সন্ধ্যার পরে ফোন করলেন শফিক রেহমান। বললেন, তুমি এমন একটা অনুষ্ঠানে এসেছ যা বিতর্কিত। ভালো হয়, তুমি যদি না যাও।’ আমি বললাম, ‘আমার ঢাকার ফোন নম্বর আছে আপনার কাছে। আগে ফোন করলেন না কেন? এদের টিকিটে এখানে এসেছি–তারপর এদের অনুষ্ঠানে না গিয়ে পারি কী করে!’ শফিক রেহমান হাসলেন। বললেন, ‘সিক হয়ে যাও।’ বললাম, তা হয় না। খানিক পরে আরো একজন একই মর্মে ফোন করলেন। তাঁকেও আমি একই উত্তর দিলাম। কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল।
অনুষ্ঠানের আগের রাতে অনুষ্ঠানস্থলে হাঙ্গামা হলো। একটা ছোট্ট শহিদ মিনার করা হয়েছিল–সেটা ভেঙে দেওয়া হয়। বন্ধ মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে জনদুই তরুণ গ্রেপ্তার হয় পুলিশের হাতে। শুনলাম, লন্ডনে নিযুক্ত আমাদের হাই কমিশনার এবং দূতাবাসের আরো দু-একজন কর্মকর্তা অনুষ্ঠানে আসবেন–সরকারবিরোধী বাঙালিরা তা চান না। হাই কমিশনার বা কর্মকর্তাদের অবশ্য বক্তৃতা দেওয়ার কথা নয়, তারা শ্রোতা হিসেবে যোগ দেবেন, কিন্তু তাও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
গ্রেপ্তারের সংবাদে মনটা আরো বেশি খারাপ হলো। তবু যথাসময়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলাম।
লন্ডনে তখন আমাদের হাই কমিশনার জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে এসেছেন ডিফেনস অ্যাটাশে কর্নেল আমসা [এ এম এস এ] আমিন–প্রতিবাদীদের আপত্তি মূলত তাকে নিয়েই, আরো দু-একজন কর্মকর্তা। ডা. বি বি চৌধুরী চাইছেন যতটাসম্ভব আমার সরকারবিরোধী ভাবমূর্তি বড়ো করে তুলে দিতে। আমাকে মঞ্চে আহ্বান করার সময়ে তিনি প্রবল আবেগাক্রান্ত হয়ে আমার পরিচয় দিলেন এবং বলে ফেললেন, ‘গণতন্ত্র-প্রতিষ্ঠার জন্যে যিনি প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন, সেই ড. আনিসুজ্জামান। প্রাণ ধারণ করে আছি বলে সেই মুহূর্তে যতটা লজ্জিত হয়েছিলম, বোধহয় তার আগে বা পরে আর কখনো ততটা হইনি।
বক্তৃতাটা উতরে গেল। একুশে ফেব্রুয়ারির কথা বললাম, ভাষা-সংস্কৃতির কথা বললাম, গণতন্ত্রের অপরিহার্যতার কথা, দেশে গণতন্ত্রের জন্যে সংগ্রামের কথা বললাম। প্রতিবাদীরা সমগ্র অনুষ্ঠানে আপত্তির কিছু খুঁজে পেলেন না।
আমার আগে গোলাম মুরশিদ বক্তৃতা করেছিল। তার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েই কেতকী কুশারী ডাইসন এসেছিলেন অক্সফোর্ড থেকে। অনুষ্ঠানের পরে আমরা তিনজন চা খেতে বসেছিলাম একটা রেস্টুরেন্টে। কেতকী বললেন, সবাই যখন আপনাকে সার বলে, আমিও তাই বলব। তারপর তার রবীন্দ্রনাথ ও ভিকটোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে বইটি উপহার দিলেন আমাকে, তাতে কৌতুকচ্ছলে আমাকে সম্বোধন করলেন স্যার/ আনিসুজ্জামান বলে। ভালোয় ভালোয় অনুষ্ঠানের পালা চুকল। এবারে আমার চিকিৎসার উদ্যোগ।
৯.
১৯৮৬ সালের একেবারে শেষদিকে আমার হৃদযন্ত্রের গোলযোগ ধরা পড়ল। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর চিকিৎসাধীন থাকলাম। বিলেত যাওয়ার আগে তার কাছ থেকে আমার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংক্ষিপ্তসার লিখিয়ে নিলাম। সেটা সেখানকার চিকিৎসককে দেখাতে হবে। ডা. চৌধুরী বলে দিলেন, লন্ডনের পরীক্ষায় সম্ভবত একটা ব্লক ধরা পড়বে।
ড. কামাল হোসেন পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, লন্ডনে গিয়ে যেন তার বোন আহমদীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আহমদীকে ফোন করতেই তিনি বললেন, কিংস হসপিটালে ডা. জ্যাকসনের সঙ্গে আমার অ্যাপয়ন্টমেন্ট করে রেখেছেন। আমি যেন যথাসময়ে তার সঙ্গে দেখা করি। একটু বিব্রত হলাম। কেননা ডা. বি বি চৌধুরী বলে রেখেছেন, আমাকে নিয়ে আরেক ডাক্তারের কাছে যাবেন। তিনি অবশ্য এখন বললেন যে, ডা. জ্যাকসন নামকরা চিকিৎসকতার মতামত কাজে আসবে।
প্রাথমিক পরীক্ষার পরে ডা. জ্যাকসন জানালেন, আমার অ্যানজিওগ্রাম করা দরকার–তারপরই কেবল বলা যাবে কী ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।
ডা. বি বি চৌধুরী এবারে আমাকে নিয়ে গেলেন ডা. মার্টিন রথম্যানের কাছে। তিনিও নানারকম পরীক্ষা করতে দিলেন। যে-তরুণীটি এক্স-রে করলো, সে খুবই সুন্দরী। আমাকে নির্দেশ দিলো, আমি বললেই শ্বাস বন্ধ করে রাখবে খানিকক্ষণের জন্যে। বললাম, তোমাকে বলতে হবে না, তুমি ঘরে ঢুকলেই আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কী!
ডা. রথম্যান শেষে একই কথা বললেন, অ্যানজিওগ্রাম করতে হবে। শফিউল্লাহর সঙ্গে পরামর্শ করে এবং বাড়িতে কথা বলে ঠিক করলাম, তারই কাছে অ্যানজিওগ্রাম করবো। তিনি আসতে বললেন স্টেপনি গ্রিনের কাছে লন্ডন ইনডিপেনডেন্ট হসপিটাল নামে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে।
ইত্যবসরে তসন্দুক আহমেদের আয়োজনে একুশে ফেব্রুয়ারি-উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলাম পূর্ব লন্ডনে। সেখানে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক শ্রোতা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি তো মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পক্ষে, তাহলে বলেন, আমরা সিলেটিরা কেন সিলেটিতে শিক্ষা নিতে পারবো না? আমি ভাষা ও উপভাষার পার্থক্য সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু তার আগেই তসদুক আহমেদ–তিনি সভাপতিত্ব করছিলেন–বলে দিলেন, আপনাকে এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। তারপর প্রশ্নকর্তাকে বললেন, ‘এ-বিষয়ে অন্য কোনো সময়ে আলোচনা হবে। প্রশ্নকর্তা খুশি হলেন না। সভাশেষে আমি তসন্দুক আহমেদকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি তো ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম–আপনি বাধা দিলেন কেন? উনি বললেন, আপনি উত্তর দিলে আলোচনাটা সেখানেই থামতো না–অন্যদিকে গড়াতে থাকতো। আমি ওকে জানি।’
