আগরতলায় যে-শওকতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী ছাড়া আর কেউ নন। তিনি যুক্তরাজ্যে আমাদের সাবেক হাই কমিশনার, জার্মানিতে সাবেক রাষ্ট্রদূত। কিন্তু কাছের পরিচয়টা না দিয়ে আগরতলার কথা কেন বললেন?
ফোন করে সেটাই প্রথমে জানতে চাইলাম। মীর শওকত আলী হাসলেন। বললেন, ‘আগরতলায়ই তো আপনার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল। আর আমার তখনকার পরিচয়ই তো আসল পরিচয়। পরেরগুলো যেমন এসেছে, তেমনি গেছে।
তিনি ফোন করেছিলেন আমি কেমন আছি, তা জানতে। যদি ভালো থেকে থাকি, তাহলে দু-একদিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ খেতে পারি কি? অনেক দিন দেখা হয় না, অনেক কথা জমে আছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও তিনি আমার কাছে শুনতে চান।
মীর শওকত মুক্তিযুদ্ধের পরে চট্টগ্রামের জিওসি হয়েছিলেন। তখন তার সঙ্গে মাঝেমাঝে দেখা হতো। টেলিফোনে কথা হতো তার চেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম থেকে তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। এতদিন পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তিনি আমার খবর নিচ্ছেন, তা আমার জন্যে আনন্দের বিষয়।
আমি যেখানে থাকি, সেখান থেকে জেনারেল শওকতের বাসস্থান একটু দূরে। টিউব বদলে যেতে হয়। যতক্ষণে পৌঁছোবো ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বেশি সময় লেগে গেল। তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডের নিষ্ক্রমণপথে অপেক্ষা করছেন, প্রতিবার ট্রেন এলেই যাত্রীদের দিকে নজর রাখছেন। দুপুরে খাওয়ার সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, চা-কফি কিছু একটা খেয়ে নিয়ে প্রতীক্ষার ক্ষণ পার করছেন তিনি। আমি ট্রেনে বসে অথবা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিত-সময়মতো পৌঁছোতে পারছি না, ওঁকে তা জানাতেও সমর্থ হচ্ছি না।
স্টেশনে পৌঁছে মাফ চাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। মীর শওকতের গাড়িতে তার বাড়ি আসা গেল। তিনি বললেন, আপনার পরিচিত একজনকে আসতে বলেছি। সে বলেছে, আপনি পৌঁছোলে খবর দিতে–চলে আসবে শিগগির।
ফ্রিজ থেকে খাবার-দাবার বের করে উনি নিজেই সব গরম করতে লাগলেন। টেবিলও সাজালেন। এর মধ্যে চলে এলো আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু জিয়াউল হক ওরফে টুলুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা-সিরাজুল হক ওরফে দুলু। তাকে আমি। অনেককাল চিনি, সে শওকতের বিশেষ বন্ধু। খেতে খেতে দেশের কথা উঠলো। দুলু মূলত শ্রোতা–আমরা দুজনই কথা বলছি।
বন থেকে ফিরে জেনারেল লন্ডনেই আছেন। এ-মুহূর্তে দেশে ফেরার কথা ভাবছেন না। তবে দেশের কল্যাণের জন্যে এরশাদ-সরকারের যে-পতন হওয়া দরকার, তাতে তার কোনো সন্দেহ নেই। অনির্দিষ্টকাল তিনি এ দেশে থেকে যেতে পারবেন না, তবে এই সরকারের কালে দেশে ফিরতে চান না। ফিরলে সরকার-পতনের আন্দোলনেই তিনি যোগ দেবেন। বললাম, সরকারবিরোধী আন্দোলন দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে, খুব বেশিদিন এরা ক্ষমতায় থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। দেশে ফিরে তিনি প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
জেনারেল শওকত স্পষ্ট করে কিছু না বললেও আমার মনে হলো, রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তিনি সম্ভবত বিএনপিতেই যোগ দেবেন।
তাঁর স্ত্রী বোধহয় খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এতক্ষণ। এখন আমাদের চা খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শওকত তার গাড়িতে আবার স্টেশনে পৌঁছে দিলেন–আমাদের সঙ্গে দুলু।
১১.
এবার লন্ডনে আসার ঠিক আগে বড়ো দুলাভাইকে হারালাম। সে-কথা বলার আগে আরো কয়েকটি মৃত্যুর কথা বলতে হয়।
জীবন ও মৃত্যুর বাস, মনে হয়, পাশাপাশি ঘরে। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে সময় লাগে না। কেবল পরের ঘর থেকে আগেরটায় ফেরা যায় না।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে আসার পরে প্রথম যে-মৃত্যু আমাকে আঘাত করে, তা আমার বাল্যবন্ধু নেয়ামাল বাসিরের। তখনো স্বামীবাগে থাকি। রাতে (৩০ নভেম্বর ১৯৮৫) টেলিভিশনের খবরে জানলাম, সে মারা গেছে এবং তার দাফন কাফন সব হয়ে গেছে। খুবই কষ্ট পেলাম। কষ্ট আরো বেশি এ-জন্যে যে, তার মৃত্যুসংবাদ আমাকে জানতে হলো টেলিভিশনের খবর থেকে কেউ আমাকে জানানো প্রয়োজন বোধ করলো না। নেয়ামাল বাসির, সৈয়দ আহমদ হোসেন ও আমি প্রিয়নাথ হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়তাম–সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। আহমদও তার মৃত্যুসংবাদ পায়নি–আমার কাছ থেকেই জানলো।
স্কুলে থাকতেই নেয়ামাল–আমরা ওকে এ-নামেই ডাকতাম, যদিও ওর ডাকনাম ছিল বসির–কবিতা লিখতো এবং কবিতা অনুবাদ করতো। ওর আব্বার কাছ থেকে সে উর্দু ও ফারসি শিখেছিল। ম্যাট্রিকে উর্দুতে লেটার পেয়েছিল, আইএ-তে সে পড়ল ফারসি–তাতেও ভালো নম্বর পেয়েছিল। আমার এক বছর পর আইএ পাশ করে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়। বিভাগের অধ্যক্ষ ড. শহীদুল্লাহ সকল ছাত্রকেই ইংরেজি সাবসিডিয়ারি নিতে উৎসাহ দিতেন, ওর ফারসি জ্ঞান দেখে তিনি বললেন, ইংরেজি ও ফারসি পড়তে। একসঙ্গে তিন সাহিত্য পড়ার নিয়ম ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহীদুল্লাহর বিশেষ চেষ্টায় অ্যাকাডেমিক কাউনসিল নেয়ামালকে এই অনুমতি দেয়। কিন্তু ইংরেজি যাদের পক্ষে কাল হয়, সে ছিল তাদের একজন। বেশ পরে সে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও এমএ পাশ করে।
স্কুলের ছাত্রাবস্থা থেকেই সে নিজের খরচ চালাতো। এক বাড়িতে জায়গির থাকতো, হাতখরচের টাকাটাও জোগাড় করতে হতো তাকেই। কলেজে উঠে থেকেছে মেসে, টিউশনি করেছে, কাগজে টুকটাক লিখে উপার্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ফজলুল হক মুসলিম হলে আবাসিক হয়েছে, কাজ করেছে দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজে। করাচিতে সে চলে যায় রেডিও পাকিস্তানের কাজ নিয়ে সেখানে সে সংবাদও পাঠ করতো। তারপর চাকরি নেয় সেখানকার ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে–তাদের পত্রিকা-সম্পাদনার কাজ। সেখান থেকে জাতীয় পরিষদের দোভাষী হয়ে চলে যায় রাওয়ালপিন্ডিতে, তারপর ঢাকায় বদলি হয় জাতীয় পরিষদের সহকারী বিতর্ক সম্পাদক হয়ে। ১৯৭২ সালে সে বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক সম্পাদক পদে উন্নীত হয়।
