সকালবেলায় বিবৃতি পড়ে বেজায় ক্রুদ্ধ হয়ে আমার বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেন ছুটে এলো আমার বাড়িতে। আমরা এমন একটা বিবৃতি দিতে যাচ্ছি, অথচ তাকে কিছু জানতে দিইনি, এ ছিল তার অভিযোগ। আরো গুরুতর অভিযোগ এই যে, আমরা একটা মার্কিন পরিকল্পনার ফাঁদে পা দিয়েছি এবং এর পেছনে বড়রকম অসদুদ্দেশ্য আছে। একটু পরে এলো ডা. সারোয়ার আলী–সে তখনো কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। তার স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে একেবারেই অনুত্তেজিত কণ্ঠে সে বললো, আনিস ভাই, বলেন দেখি, ব্যাপারটা কী। আপনারা এতজনে সই করলেন, অথচ বাইরের কেউ জানতে পারলো না–এমনটা তো বাংলাদেশে সচরাচর ঘটে না। সত্যি বলছি, আমি বুঝতে এলাম, কী ভেবে আপনারা এমন একটা প্রস্তাব তুললেন এবং এর পরে আপনারা কোন দিকে যাবেন।
পরে খবরের কাগজে অন্যান্য প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত-ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সংসদ-সদস্য–আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন। জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব জাফর ইমাম বিবৃতিকে বলেন অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক, অসৎ ও হঠকারী আর বিবৃতিদাতাদের অভিযুক্ত করেন বুদ্ধিবৃত্তির অসততার দায়ে। প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতে, বিবৃতিটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অন্তর্বর্তী সরকারগঠনের বিধান যেখানে সংবিধানে নেই, সেখানে তা দাবি করে আমরা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছি। উপপ্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বললেন, অন্তর্বর্তী সরকারগঠনের দাবি অবান্তর।
বিবৃতি সমর্থন করলো পাঁচ দল, অলি আহাদের নেতৃত্বাধীন ছয় দলীয় জোট, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, বাকশাল; ছাত্রলীগের দুটি অংশ এবং ছাত্রদল। বিবৃতিপ্রকাশের সময়ে শেখ হাসিনা ছিল বিদেশে। কয়েকদিন পরে দেশে ফিরে। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সে বললো, বিবৃতিটি সুনির্দিষ্ট নয়, অস্পষ্ট; সংবিধানের কোন ধারায় কে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করবেন, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। কিছুদিন আগে আ স ম আবদুর রব জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল, তারপরই আমাদের বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছে। ঘটনাটি, শেখ হাসিনার ভাষায়, বোঝা যাচ্ছে না। দুইয়ের মধ্যে কোনো যোগ আছে কি না, সে জানে না। তবে, তার মতে, এরশাদ সাহেবেরা অনেক খেলাই খেলতে পারেন।
আমাদের প্রস্তাবের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবারে তৈরি করলেন বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন–আমি তার পুনর্লিখন করলাম। এবারে কিন্তু ৩১ জনের সই পাওয়া গেল না। প্রথমে সরে দাঁড়ালেন সজীদা খাতুন। তিনি আমাকে বললেন, তিনি রাজনীতি করেন না, মুশারফ হোসেনের কথায় একবার বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিয়েছেন, তবে বারবার দেবেন না। একটু তিক্তভাবেই জানতে চাইলেন তিনি, ‘মোশাররফ সাহেব কি আড়কাঠি হয়েছেন?’ আরো একজন কেউ স্বাক্ষর দিতে অপারগ হন। তবে ২৯ জনের স্বাক্ষরে ৩১ জনের পক্ষেই বিবৃতি প্রকাশ পেলো।
জেনারেল এরশাদের পতন পর্যন্ত অর্থাৎ পরবর্তী তিন বছর আট মাস পর্যন্ত ৩১ জনের এই গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল, তবে সকলে আমরা একযোগে থাকতে পারিনি। অনেকের ওপরে চাপ আসছিল নানারকম, কেউ কেউ উৎসাহ হারিয়ে ফেলছিলেন, পরিবারের সদস্যদের অস্বাচ্ছন্দ্যের কারণে কেউ কেউ আর একসঙ্গে থাকতে চাইছিলেন না। রাজ্জাক সাহেব একদিন আমাকে বললেন তাকে আর না জড়াতে। আরেকদিন রফিকুল হক বললেন, ৩১ জনের মধ্যে থাকায় তার পেশাগত কাজের ক্ষতি হচ্ছে–তিনি আর আমাদের বৈঠকে যোগ দিতে পারবেন না। সরকারি-আধাসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের তিনি আইনি পরামর্শক ছিলেন–মনে হয়, সেসব দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা চলছিল। তার অবস্থাটা বুঝে আমরা তাঁকে রেহাই দিলাম। তবে অল্পকালের মধ্যে তিনি যখন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন। আমাদের একটু খারাপ লেগেছিল বই কি! ড. মল্লিক, নীলিমা ইব্রাহিম, এ কে এম আহসান, সানাউল হক, এ বি এম জি কিবরিয়া, খন্দকার মাহবুবউদ্দীন–এঁদের সঙ্গে যোগ শিথিল হয়ে গেল। স্ত্রীহত্যার দায়ে পুত্র গ্রেপ্তার হওয়ার পরে ডা. আবুল কাসেম আর বাইরে তেমন বের হতেন না–সে পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ফসিহউদ্দীন মাহতাব যে-প্রকৌশলী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার ওপরেও সরকারের দিক থেকে প্রচণ্ড চাপ আসে। এক পর্যায়ে
মনে হয়েছিল, পেশাগত সংশ্লেষ এবং বিবৃতিদাতাদের সঙ্গে সংযোগের মধ্যে একটা তাঁকে বেছে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমরা যখন প্রথম বিবৃতি দিই, তখন দৈনিক বাংলার প্রিন্টার্স লাইন থেকে সম্পাদক হিসেবে শামসুর রাহমানের নাম সদ্য বাদ দেওয়া হয়েছে সরকারি আদেশে–৩১ জনের অনেকেই অন্যদের সঙ্গে মিলে তারও প্রতিবাদ করেছি। কিছুকাল পরে শামসুর রাহমান ওই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করলেন। সংসারের চাপ পুরোদমেই ছিল তার ওপরে, উপার্জনের কোনো বিকল্প উপায় তাঁর ছিল না। তবু তিনি একটা পথ বেছে নিয়েছিলেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকায় চাকরি করে। তাঁর পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে বলাটা নৈতিকতার মাপকাঠিতে ঠিক ছিল না।
আমাদের বেশিরভাগ বৈঠক হতো মুশারফ হোসেন কিংবা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসস্থানে। বক্তব্য স্থির করার পর মুসাবিদা করার ভার অধিকাংশ সময়ে আমার ওপর পড়তো। বিবৃতি তৈরি হয়ে গেলে মইনুল হোসেন ইত্তেফাঁকের লোকবলের সাহায্যে তা বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতেন।
