১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, কলেজের ছাত্রাবস্থায়, নেয়ামাল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গ্রেপ্তার হয়। জেল থেকে বেরিয়ে সে আমাদের বাড়িতে ওঠে, কয়েকদিন পরে তাদের মেস খুললে সেখানে ফিরে যায়। ভাষা-আন্দোলনের সময়ে সে বাংলাভাষার দাবির পক্ষে অনেক জায়গায় উর্দুতে বক্তৃতা করে। পরে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়েও তার একটা প্রধান দায়িত্ব ছিল উর্দুতে বক্তৃতা করা। সে একসময়ে ঢাকা টেলিভিশনে উর্দু শিক্ষার আসর পরিচালনা করতো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ-নিয়ে সে বিড়ম্বিত হয়। কর্তৃপক্ষ তাকে সন্দেহের চোখে দেখতো, আবার মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউও তাকে সরকারের লোক মনে করতো।
বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনার দায়িত্ব পেয়ে আমি নেয়ামালকে সঙ্গে নিই এবং তার পরামর্শক্রমে তার এক সহকর্মীকেও আমাদের দলভুক্ত করি। তার ভাষাজ্ঞান এবং সংসদীয় রীতিনীতির অভিজ্ঞতা সংবিধানের বাংলা করার কাজে আমাদের বড়ো সহায় হয়। সে বারবার বলতো, বাংলা শব্দ উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করার যে-সুযোগ আমরা পেয়েছি, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। তবে সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সদস্যেরা অনেকক্ষেত্রে প্রচলিত ইংরেজি পরিভাষা রক্ষা করার পক্ষপাতী ছিলেন, তাই আমাদের সকল প্রস্তাব তারা মেনে নেননি। ন্যায়পালের মতো অনেকগুলো পরিভাষা ছিল নেয়ামালেরই উদ্ভাবন। ভাষাব্যবহারে সে খানিকটা রক্ষণশীল ছিল এই অর্থে যে, মূল ইংরেজিতে বহুবচন থাকলে বাংলায়ও বহুবচন-ব্যবহার সে আবশ্যক বিবেচনা করতো। যেমন, পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্সের বাংলা সে করেছিল সংসদীয় বিষয়াবলী। আমার মতে, এখানে বিষয় বললে চলে, বিষয়াবলি বলার দরকার হয় না। তার যুক্তি ছিল এই যে, ইংরেজি ও বাংলা দুই পাঠের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্যে ব্যাকরণগত গঠন একরকম হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমি তার কথা মেনে নিয়েছিলাম।
পরবর্তীকালে নেয়ামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ও ফারসিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেছিল। ফারসিতে সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। আরো পরে ইরানের মাশহাদের ফিরদৌসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশি ছাত্রদের জন্যে ফারসি ভাষার পরীক্ষায়ও সে খুব ভালো ফল করেছিল। দেশে ফিরে তার ইচ্ছে হয়েছিল সরকারি চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার। ঢাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে-সুযোগ না পেয়ে সে আমাকে একবার বলেছিল যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ পেলে সে ঢাকা ছেড়ে যেতে দ্বিধা করবে না–যদিও এখানে বেতারকেন্দ্র এবং অন্যান্য সূত্র থেকে তার রোজগার ছিল বেশ ভালো। আমি এ বিষয়ে চেষ্টা করি। তার সকল যোগ্যতা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ আনুকূল্য করেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তার অনূদিত সাজ্জাদ জহিরের উপন্যাস লন্ডনে এক রাত কলকাতার র্যাডিকাল বুক ক্লাব প্রকাশ করে ১৯৫৬ সালে। তাতে আমরা সবাই যে কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম, তা বলা যায় না। ঢাকা থেকে তার একাধিক অনুবাদ এর আগে-পরে প্রকাশিত হয়েছিল, অনুবাদকর্মের জন্যে সে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছিল। শেষকালে দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে গ্রাস করে। চট্টগ্রাম থেকে এসে পিজি হাসপাতালে যখন তাকে দেখতে গেছি, তখনো তার মনোবল অটুট ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতে হয়।
নেয়ামালের মৃত্যুর পরদিন যখন তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাই, তখন তার স্ত্রী আভা লজ্জিতমুখে বলেছিলেন, আমি যে ঢাকায়, সে-কথা তাঁর মনে ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে আমি ফিরে এসেছি তখন তিন মাসের কিছু বেশিদিন মাত্র। তাঁকে আমি দোষ দিইনি। নেয়ামালের ইচ্ছানুসারে আজিমপুর কবরস্থানে সাধারণ কবরে তাকে সমাধিস্থ করা হয়–সে কোনো চিহ্ন রেখে যেতে চায়নি বলে। পরে তার বড়োভাই নেয়ামাল ওয়াকিল আমাকে বলেছিলেন, ওর কবরটা পাকা করা যায় কি না, সে-চেষ্টা করে দেখতে।
আমি আর সে-চেষ্টা করিনি–খানিকটা তা নিষ্ফল হবে ভেবে, খানিকটা নেয়ামালের ইচ্ছার বিরুদ্ধ কিছু করতে চাইনি বলে।
এর কয়েকমাস পরে মৃত্যুবরণ করেন বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিল, বেবীদের পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা ছিল নিকটতর, তবে আমি তাকে চিনেছিলাম আমার বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেনের অগ্রজ হিসেবে। আমরা যখন স্কুলে পড়ি, তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ এবং আইন পড়েন। তখনই তার খ্যাতি ছিল আবৃত্তিকার হিসেবে এবং বেতার ও মঞ্চের অভিনেতা হিসেবে। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশেও অভিনয়ের জন্যে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের জন্যে প্রয়োজনীয় আলোক প্রভৃতির উত্তাপে বিব্রত হয়ে তিনি আর তার কাজ শেষ করতে পারেননি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ঝুঁকেছিলেন বামপন্থার প্রতি। ১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনের অব্যবহিত পরে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন গণতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি হন তার প্রচার-সম্পাদক। পরিণামে, ১৯৫৪ সালে প্রদেশে ৯২ক ধারার শাসন জারি হলে, তিনি কারারুদ্ধ হন। পরের বছরে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী-প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরে তার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। তিনি পাকিস্তান আর্টস কাউনসিল পূর্বাঞ্চল শাখারও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা হাইকোর্টে বিশ বছর আইনব্যবসার কালে তিনি জড়িত ছিলেন অর ডিগনাম অ্যান্ড কোম্পানি নামের আইন-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল ল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন। এরশাদের শাসনকালে বিভিন্ন জেলা শহরে হাইকোর্টের আসন স্থাপিত হলে তিনি রংপুরে নিয়োগলাভ করেন। তিনি ছিলেন এই ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রতিবাদ এবং সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে তিনি নানা ক্ষেত্রে বক্তৃতা দিয়েছেন। ফলে ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের এক আদেশবলে বিচারকের পদ থেকে তিনি অপসৃত হন।
