১৯৬৯ সালে, আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাই তখন, বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার হিসেবে আমার স্থান ছিল সপ্তম। আমার জ্যেষ্ঠ যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজন বেঁচে নেই, দুজন অবসর নিয়েছেন। তারপরও চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আসার পরে জ্যেষ্ঠতার নিরিখে আমার স্থান হয়। সপ্তম। এখন নবম হলো। সাত থেকে নয় এমন কিছু নয়ছয়ের বিষয় নয়।
৫.
শিল্পী রশিদ চৌধুরীর জীবনের শেষ দিনগুলি কষ্টেই কেটেছিল।
দুই স্ত্রীর থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে ঢাকায় বাস করছিলেন তিনি। বেশি কাজ করতে পারছিলেন না বলে তার ওপর একটা আর্থিক চাপ ছিল। এরই মধ্যে বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিছুদিনের মধ্যে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেলেন প্যারিসে। সেখানে অ্যানি এবং রোজা-রীতার সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটলো। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় ভর্তি হলেন হাসপাতালে। তাঁর ফুসফুস ও পেটে পানি জমেছিল খুব বেশি। পানি বের করা হলো বটে, কিন্তু চিকিৎসকেরা। তার জীবনের আশা দেখতে পেলেন না। রশিদ নিজেই দেশে ফিরে আসতে চাইলেন। প্যারিসে তাকে দেখাশোনা করছিল ওবায়েদ জায়গীরদার। ডাক্তারেরা। তাকে বলেন, রোগী চাইলে দেশে ফিরে যেতে পারে, তবে তার ভ্রমণকালে সঙ্গী হতে হবে একজন চিকিৎসককে। ডা. সৈয়দ আনোয়ারুল হাফিজ তখন ছিলেন। লন্ডনে। ওবায়েদের অনুরোধে তিনি প্যারিসে আসেন, হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁকে রোগীর অবস্থা বুঝিয়ে দেন, তিনি রশিদের সঙ্গে ঢাকায় আসতে সম্মত হন। একই সঙ্গে অ্যানি এবং রোজা-রীতাও ফিরে আসে। ওবায়েদ সকলের যাত্রার ব্যবস্থা করে দেয়, রশিদ যাতে বিমানে শুয়ে আসতে পারেন, সেজন্যে বাড়তি টিকিটও কিনে দেয়।
ঢাকায় ফিরে রশিদ ভর্তি হন ধানমন্ডির মহানগর ক্লিনিকে। খবর পেয়ে বেবী ও আমি তাকে দেখতে যাই। তাঁর, যাকে বলে, মুমূর্ষ অবস্থা। তবু, মনে হয়, চিনতে পারলেন আমাদের, মুখে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন স্মিত হাসি। ওইটুকুই। জানলাম, সে-সময়ে তাঁকে দেখতে আসতে চেয়েছিল জান্নাত, কিন্তু অ্যানি এবং রোজা-রীতার প্রবল আপত্তির মুখে তার আর আসা হয়নি। শারীরিক কারণেই পরিস্থিতির ওপর রশিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
রশিদকে যখন আবার দেখতে যাই, তখন তাঁর জ্ঞান ছিল না। সংজ্ঞাহীন অবস্থায়ই ৫৪ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়।
পরদিন তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণে। সেখানকার ছাত্র-শিক্ষকেরা ভিড় করেছিল তাকে ঘিরে, চারদিক থেকে বন্ধু বান্ধবেরা ছুটে এসেছিল। জান্নাত শেষ পর্যন্ত ক্লিনিকে রশিদকে দেখতে যেতে পেরেছিল।
৬.
জওহরলাল নেহরু এবং অং সানের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লিতে এশিয়ান রিলেশন্স কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত অং সান এতে যোগ দিতে পারেননি (ওই এপ্রিলেই সাধারণ নির্বাচন ছিল বার্মায়), তবে এশিয়ার ত্রিশটি দেশের প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকেরা এসেছিলেন, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল।
এই সম্মেলনের স্মরণে চল্লিশ বৎসর পর আরেকটি সম্মেলন আয়োজিত হয় নয়াদিল্লিতে, ভারত সরকারের উদ্যোগে। এশিয়ান রিলেশন্স কোমেমোরেটিভ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক মুশারফ হোসেন ও আমি তাতে যোগ দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ থেকে আরো কেউ কেউ বোধহয় গিয়েছিলেন। এশিয়ার নানা দেশ থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন এই বিশাল আনন্দযজ্ঞে। ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি ড. শঙ্কর দয়াল শর্মা সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি স্বাগত ভাষণ দিয়েছিলেন। শঙ্কর দয়াল শর্মা উদ্ধৃত করেছিলেন বৈদিক মন্ত্র, রাজীব গান্ধি বাংলায় ও ইংরেজিতে উদ্ধৃত করেছিলেন নজরুল ইসলামের কবিতার চরণ।
সম্মেলন হয়েছিল বিজ্ঞান ভবনে। বহু লোকজন, আলোচ্য বিষয় অনেক। একই সঙ্গে একাধিক কক্ষে অধিবেশন বসছে। অধিবেশনের বাইরেও একান্তে। কিংবা দল বেঁধে গল্পসল্প অথবা তর্ক চলছে। রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী–নানা পেশার, নানা মতের লোক রয়েছেন। কে আসছেন, কে যাচ্ছেন, তাও সবসময়ে ঠাহর করা যায় না।
সব দেশের প্রতিনিধিরাই এশিয়ায় শান্তি ও ঐক্যপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন। কথাটা বলা যত সহজ, করা ততটা নয়। তখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা কেমন, তা জানতে চেয়েছিলাম এক ইরানি প্রতিনিধির কাছে। তাঁর আশা, যুদ্ধ অচিরে শেষ হবে। উৎসাহভরে জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে। তিনি বললেন, ইরাককে হারাতে পারলেই। ইরাকের জনদুই প্রতিনিধিও বললেন, ইরানকে পর্যুদস্ত করেই শান্তিপ্রতিষ্ঠা ঘটবে।
ভারতীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে বরুণ দে ছিলেন। এশীয় ঐক্যপ্রচেষ্টার ইতিহাস স্মরণ করতে গিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও ওকাকুরার কথা বললেন। তার ইচ্ছাক্রমে সে-সম্পর্কে আমি দু-চারটে কথার জোগান দিলাম।
সম্মেলনের বাইরেও জমেছিল ভালো। মুশারফ হোসেন ও আমার বন্ধু অর্জুন সেনগুপ্ত–সে বোধহয় তখন ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সচিব–বেশ বড়ো। এক ভোজের আয়োজন করলো। সেখানে পরিচয় হলো পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. আলাগের সঙ্গে। তিনি তার আগে ছিলেন দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিসের অধ্যাপক, পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অর্জুনের ভোজে আর যদের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাঁদের মধ্যে ওবেরয়-পরিবারের এক দম্পতি ছিলেন–নেপালে তাঁদের বোতলের ব্যবসা। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাঠমান্ডুতে তাঁদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মনুভাই নামে এক বিদ্যানুরাগী ব্যবসায়ীর সঙ্গেও বেশ সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার অনুরোধে পরের বার নয়াদিল্লিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করায় তিনি মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেছিলেন আমাকে। ড. আলাগও প্রথমবার আমাদের আলাদা করে খাইয়েছিলেন। তিনি উপাচার্য হওয়ার পরে আবার দেখা হয়েছিল। চিনতে ভুল করেননি।
৭.
১৯৮৭ সালের অনেকখানি জুড়ে, বিশেষ করে বছরের শেষদিকে, এবং ১৯৮৮ সালের শুরুতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেশ প্রবল হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে অন্তরীণাবদ্ধ করা হয়, দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়, জাতীয় সংসদ বিলোপ করা হয়, বাংলাদেশে বিবিসির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়–তার আগে বিবিসির সংবাদদাতা আতাউস সামাদও গ্রেপ্তার হন। বিরোধী দলের আহ্বানে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হতে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে–বিশেষত ঢাকায়–সরকারপক্ষীয় ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ঘটতে থাকে ক্রমাগত। চট্টগ্রামে হাসিনার নেতৃত্বাধীন মিছিলে পুলিশের গুলিচালনায় কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।
