পরে তসদুক আহমেদ ফোন করে জানান, ওই বক্তৃতা বাবদ আমার কিছু সম্মানী প্রাপ্য হয়েছে। কাউকে পাঠিয়ে আমি যেন আনিয়ে নিই।
যেদিন হাসপাতালে গেলাম, শফি ছিলেন সঙ্গে। তাকে বললাম, আমি অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে গেলে তিনি যেন তসন্দুক আহমেদের কাছ থেকে সম্মানীটা নিয়ে আসেন। তাঁর অবস্থান হাসপাতালের কাছেই।
হাসপাতালে আমাকে একটা কেবিন বরাদ্দ করা হলো। পোশাক পালটে রক্ত ইত্যাদির নমুনা দিয়ে খানিক বিশ্রাম। তারপর হুইল চেয়ারে করে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়া।
ডা. রথম্যান বুঝিয়ে বললেন, হাতের যেখানটা আমরা ভাজ করি, সেখানে একটু কেটে ধমনী দিয়ে একটা তার ও ডাই, একটু গরম বোধ হবে, ঢুকিয়ে দেবেন–যে-কোনো পর্যায়ে ব্যথা পেলে বা অস্বস্তিবোধ হলে তাঁকে যেন জানাই। আমাকে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হবে, সুতরাং আমার জ্ঞান থাকবে–পাশে মনিটরের দিকে তাকালে আমার কী হচ্ছে তার ছবি দেখতে পাবো।
ছবি মোটেই চিত্তাকর্ষক নয়–তাই দেখতে ইচ্ছে হলো না। একটু ঘোর-ঘোর ভাব ছিল। একবার বোধহয় অনিচ্ছায় হাত টেনে নিয়েছিলাম। ডাক্তার খুব ব্যগ্রভাবে জানতে চাইলেন, আমার কষ্ট হচ্ছে কি না। বললাম, ও কিছু না। তিনি বললেন, তাঁকে জানাতে যেন ইতস্তত না করি। তারপর আমার কাছে সব অস্পষ্ট।
ট্রলিতে করে আমাকে কেবিনে ফিরিয়ে আনা হলো। ডাক্তার জানালেন খানিক পরে তিনি আসবেন কথা বলতে।
কেবিনে পাংশুমুখে শফি দণ্ডায়মান। জানতে চাইলাম, টাকা আনতে গিয়েছিলেন কি না। তিনি ধমকে উঠলেন, রাখেন আপনার টাকা। আমি আপনার চিন্তায় অস্থির–আর আপনি ওই কটা টাকার কথা ভাবছেন!’
ডা. রথম্যান জানালেন, একটা ব্লক পাওয়া গেছে। তার মতে, অ্যানজিওপ্লাস্টি করানো দরকার। আমি সম্মত হলে তিনি ব্যবস্থা করবেন। বললাম, দু-একদিনে জানাবো আপনাকে।
বিশ্রাম সেরে শফির বাসায় ফেরা। শফি খুবই চিন্তিত। আমি ভাবছি, অতটা খরচ করবো কীভাবে।
বাড়ির সকলের মত, চিকিৎসা করেই ফেরা ভালো। আমার ভাগ্নে মামুন তখন সউদি আরবে। সে বললো, সে কিছু টাকা পাঠাচ্ছে–চিকিৎসা যেন হয়। টাকা অনেক লাগবে। শফি চেনাজানা সকলকে ফোন করে চাদা তুলতে শুরু করলেন। ওসমান জামাল, সিরাজুর রহমান, শফিক রেহমান, শামসুদ্দীন আহমদ মানিক (পরে হাইকোর্টের বিচারপতি), আরো কেউ কেউ চেক পাঠালেন। প্রয়োজন অবশ্য অনেক বেশি। কথাটা চাউর হতে এক-আধটা অপ্রিয় মন্তব্যও কানে ভেসে এলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এ কে নাজিরউদ্দীন আহমদ তখন বিসিসিআই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। তিনি দেশ থেকে লন্ডন হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছিলেন সস্ত্রীক। কার কাছে খবর পেয়ে শফিকে ফোন করলেন–আমাদের দুজনকে লাঞ্চে আমন্ত্রণ জানালেন তার হোটেলে।
খেতে খেতে আমার স্বাস্থ্যের খবর নিলেন, ডাক্তারের মতামত শুনলেন, চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ জানতে চাইলেন। শেষে বললেন, আমার আপত্তি না থাকলে পুরো খরচটা তিনি বিসিসিআই ফাউন্ডেশনকে বহন করতে বলবেন। আমাকে কিছুই করতে হবে না, কোনো আবেদনও নয়। ফাউন্ডেশনকে তিনি লিখবেন, শফি আমার হয়ে চেক গ্রহণ করবেন, শুধু ব্যয়সংক্রান্ত সকল রসিদপত্র ফাউন্ডেশনকে পাঠিয়ে দিতে হবে।
আমি একেবারেই হতবাক। নাজিরউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আমার পরিচয় এতটা ঘনিষ্ঠ নয় যে আমার চিকিৎসার দায়দায়িত্ব তাঁকে ঘাড়ে তুলে নিতে হবে। আমি যে-পরিস্থিতিতে ছিলাম তাতে বললে অর্থ-সাহায্যের জন্যে আবেদন করতে আমি যে খুব ইতস্তত করতাম, তা নয়। কিন্তু আমার সম্মান তিনিই রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। এসব বিষয়ে তিনি আগেই ভেবে রেখেছিলেন। তার ব্যবহারে আপ্লুত না হয়ে উপায় ছিল না।
ঘরে ফিরে শফি পাওয়া চেকগুলো ফেরত দিতে শুরু করলেন। প্রত্যেককেই দীর্ঘ কৈফিয়ত দিতে হলো। নাজির ভাই যদিও বলে দেননি, তবু শফি ও আমি বিসিসিআই ফাউন্ডেশনের নামটা প্রচার না করারই সিদ্ধান্ত নিলাম। ফলে, যাদের সাহায্য ধন্যবাদের সঙ্গে ফেরত দেওয়া হলো, তাঁদের সবার মনে নিশ্চয় এই প্রশ্ন জেগেছিল যে, হঠাৎ করে এত অর্থের সংস্থান কীভাবে হলো।
ডা. বি বি চৌধুরী খুব খুশি। তিনি চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ চিকিৎসা করে আমাকে ফেরত পাঠাতে। কাজটা হবে কি না, এমন সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। এখন মনে হলো, তরী তীরে ভিড়বে। তার উৎসাহে জোয়ার এসে গেল।
নির্দিষ্ট দিনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গেল। শফির চিন্তা বাড়ছে–আমার ভালোমন্দের সকল দায় তাঁর। আমার কিছু ঘটে গেলে আমার পরিবারকে কী কৈফিয়ত দেবেন!
ভর্তির সময়ে মাসিমাকে নিয়ে বুলু এলো। আমাকে সাহস জোগাবার দরকার ছিল না, তা সে জানতো। তবু মৃদুকণ্ঠে বলতে চেষ্টা করলো যে, অ্যানজিওপ্লাস্টি ব্যাপারটা শক্ত কিছু নয় এবং যদিও আপকালে সাহায্যের জন্যে সার্জনদের একটা টিম তৈরি রাখা হয় অপারেশন থিয়েটারে (বলা বাহুল্য, রোগীর খরচে), তবু তেমন কিছুর দরকার হয় না সচরাচর।
প্রাইভেট হাসপাতাল–প্রায় পাঁচতারা হোটেলের মতো। সন্ধ্যায় মেনু নিয়ে এলো একটি মেয়ে–চঞ্চল বালিকাই বলা চলে–সঙ্গে ওয়াইন লিস্ট। রোগশয্যায় ওয়াইন খাওয়ার স্পৃহা নেই, খাবারের তালিকা দেখছি মনোযোগ দিয়ে। মেয়েটির আর তর সয় না। জিজ্ঞেস করলো, সে কিছু পরামর্শ দিতে পারে কি না। হেসে বললাম, শুনি তোমার সুপারিশ। সে বললো, তোমার যা যা খাওয়া নিষেধ–সব খেয়ে ফেলো, কাল তো অপারেশন হচ্ছে। তার সরলতা দেখে এবার জোরেই হেসে ফেললাম।
