গিয়ে হাজির হলাম। বিচারপতি সায়েম বললেন, বঙ্গভবনে আমার শেষদিনগুলো নিয়ে একটা ছোটো বই লিখেছি। ভেবেছিলাম, বেঁচে থাকতে ওটা ছাপাবো না–আমার মৃত্যুর পরে ছাপাতে বলে যাবো। মৃত্যু যখন আসছে না, তখন বইটা প্রকাশের কথা ভাবছি। তোমাকে একজন প্রকাশক খুঁজে দিতে হবে–এমন প্রকাশক যে আমার ইচ্ছে-অনুযায়ী বইটা বার করবে।’
বললাম, প্রকাশক পেতে অসুবিধে হবে না। কিন্তু বঙ্গভবনে শুধু শেষদিনগুলো নিয়ে লিখছেন কেন? পূর্বাপর ঘটনা বলছেন না কেন?
বিচারপতি বললেন, তোমাদের নিয়ে মুশকিল এই। যা আছে তা ছেড়ে যা নেই তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করো।’
বললাম, সবাই জানতে চায়, কী অবস্থায় আপনি রাষ্ট্রপতি হতে সম্মত হলেন। তেসরা নভেম্বর-সাতই নভেম্বরের ঘটনা আপনি কীভাবে দেখেছেন। পরের দিকের ব্যাপারেও মানুষের আগ্রহ আছে। তাই বলছিলাম, সবটা যদি লিখতেন, তাহলে আমাদের ইতিহাসের বড়ো দলিল হয়ে থাকতো।
সাবেক রাষ্ট্রপতি বললেন, নিজের কথা লিখে যাবো কি না, সে-সম্পর্কে নিজের মনেই অনেক তর্ক করেছি। যতটুকু লেখা ঠিক মনে করেছি, তা-ই লিখেছি। এখন বলল, যেটুকু লিখেছি, তা ছাপার জন্যে প্রকাশক পাওয়া যাবে কি না। প্রকাশককে আমার শর্ত-অনুযায়ী বই ছাপতে হবে।’
বললাম, বই ছাপার শর্ত মোটামুটি স্ট্যান্ডার্ডাইজড। আপনার কি বিশেষ শর্ত আছে?
উনি বললেন, ‘আছে। তবে তা টাকা-পয়সাসংক্রান্ত নয়। এ-বই থেকে আমি কোনো রয়ালটি চাই না। আমি চাই, বইটা পেপারব্যাক হবে, এমন সাইজের হবে যা একজন পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে–ট্রেনে-বাসে বসে পড়তে পারে। বইটার দাম যথাসাধ্য কম রাখতে হবে–যাতে ইচ্ছে করলেই কেউ কিনতে পারে। ছাপাটা নির্ভুল হতে হবে। আমাদের প্রকাশকেরা বড্ড অযত্ন করে বই ছাপায়।
একটু থেমে বললেন, যাবার সময়ে ম্যানাসক্রিপ্টের একটা কপি নিয়ে যেও–তোমার জন্য করিয়ে রেখেছি। তোমার কোনো কমেন্ট থাকলে বোলো। কিন্তু যা লিখেছি, তার অতিরিক্ত ইনফরমেশন যোগ করতে বলবে না। তুমি আগে পড়ো। তারপর প্রকাশককে বইয়ের সাবজেক্টটা বোলো। যে রাজি হবে, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। প্রকাশককে ম্যানাসক্রিপ্ট আমি দেবো–তোমার কপিটা হাতছাড়া করবে না।’
নিগারকে যখন এসব কথাবার্তার সারমর্ম জানালাম, সে বললো, :, আব্দুর বই পকেটে নিয়ে ঘোরার জন্য যেন সবাই বসে আছে! আপনি কাউকে আনরিজনেবুল রিকোয়েস্ট করতে যাবেন না।
প্রকাশক-নির্বাচনের বিষয়ে আমার চট্টগ্রামের সহকর্মী গোলাম মুস্তাফার পরামর্শ চাইলাম। সে সুপারিশ করলো হাক্কানী পাবলিশার্স তথা গোলাম মোস্তফার নাম। তাদের দুজনকে নিয়ে একদিন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির বাড়িতে গেলাম। কথাবার্তা যা হওয়ার, তা হয়ে গেল।
পরে মুস্তাফা ও মোস্তফা একবার আমাকে ছাড়াই তার কাছে গিয়েছিল। সেদিন বিচারপতি মুস্তাফার ইংরেজি জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়েছিলেন।
গোলাম মোস্তফা মুখে যদিও লেখকের অভিপ্রায়-অনুযায়ী বই প্রকাশ করতে সম্মত হয়, পরে সে তার ইচ্ছার ওপরে নিজের ইচ্ছা আরোপ করে। তার প্রধান উদবেগ ছিল যে, বইটি খুব ছোটো হয়ে যাবে। সুতরাং সে পি আই ডিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতির সংক্ষিপ্ত জীবনী, তার কয়েকটি বক্তৃতা, তাঁর বক্তৃতাসংক্রান্ত দুটি খবর, সংবিধানের কয়েকটি সংশোধনী এবং তার আরো কিছু ছবি জোগাড় করে পরিশিষ্টে জুড়ে দিলো। এই অংশ হয়ে দাঁড়ালো মূল রচনার চেয়ে বড়ো। তাতে বই খানিকটা স্ফীত হলো, দামও বাড়লো। এমন সংযোজনে লেখক নিমরাজি হলেন, তবে খুব যে প্রসন্নচিত্তে হলেন, তা নয়।
At Bangabhaban: Last Phase (১৯৮৮) প্রকাশিত হলে তার মুদ্রণ ও বিন্যাস দেখেও তিনি খুব সন্তুষ্ট হননি। পাতলা মলাটের সংস্করণের পাশাপাশি বইটির শক্ত মলাটের সংস্করণও বের হয়। তা নিয়ে অবশ্য তিনি আর কিছু বলেননি। তবে বই যে বের হলো, তাতে তিনি খুশি হয়েছিলেন।
এই সময়েই একদিন আবু রুশদ তার তোপখানার বাসায় আমাকে বলেন, তার আত্মজীবনীর একটি খণ্ড প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। রচনাটি বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখন প্রকাশক পাওয়া গেলে তা গ্রন্থাকারে বের হতে পারে।
আমি আবার গোলাম মোস্তফাঁকেই বললাম। সে প্রকাশ করতে সানন্দে সম্মত হলো। লেখক-প্রকাশকের যোগাযোগ ঘটিয়েই আমার দায়িত্ব শেষ হয়। জীবন ক্রমশ ছাপা হয়ে বের হয় ১৯৮৯ সালের গোড়ার দিকে। আবু রুশদ বইটি উৎসর্গ করেন তার আযৌবনের বন্ধু আবুল হোসেন ও শওকত ওসমানকে।
শওকত ওসমানের অভ্যেস ছিল সক্কালবেলায় তার পরিচিতজনদের ফোন করা। সুপ্রভাত ভ্রাতঃ, প্রাতঃস্মরণীয়, প্রাতঃস্মরণীয় হও’ বলে তিনি কল্যাণকামনা করতেন। পশ্চিমবঙ্গীয় প্রচলন অনুসরণ করে তিনি আমার স্ত্রীর উল্লেখ করতেন বউমা বলে এবং তারও কল্যাণকামনা করতেন। তার কণ্ঠে স্নেহ ঝরে পড়তো। তারপর তার বক্তব্যের পালা শুরু হতো। তখন জনকণ্ঠে তার ‘শেখের সম্বরা’ প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হচ্ছে এবং তা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে। তার কিছু ফটোকপি তার জামার পকেটে ফিরতো এবং তাঁর প্রীতিভাজনদের তা বিলিয়ে তিনি আনন্দ পেতেন। এ কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়ে স্থানকালপরিবেশের কথাও তিনি ভুলে যেতেন। সানাউল হকের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমরা তাঁর বাড়িতে সমবেত হয়েছি। জানাজায় যাওয়ার অপেক্ষায় সকলে। শওকত ওসমান হঠাৎ করে ‘শেখের সম্বরা’র সর্বশেষ কিস্তির ফটোকপি সবাইকে দিতে শুরু করেছেন। আমি উঠে গিয়ে তার হাত চেপে ধরলাম। বললাম, শওকত ভাই, এখানে নয়। তাছাড়া আপনার লেখা আপনাকে বিলোতে হবে কেন? আমাদের দেবেন, আমরা সবার হাতে দিয়ে দেবো। আমার ঔদ্ধত্যে তিনি যে কিছু মনে করেননি, তার কারণ, তিনি আমাকে যথার্থই ভালোবাসতেন এবং আমি যে তার প্রতি যথার্থই শ্রদ্ধাশীল, তা জানতেন। অনেক সময়ে ‘শেখের সম্বরা’র ফটোকপির সঙ্গে তিনি নিজের হাতে নতুন একটা পদ্য লিখে তা দান করতেন। এমন কয়েকটি অংশ আমার কাছে এখনো আছে। শেখের সম্বরার দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের আগে তিনি আমার কাছে বইটির একটি উপযুক্ত নাম চান। আমি বলি, দোভাষী পুথির স্টাইলে ‘শেখের সম্বরা–দোসরা বালাম’ রাখতে পারেন। প্রস্তাবটি তার পছন্দ হয়।
