ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, তাঁর জীবনযাপনপ্রণালি ছিল খুবই সাদাসিধে। রঙ্গব্যঙ্গে তাঁর দক্ষতা ছিল স্বভাবজ–আসর জমাবার এমন নৈপুণ্য খুব কমই দেখা যায়।
১৯৮৬ সালের ২ এপ্রিলে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বাড়ির কাছে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে বেবী ও আমিও সেখানে দ্রুত পৌঁছেই, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
পর বছর আমার মেজো দুলাভাই সৈয়দ আলী হোসেনের জীবনাবসান ঘটে।
মেজোবুর যখন বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স আট বছর। মেজো দুলাভাইয়ের আধুনিক জীবনযাপন-পদ্ধতি আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। তিনি আমাকে কলকাতার খুব নামি হোটেলের দামি রেস্টুরেন্টে একাধিকবার খাইয়েছেন, ট্যাকসি করে বেড়াতে নিয়ে গেছেন গঙ্গার ধারে। আমার প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ ছিল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আমার দরকারি অথচ ঢাকায় দুষ্প্রাপ্য অনেক বই তিনি বন্ধুবান্ধবকে দিয়ে কলকাতা থেকে আনিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আমি সরকারি আমলা হই, কিন্তু আমি শিক্ষকতার পেশা বেছে নেওয়ায় আমাকে ডাকতে শুরু করেন পণ্ডিতমশাই বলে। আমি বাংলা পড়ে বিদেশে গিয়ে কী গবেষণা করি বা কী সেমিনার সম্মেলন করি, তা ছিল তার কাছে খানিকটা জিজ্ঞাসা ও আনন্দমিশ্রিত বিস্ময়ের বিষয়। আমাকে এবং আমার স্ত্রী-সন্তানদের সবাইকে নিজে বাজার করে খাইয়ে। খুব আনন্দ পেতেন তিনি। ১৯৭০ সালে খুলনায় ইতিহাস পরিষদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে ড. হবিবুল্লাহ, ড. মল্লিক এবং অন্যান্য অতিথির সম্মানে তিনি। একটা রেস্টুরেন্টে বড়রকম ডোেজ দিয়েছিলেন।
মেজোদুলাভাই বেশ কিছুকাল ধরে ভুগছিলেন। তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটায়। ১৯৮৭ সালের জুন মাসে বেবী, বড়ো দুলাভাই ও আমি খুলনায় চলে গেলাম। তিনি বাড়িতেই ছিলেন। আমাদের দেখে খুশি হলেন। কথাবার্তা বলতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল, তবু বলতে থাকলেন। ২৭ তারিখে তিনি চলে গেলেন। খবর পেয়ে আমার ছোটোভাই আখতার খুলনায় গিয়ে পৌঁছোলো দাফন-কাফনের ঠিক আগে।
বৃহত্তর পরিবারের প্রতি তিনি কর্তব্যের অধিক করেছিলেন। তাঁর চেনাজানা অনেকের প্রতিও তাঁর আনুকূল্য ছিল। তাঁর মৃত্যুতে তাই শোকগ্রস্ত হয়েছিলেন তাঁর নিজের পরিবারের বাইরে অনেকে।
এর কিছুকাল পরে হঠাৎ করেই বড়ো দুলাভাইয়ের পাকস্থলীতে ক্যানসার ধরা পড়ল। যাকে বলে নীরব ঘাতক, তারই শিকার হলেন তিনি। কী যে করা যাবে, তা ভেবে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। চিকিৎসকেরা দুলাভাইকেই বললেন, তাঁরা অস্ত্রোপচার করতে চান, তার ফল ভালো হতে পারে, মন্দও হতে পারে। দুলাভাই সম্মতি দিলেন। তলপেট কেটেই জোড়া দিলেন শল্যবিদেরা–আর কিছু করার ছিল না। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে রাতে তাকে দেখে বাড়ি ফিরেছি, বেবী রয়ে গেল হাসপাতালে বড়োবুর সঙ্গে। একটু পরই খবর পেলাম তিনি আর নেই।
বড়োবুর বিয়ে হয়েছিল ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে। বিয়ের পরে দীর্ঘকাল দুলাভাই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমরাও আবার ঢাকায় এসে তার সঙ্গে ছিলাম। অনেকদিন। এ-সবের মধ্য দিয়ে একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল তো বটেই। তার ওপর, আব্বা বলতেন, বড়ো জামাইই তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র, দুলাভাইও সববিষয়ে কর্তব্যের অধিক করতেন। আব্বাকে কিছু বোঝাতে হলে আমরা দুলাভাইয়ের শরণাপন্ন হতাম। আমাদের পরিবারের সকল সিদ্ধান্তে তিনি শরিক ছিলেন। কতদিক দিয়ে যে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা-নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা বলে শেষ করা যায় না।
১৫ তারিখে দুলাভাই মারা গেলেন, ১৬ তারিখে আমার লন্ডনে যাওয়ার টিকিট সংগ্রহ করার কথা। যাবো কি যাবো না, এমন দোটানায় পড়ে গেলাম। উদ্ধার করলো বড়োবুই। বললো, তুমি যাও–সবকিছুর ব্যবস্থা যেখানে করা আছে, সেখানে না-যাওয়াটা ঠিক হবে না।
লন্ডনে আমি চিকিৎসা নিয়ে বেরোতে না বেরোতেই সেখানে গিয়ে সস্ত্রীক হাজির হলেন আমার মেজো ভায়রা তফাজ্জল আলী ওরফে মাখন। তিনি বেশ কিছুকাল ক্যানসারে ভুগছিলেন। কেমোথেরাপি নিয়ে তিনি গেলেন অক্সফোর্ড স্ট্রিটের নিকটে তার চাচির বাড়িতে। সেখানে শফি ও আমি কয়েকদিন আড্ডা জমালাম। বেশ ভালোই মনে হলো তাকে। আমি দেশে ফেরার পরে তিনিও ফিরলেন। শরীর খারাপ হওয়ায় আবার তাঁকে নেওয়া হলো লন্ডনে। সেখান থেকে তাগাদা এলো তার ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে দিতে। ওরা দুজনেই অল্পবয়স্ক। মাখনের একটা ব্যবসা ছিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের জেনারেল সেলস এজেন্সি। সেই সুবাদে ছুটির দিনে ব্রিটিশ হাই কমিশনের ভিসা অফিস খুলিয়ে ওদের ভিসা দেওয়া হলো। ওরা চলে গেল এবং সৌভাগ্যক্রমে বাপ-মায়ের সঙ্গেই ফিরে এলো। কিন্তু মাখনকে ধরে রাখা গেল না। ১৯৮৮ সালের ২০ জুন তিনি চিরতরে চলে এলেন।
তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হলো সিলেটে–হজরত শাহজালালের দরগায় সমাধিস্থ করার জন্যে। তার পরিবারের সঙ্গে বেবী ও আমিও গেলাম। দাফন কাফন সেরে মাখনের বন্ধু অ্যাডভোকেট আবদুল ওদুদ খোন্দকার ও আমি ট্রেনে ঢাকায় ফিরে এলাম।
মাখন ছিলেন খুব বন্ধুবৎসল। নানা সময়ে অনেকের অনেক উপকার করেছেন। তার মৃত্যুতে বোঝা গেল, তারা তা ভোলেননি।
২.
সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমের একমাত্র সন্তান নিগার ফোনে বললো, নানা, আল্লু আপনাকে দু-তিনদিনের মধ্যে আসতে বলেছেন সকাল দশটা থেকে এগারোটার ভেতরে।
