এ-সময়ে রাজনীতিবিদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে। আত্মগোপন করে থাকেন। আত্মগোপনে থেকে ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা। চৌধুরী আমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতেন। একদিন কথা বলে তিনি টেলিফোন আরেকজনকে দিলেন। গলা শুনে টের পেলাম তিনি তার ভায়রাভাই আসাদউল্লাহ। বুঝলাম তাঁর বাড়িতেই ডা. চৌধুরী বাস করছেন। সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ আত্মগোপন করেছিলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের বাড়িতে। কিছুকাল পরে ইশতিয়াক আহমদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর দুর্গতির জন্যে আমরা অনেকে ফয়েজ আহমদকে দায়ী করেছিলাম।
ইশতিয়াক কারাগারে থাকতে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মৃত্যু ঘটে। জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। ইশতিয়াকের সঙ্গে দেখা করতে আমরা ছুটে যাই। দেখলাম, শারীরিক অসুবিধে সহ্য করেও তাঁর মনোবল অক্ষুণ্ণ আছে। পরে ইশতিয়াক যেদিন মুক্তি পান সেদিনই গ্রেপ্তার হন ফয়েজ আহমদ। এমনই অদ্ভুত সংঘটন! ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের যে-প্রকোষ্ঠ থেকে ইশতিয়াক মুক্তি পান, সে-প্রকোষ্ঠেই তার জায়গায় স্থান হয় ফয়েজ আহমদের।
এমন পটভূমিকায়, তবে শেষোক্ত ঘটনার আগে, ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে জাতীয় কবিতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে কবিতা-পাঠের আসরে কবি আবুল হোসেনকে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি শারীরিক কারণে অসমর্থ হওয়ায় ওই আসন দেওয়া হয় শিল্পী কামরুল হাসানকে। মঞ্চে বসে জেনারেল এরশাদের ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছিলেন তিনি, চিত্রের পরিচিতি লিখেছিলেন ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে। সেই সন্ধ্যায়ই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই মঞ্চে ঢলে পড়েন তিনি। শেখ হাসিনার গাড়িতে তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে, কিন্তু ততক্ষণে বড়ো দেরি হয়ে গেছে।
পরদিন তার লাশ নিয়ে আসা হলো চারুকলা ইনস্টিটিউটে। ছাত্র-শিক্ষকদের ইচ্ছা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মসজিদ-প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হোক। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সিন্ডিকেট এর আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আর কাউকে এখানে সমাধিস্থ করা হবে না। যারা সেখানে কামরুল হাসানকে দাফন করার অনুরোধ নিয়ে উপাচার্যের কাছে গেলেন, তাদেরকে উপাচার্য সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বললেন, এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর পক্ষে অনুমতি দেওয়া অসম্ভব। শেষকালে বিষয়টি বিবেচনার জন্যে তিনি সিন্ডিকেটের বিশেষ সভা আহ্বান করতে সম্মত হলেন।
ইত্যবসরে ফয়েজ আহমদ ঘোষণা দিলেন, কামরুল হাসান তাঁর প্রিয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ-প্রাঙ্গণেই শেষ শয্যা নেবেন। তিনি তার ব্যবস্থা করতে উপস্থিত সবাইকে আহ্বান করলেন। কবর খোদাইকারদের আগেই ডেকে আনা হয়েছিল। ফয়েজের ঘোষণার পরে তুমুল হইচইয়ের মধ্যে কোদাল পড়ল মাটিতে।
এই কামরুল ভাইই আমাদের ব্রতচারীর গান শিখিয়েছিলেন : ‘চল কোদাল চালাই/ভুলে মানের বালাই।’ কিন্তু সে-কোদালচালনার লক্ষ্য ছিল ভিন্ন।
কামরুল হাসানের মৃত্যু নিয়ে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের জায়গা-বদল নিয়ে, পরে ‘নিয়তি’ নামে একটি মর্মস্পর্শী কবিতা লেখেন আবুল হোসেন।
৮.
চট্টগ্রামের সুসন্তান ডা. বি বি চৌধুরী পূর্ব লন্ডনে জেনারেল প্র্যাকটিস করেন। সেখানে পিপলস হেল্থ ক্লিনিক নামে তার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে–ওই কেন্দ্রে প্রায় বিনামূল্যেই চিকিৎসা পাওয়া যায়, কয়েকজন উদীয়মান ডাক্তারও সেখানে প্রায় বিনাভাড়ায় বাস করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। ডা. চৌধুরী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠিত করতে, বিশেষ করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে, সক্রিয়। এতে তার কিছু বিরূপ সমালোচনাও হয়, কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য করেন না। কানুনগোপাড়ায়ও তিনি একটি দাঁতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র চালান।
এহেন ডা. চৌধুরী ১৯৮৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বড়ো করে পালন করবেন বলে স্থির করে সেখানে আমাকে আহ্বান করলেন অতিথি-বক্তা হওয়ার জন্যে। সেইসঙ্গে যোগ করলেন, আমি যেন আমার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে যাই সঙ্গে করে–তিনি আমার হৃদয়কে শাসিত করবেন। তার আমন্ত্রণের সমর্থন জানালেন আমার বন্ধু এ বি এম শফিউল্লাহ, আমার ছাত্র গোলাম মুরশিদও সবুজ সংকেত জানালো।
যথারীতি হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছানো গেল। এঁরা তিনজনই আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। শফিউল্লার গাড়িতে করে আমরা সবাই তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছোলাম।
তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছিন্ন করে শফিউল্লাহ্ তখন থাকেন উত্তর লন্ডনে। সুসজ্জিত এক বিশাল বাড়িতে–গোলডার্স গ্রিন ও ব্রেষ্ট ক্রসের মাঝামাঝি জায়গায়। এক ফিলিপিনা মেয়ে রোজ দুবেলা এসে শফির বাড়ি পরিষ্কার করে, বিছানা করে, ডিশওয়াশারে হাঁড়িবাসন ধোয়, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুয়ে ড্রায়ারে শুকিয়ে ইস্ত্রি করে, তার অনুপস্থিতিতে টেলিফোনের বার্তা লিখে রাখে–শফির সঙ্গে তার পিতা-পুত্রীর সম্বন্ধ। শফির পরিচ্ছন্নতার বাতিক আগের চেয়ে বেড়েছে–আমি তো না-বুঝেই জুতো নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লাম, অন্যদের জুতোবিহীন পা দেখে পরে জুতো খুলে রেখে এলাম দরজার বাইরে। শফি অবশ্য প্রতিবাদ করতে থাকলেন, কিন্তু সেদিন বিকেলেই আমার জন্যে একজোড়া কালো মোকাসিন কিনে আনলেন–যাতে জুতোর ফিতে খোলা ও বাধার কষ্ট করতে না হয়। আমরা পৌঁছোবার পর শফি নিজেই চা বানিয়ে আনলেন–চিনির পাত্রে ব্রাউন সুগার। দেখে আমি বললাম, শফি, ব্রাউন সুগার পর্যন্ত চলবে, কিন্তু ব্রাউন ব্রেড চলবে না।’ শফি বললেন, ‘স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি আপনার বিরাগ–একবার খেয়েই দেখুন না।
