অল্প সময়ের মধ্যেই জনসমাজে আমাদের বিবৃতির একটা গ্রহণযোগ্যতা দাঁড়িয়ে যায়। বিরোধী দলের কেউ আর আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কটাক্ষ করেননি। সরকারি প্রতিক্রিয়া যে বিরূপ ছিল, তা আগেই বলেছি। তবে সরকারের পক্ষ থেকেও আর কেউ প্রকাশ্য বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হননি।
৪.
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষকদের যেসব পরিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসে থাকতেন, কর্তৃপক্ষ সেসব পরিবারকে বাড়ি বরাদ্দ করেছিলেন ১৫ বছরের জন্য। আমি স্পষ্টই দেখতে পাই, ১৯৮৭ সালে যদি তাদের বাসস্থান ছেড়ে দিতে হয়, অনেকেই বিপদে পড়বেন; অন্তত আরো পাঁচ বছরের জন্যে তাঁদের বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। কথাটা বিভাগের শিক্ষকদের কাউকে কাউকে বলায় তারা কর্তৃপক্ষের কাছে এই মর্মে প্রস্তাব করতে সম্মত হলেন। বাংলা বিভাগের শহীদ শিক্ষকদের পরিবারের জন্যে এই সুবিধা চেয়ে বেশ কয়েকজনের স্বাক্ষর সংবলিত আবেদনপত্র নিয়ে আমি গেলাম উপাচার্যের কাছে। তিনি যথেষ্ট সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। বললেন, বিষয়টা সিন্ডিকেটে নিতে হবে। যে সিদ্ধান্তই হোক, তা প্রযোজ্য হবে সকল শহীদ শিক্ষকের পরিবারের জন্যে–কেবল বাংলা বিভাগের শহীদ শিক্ষকদের পরিবারের জন্যে নয়। আমি বললাম, তাহলে তো আরো ভালো কথা।
পরদিন হুমায়ূন আজাদ আমার কাছে এসে অভিযোগ করলো। বললো, ‘আপনারা কি ক্যাম্পাসের বাড়িঘর কেবল মৃতদেরকেই দেবেন, যারা জীবিত তাদের পরিবারের কথা ভাববেন না?’ আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে, যে-প্রস্তাব আমরা করেছি, তা আমাদের কর্তব্য ছিল। সে তা মানতে চাইল না, উলটো প্রশ্ন করলো, এ-বিষয়ে তো শিক্ষকদের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, কোন অধিকারে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে লিখলাম? এবারে আমি বিরক্তি গোপন করে বললাম, আমরা বিভাগের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত তো জানাইনি, ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন এমন আবেদন করেছি।’ হুমায়ূন বললো, তাই যদি হবে, তাহলে বিভাগের প্যাডের কাগজে আপনারা চিঠি লিখলেন কোন অধিকারে?’ জবাব দিলাম, তুমি কি জানো না, ব্যক্তিগতভাবে আনুষ্ঠানিক চিঠি। লিখলেও বিভাগের প্যাডের কাগজ ব্যবহার করার অধিকার আমাদের প্রত্যেকের আছে?’ এবারে আমার কথাটা বোধ হয় রূঢ় শুনিয়েছিল। হুমায়ূন খানিক চুপ করে থেকে বললো, আপনাদের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তাহলে আমিও উপাচার্যকে লিখব।’ সে লিখেছিল কি না জানি না। সম্ভবত লেখেনি। বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ সকল শহীদ পরিবারকে আরো পাঁচ বছরের জন্যে বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন।
আমি চট্টগ্রামে থাকতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক নিয়োগের জন্য গঠিত নির্বাচক কমিটির একজন সদস্য ছিলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে। চট্টগ্রাম থেকে একবার কী কাজে এসেছি ঢাকায়–উঠেছি বড়ো বোনের বাড়িতে। একদিন শুনলাম, সন্জীদা খাতুন ফোন করেছিলেন আমার খোঁজে। আমি তাকে ফোন করায় তিনি বললেন, তিনি নিজের জন্যে কিছু বলছেন না, তবে অধ্যাপক পদে নিয়োগ পাচ্ছে না বলে হুমায়ূন খুব খারাপ বোধ করছে–আমি কি এ-বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষকে কিছু বলতে পারি? বললাম, আমি সিলেকশন কমিটির মেম্বার, আমার পক্ষে কিছু বলা সংগত হবে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যোগ দেওয়ার পরে কথাটা আবার উঠল। এবারে রাজ্জাক সাহেব বললেন, হুমায়ূন খুব ফ্রাষ্ট্রেটেড বোধ করছে। একদিন সুযোগ পেয়ে আমি উপাচার্য অধ্যাপক মান্নানকে বললাম, নির্বাচকমণ্ডলীর সভা ডাকার বিষয়টা তিনি বিবেচনা করতে পারেন। যদিও তখনও আমি এই মণ্ডলীর একজন, তবু এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেবে কথাটা বলতে অত বাধা অনুভব করলাম না। আমার বলার জন্যে হয়তো নয়, তবু উপাচার্য অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচক কমিটির বৈঠক আহ্বান করলেন, আমি তাতে অংশ নিলাম এবং সন্জীদা খাতুন ও হুমায়ূন আজাদকে অধ্যাপকপদে নিয়োগের সুপারিশ করা হলো। যথারীতি নিয়োগ হয়ে গেল, তারা নতুন পদে যোগ দিলেন।
বছরখানেক পরে বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির এক সভায় পরীক্ষা কিংবা এ-ধরনের কোনো বিষয়সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠনের ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। কে যেন ‘নেক্সট সিনিয়র হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করলো। হুমায়ূন দুম করে বলে বসলো, আনিস সারের চেয়ে আমি সিনিয়র। সবাই একটু অবাক হওয়ায় সে ব্যাখ্যা করলো, সন্জীদা খাতুন ও সে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হয়েছেন, তাই তাঁদের অবেক্ষাধীন কাল–প্রবেশন পিরিয়ড-এক বছরের, আমি অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে অধ্যাপক হয়েছি। বলে আমার অবেক্ষাধীনকাল দু বছরের। আমার দু বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি, তাদের এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অতএব, আমার আগে তাঁদের। নিয়োগ কনফার্মড–পাকা–হয়েছে। ফলে তারা আমার সিনিয়র হয়ে গেছেন। এ-বিষয়ে হুমায়ূনের কাছে রেজিস্ট্রারের চিঠি আছে। আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ তখন বিভাগের সভাপতি। তিনি হুমায়ূনকে বললেন, ‘চিঠিটা নিয়ে আসুন আমরা দেখি।’ আমি বললাম, তার কোনো দরকার নেই, হুমায়ূনের মুখের কথাই যথেষ্ট। তাদের দু জনকে আমার সিনিয়র ধরে কমিটির বিষয়ে যা। করণীয়, তা করা হোক।
