাকে রাখা–বাড়ির কাছে আছি বলে।’ দেবীপ্রসাদ অনেকক্ষণ আনন্দের হাসি হাসলেন।
সেই তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা।
১৫.
১৯৮৮ সালের জুন মাসে সংসদে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী গৃহীত হয়। এতে ঢাকার বাইরে ছটি জেলায় হাইকোর্ট বিভাগের আসন নির্দিষ্ট হয় এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রধর্ম-ঘোষণার প্রতিবাদে পরদিনই ঢাকা এবং দেশের আরো কয়েকটি শহরে ধর্মঘট পালিত হয়। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেনকে সভাপতি করে আমরা স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করি এবং একাধিক সভা করে রাষ্ট্রধর্মের প্রত্যাহার দাবি করি।
আমাদের আইনজীবী বন্ধুরা অষ্টম সংশোধনীর হাইকোর্ট-সংক্রান্ত বিধানের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়ের করেন এই বলে যে, তা সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী। মামলাটি শুনানির জন্যে গৃহীত হয়।
আমরা কয়েকজন ভাবলাম, রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী–এই যুক্তিতে আমরাও হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করবো। এটা করা উচিত হবে কি না, সে-প্রশ্নও উঠলো। কেউ কেউ বললেন, আদালতে যদি আমাদের আবেদন অগ্রাহ্য হয়, তাহলে রাষ্ট্রধর্ম আদালতের অনুমোদন পেয়ে যাবে। তাতে বিষয়টা আরো খারাপ হবে। আমরা কেউ কেউ বললাম, মামলা দায়ের না করলেও তো সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের আবেদন অগ্রাহ্য হলে আর কতোই বা ক্ষতি হবে!
