পরদিন অ্যানজিওপ্লাস্টি–বেলুনিং কথাটারই চল বেশি, তখনো স্টেনটিংয়ের প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়নি। অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার মুখে শফির কাছে আমার পকেট-চিরুনিটা চাইলাম। শফি বিরক্তির সঙ্গে জানতে চাইলেন, এখন চিরুনি দিয়ে কী করবেন?
বললাম, চুলটা একটু আঁচড়ে নিই, ও টি-তে যদি সুন্দরী নার্স থাকে!
শফির চিন্তাক্লিষ্ট মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটলো।
শিক্ষক প্রশ্ন করেছিলেন ছাত্রকে : ‘গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে তুমি সামনে দেখতে পেলে বাঘ। তোমার সঙ্গে কেউ নেই, হাতে কোনো অস্ত্র নেই। এই অবস্থায় তুমি কী করবে?’ ম্লানমুখে ছাত্র উত্তর দিয়েছিল : আমি আর কী করবো সার, যা করার তা বাঘই করবে!
ও টি-তে ঢুকে আমারও কিছু করার ছিল না, যা করার ডাক্তারই করলেন এবারে আমাকে অজ্ঞান করে।
জ্ঞান যখন ফিরলো, তখন আমি কেবিনের বিছানায়। দেখি, শরীরে নানারকম তার লাগানো আর আমার পা-দুটো দুহাতে ধরে আছে ঊর্মি–ঊর্মি মজহার, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার ছোটো বোন। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন, আমি যেন পা না নাড়াই–সে দায়িত্ব নিয়েছে ঊর্মি। তার সঙ্গে এসেছে ফারুক হায়দার–সেই পরিচয় হলো। অদূরে ম্লানমুখে শফি। আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে দেখে বললেন, আমি বাসায় গিয়ে বরঞ্চ ভাবিকে টেলিফোন করি।’
ঢাকায় আমার ফ্ল্যাটে বাড়ির সবাই ছাড়াও আত্মীয়স্বজনের ভিড়। শফির টেলিফোন পেয়ে সবার স্বস্তিবোধ হলো।
আমার কেবিনে শর্ট-সার্কিট টিভি ক্যামেরা। কয়েকটা মাত্র কেবিনের মনিটর করছে তিন-চারজন নার্স। কখনো অস্ফুট আওয়াজ করেছি। লাউডস্পিকারে প্রশ্ন ভেসে এলো, ‘ইয়েস মিস্টার জামান, এনি প্রবলেম?
অমন সেবা-শুশ্রূষা কখনো পাইনি–আগেও নয়, পরেও নয়। যখন দাড়ি কামালাম, নার্স সামনে আয়না ধরে থাকলো। যেদিন গা মোছার অনুমতি পাওয়া গেল, সেদিন নার্স বাথরুমে নিয়ে গিয়ে সর্বাঙ্গ স্পঞ্জ করে দিল। কেবিনে-কেবিনে ম্যানিকিউরিস্ট ঘুরে যাচ্ছে–বাড়তি পয়সা দিয়ে নখ কাটবো কি না জানতে। পথ্যবিদ এলেন পরামর্শ দিতে। কথা বললেন অনেকখানি সময় নিয়ে। একটা ছাপানো কাগজ দিলেন মহিলা। বললেন, এ-কাগজে লেখা আছে কোনটা তোমার খাওয়া উচিত, কোনটা অনুচিত। তবে আমরা তো সামাজিক জীব–সবসময়ে নিয়ম ধরে চলা যায় না। একবেলা যদি অনিয়ম হয়ে যায়, আরেক বেলায় সেটা পুষিয়ে নিও। তুমি নিজেই বুঝবে কী তোমার করণীয়।
ডাক্তার এসে জানালেন, তাঁর কাজ সফল হয়েছে, এখন আমার ছুটি। বললেন, আজ বিকেলে ক্লান্তিবোধ না হওয়া পর্যন্ত তুমি হাঁটবে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রত্যেকদিন হাঁটবে–এর ব্যত্যয় করা চলবে না।
হাসপাতাল থেকে বের হবার ঠিক আগে জেনারেল শফিউল্লাহ্ দেখতে এলেন। সঙ্গে হাই কমিশনের আরো দু-তিনজন। জেনারেল শফিউল্লাহ্ অভিজ্ঞ রোগী–তিনি বাইপাস করিয়েছেন, তারপর অ্যানজিওপ্লাস্টিও। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, বাইপাসের পরে আবার অ্যানজিওপ্লাস্টি কেন? তিনি বললেন, ‘একাধিক ব্লক থাকায় বাইপাস করা হয়েছিল, তারপর আবার একটি আর্টারিতে ব্লক দেখা দিলো–তখন অ্যানজিওপ্লাস্টি।’
তখনই বুঝতে পারলাম, আমি যে অ্যানজিওপ্লাস্টি করলাম–সেটাই নিরাময় নয়। এ-পথেই আবার হাঁটতে হতে পারে।
হাই কমিশনের সবাই চলে যাওয়ার পরে সর্দার নার্স এলেন। বললেন, তুমি, মনে হয়, তোমার দেশের গুরুত্বপূর্ণ লোক।
কেন?–পালটা প্রশ্ন করি।
নাহলে সদলবলে হাই কমিশনার দেখতে আসে!
বলি, ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আছে–তাই এসেছিলেন। আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ নই।
তিনি হাসেন। বলেন, আমরা ঠিকই বুঝতে পারি, কখন কাকে কেন কোনো উচ্চ পদাধিকারী দেখতে আসে!
হাসপাতাল থেকে আনন্দিতচিত্তে শফির বাড়ি পৌঁছোলাম। সেই বিকেলেই শফি নিয়ে গেলেন ব্রেনট ক্রস শপিং সেন্টারে। বললেন, ‘হাঁটাহাঁটিটা এখান থেকেই আরম্ভ হোক। কিছু কেনাকাটার থাকলে তাও করে নিতে পারেন।’
একটা সুটকেস কিনে ফিরলাম।
পরদিন বাড়িতে অনেকে এলেন দেখতে। প্রত্যাশিতভাবে রোজী, অপ্রত্যাশিতভাবে আনোয়ারা সৈয়দ হক। আরো অনেকে।
ডা, মার্টিন রথম্যান ফোন করে জানালেন, একটা কনফারেসে তিনি আমেরিকায় যাচ্ছেন। আরেকজন ডাক্তারের নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে বললেন, কোনো অসুবিধে হলে যেন তাকে ফোন করি। অসুবিধে হবে ভাবিনি, কিন্তু হলো। জ্বর এলো এবং ছাড়তে চাইলো না। বদলি ডাক্তারকে খবর দেওয়া হলো, সুবিধেজনক সাড়া পাওয়া গেল না।
মাসিমাকে নিয়ে বুলু এলো দেখতে। বললো, ‘চলো আমার বাড়িতে। কাল অন্য ডাক্তার দেখাবো।’
রাতটা তার ওখানে কাটিয়ে পরদিন অন্য ডাক্তারের কাছে গেলাম বুলুর সঙ্গে। তিনি বুলুকে বললেন, তুমি জানো আমি প্রাইভেট রোগী দেখি না। আমি পরামর্শ দিতে পারবো না–দেওয়াটা উচিত হবে না। তুমি হাসপাতালের ডাক্তারের কাছেই রোগীকে নিয়ে যাও।
বুলু তাই করলো। এবারে বদলি ডাক্তার একটু নড়েচড়ে বসলেন। কিন্তু কী যে করবেন, সে-সম্পর্কে তাঁকে নিশ্চিত মনে হলো না। ওষুধ দিলেন বটে, তবে যেন দ্বিধার সঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য জ্বর গেল–সেটা এমনিতে হোক অথবা ওষুধের গুণে হোক। তবে রোগীর প্রতি আগ্রহ ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে, রোগীর আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে, নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে জনে-জনে যে পার্থক্য ঘটে, তার পরিচয় আবার পেলাম।
১০.
শফির ফিলিপিনা মেড বললো, আপনাকে শওকত নামে একজন ফোন করেছিলেন। বললেন, আগরতলায় তার সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়েছিল। ফোন নম্বর দিয়েছেন, কথা বলতে বলেছেন।
