শওকত ওসমান একদিন আমাকে ডেকে পাঠালে আমি তার মোমেনবাগের বাসায় যাই। তিনি জানান, তার অর্থসংকট চলছে। আমি কি তাঁর একটা পাণ্ডুলিপি বাংলা একাডেমিকে দিয়ে কিনিয়ে নিতে পারি? বিদেশের বহু প্রতিষ্ঠান লেখকদের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে রাখে–বাংলা একাডেমি ইচ্ছে করলে তা করতে পারে–সে-পাণ্ডুলিপি মুদ্রণের জন্যে নয়, সংগ্রহ ও প্রদর্শনের জন্যে। মোহাম্মদ হারুন-উর-রশীদ তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। আমি গিয়ে তাঁকে কথাটা বলি। তিনি শওকত ওসমানকে সাহায্য করতে ইচ্ছুক, কিন্তু বাংলা একাডেমির কোননা প্রদর্শশালা নেই, ওভাবে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করার ব্যবস্থাও নেই। মহাপরিচালক বিপন্ন বোধ করলেন। আমাদের এই আলোচনার সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ইকবাল আহমদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন–তিনি হারুন-উর-রশীদের কাছে কোনো কাজে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ঢাকা কলেজে শওকত ওসমান তাঁর শিক্ষক ছিলেন। কোনো ব্যক্তির কাছে পাণ্ডুলিপি বিক্রি করতে যদি শওকত ওসমান রাজি হন, তবে তিনি তা কিনে নিতে পারেন এবং কোনো উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি তা দান করতে পারেন। আমি শওকত ওসমানকে এই প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মতি দেন। প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে কিছু বেশি দিয়ে ইকবাল পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে নেন এবং, আমি যতদূর জানি, তা জাতীয় জাদুঘরে দান করেন।
১৩.
চট্টগ্রাম থেকে আমার ঢাকা ফিরে আসা অবধি বাংলাদেশ আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের (আপসো) সাধারণ সম্পাদক ডা. এ এইচ সাইদুর রহমান এই সংগঠনের কাজে আমাকে যোগ দিতে প্রণোদিত করছিলেন। আমি নিমরাজি, তবে কতটা দায়িত্ব পালন করতে পারবো, সে-সম্পর্কে সন্দিহান। ১৯৮৮ সালের ২৪ থেকে ২৮ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আপসোর সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে যোগদান না করার কোনো উপায় সাইদুর রহমান রাখলেন না। বস্তুত কংগ্রেসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বেশ বড়সড়ড়া হলো : শেখ হাসিনা, আহমদুল কবির, হায়দার আকবর খান রনো, সুধাংশুশেখর হালদার, মোনায়েম সরকার, কামাল হায়দার, সাইদুর রহমান, আমি, আরো দু-তিনজন। হাসিনা গিয়েছিল পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়েমা ওয়াজেদ পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে। দিল্লি পৌঁছোবার পরে জয়কে প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এশিয়া ও আফ্রিকার ৫৪টি দেশের প্রতিনিধিদল এসেছিল। সহযোগীরূপে ইউরোপের ৯টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন, ইউরোপ ও লাটিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশের সাংগঠনিক প্রতিনিধিরা ছিলেন, জাতিসংঘ এবং আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এসেছিলেন। ভারতীয় প্রতিনিধির সংখ্যাই ছিল পাঁচ শতাধিক। তার মধ্যে ছিলেন ই এম এস নামবুরিপাদ, রাজ্যেশ্বর রাও, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, হরকিষণ সিং সুরজিৎ, সীতারাম ইয়েচুরি, সমর মুখার্জি, চন্দ্রজিৎ যাদব, শেখর গাঙ্গুলি, রশীদউদ্দীন খান, রইস আহমেদ, ডা. ভাস্কর রায়চৌধুরী, এয়ার কমোডর যসজিৎ সিং, কে পার্থসারথী, সত্যসাধন চক্রবর্তী, বিপ্লব দাশগুপ্ত। রমেশ চন্দ্র এসেছিলেন বিশ্বশান্তি পরিষদের প্রতিনিধি হয়ে, তাঁর স্ত্রী পেরিন ছিলেন ভারতীয় দলে। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলে আবদুল ওয়ালি খান, মিরাজ খালিদ, তাহেরা মজহার আলী, খাদিজা গওহর, আবদুর রহিম ও মিরাজ মোহাম্মদ খানসহ ১৫/১৬ জন ছিলেন। শ্রীলঙ্কা থেকে আবদুল আজিজ ও এ এ এম মারলিন ছাড়াও কয়েকজন। ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদলে মাদাম নগুয়েন থি বি এবং নামিবিয়ার প্রতিনিধিদলে সাম নুজোমা ছিলেন। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যোগ দিয়েছিলেন আলফ্রেড এনজো এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ হুরি। সোভিয়েত প্রতিনিধিদলে ছিলেন কালানদাররাভ সামানদার, ব্রিটিশ আপসোর প্রতিনিধিদলে ছিলেন মোহাম্মদ আরিফ। কায়রোতে আপসোর সদর দপ্তর–সেখান থেকে এসেছিলেন সভাপতি ডা. মোরাদ গালিব, মহাসচিব নূরি আবদুল রাজ্জাক, সচিবদের একজন চিত্ত বিশ্বাস, অপরজন বিদ্যাশেখরা।
দিল্লিতে হোটেলে পৌঁছে দেখা গেল, আমাদের সবার জন্যে একক কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, হাসিনার জন্যে একটি স্যুইট। আহমদুল কবির বললেন, তাঁর একটা স্যুইট চাই, নইলে দলের সকলে আড্ডা দেবে কোথায়? হোটেল কর্তৃপক্ষের গড়িমসি দেখে তিনি জানালেন, বাড়তি ভাড়া যা লাগে, তা তিনি নিজেই দেবেন, নিমন্ত্রণকর্তাদের ঘাড়ে চাপাবেন না। তাতে কাজ হলো। কিন্তু আমরা ফিরে আসার সময়ে দেখা গেল, বাড়তি ভাড়া নয়, স্যুইটের পুরো ভাড়াটাই হোটেল তাঁর কাছে দাবি করেছে। তারা বলছে, কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ করা কক্ষ তিনি নেননি, কর্তৃপক্ষও ভাড়া সমন্বয় করার কথা কিছু বলেনি। অতএব। সম্পূর্ণ ভাড়াটাই আহমদুল কবির দিলেন।
আমরা যেদিন দিল্লি পৌঁছোলাম, সেদিনই আলাপ হলো সীতারাম ইয়েচুরির সঙ্গে। তখন সে এখনকার মতো স্বনামধন্য হয়নি, তবে সি পি এমের একজন নেতা হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছিল। কথায় কথায় জানলাম, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে সেদিনই মধ্যদিনে তার স্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছেন। সে-বিষয়ে আমি উদ্বেগ প্রকাশ করায় সীতারাম মৃদু হেসে বললো, কয়েকদিন তাঁকে জেলহাজতে থাকতে হবে–এর অন্যথা হওয়া মুশকিল। দেখলাম, সীতারাম অবিচলিতভাবে সম্মেলনের কাজ করে যাচ্ছে এবং তাও ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে একযোগে।
