নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী গ্রহণ করে এরশাদের সামরিক শাসনকালে গৃহীত সকল ব্যবস্থা অনুমোদন করে। আওয়ামী লীগ অবশ্য সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বিরোধী দলের কিছু সদস্য এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থন লাভ করে সরকার সংবিধান-সংশোধনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। লায়লা সিদ্দিকী সম্ভবত স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন, তাঁর স্বামী লতিফ সিদ্দিকী দীর্ঘকাল কারাগারে আটক ছিল। লায়লা সিদ্দিকী সপ্তম সংশোধনী সমর্থন করেন, দুদিন পরে লতিফ সিদ্দিকী মুক্তিলাভ করে।
সংসদের বাইরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে। সরকারসমর্থক ছাত্র সংগঠন রাষ্ট্রীয় কোনো এজেন্সির সহায়তায় অর্থ ও অস্ত্রবলে বলীয়ান হয়ে ওঠে। তারা অব্যাহতগতিতে সন্ত্রাস চালাতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রভাব পড়ে সর্বাধিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন, প্রকৌশলী-কৃষিবিদ ও চিকিৎসকেরা সমষ্টিগতভাবে ভূমিকা নেন, পেশাজীবীদের ব্যাপক ঐক্য গড়ে ওঠে। তারপরও সামনে কী ঘটবে, তা অজ্ঞাত রয়ে যায়।
৩.
বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কোনো একটা উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, এমন ভাবনা যখন মনকে অধিকার করেছে, তখন একদিন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে আমার বাসায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও আমার আলাপ হলো। তারা বললেন, সংবিধানের আওতায় বিকল্প একটি সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে যদি একটা বিবৃতি দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো নতুন একটা চিন্তার সূচনা হতে পারে। মোজাফফর ও আমি মিলে একটা খসড়া তৈরি করলাম, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের ভার নিলেন অধ্যাপক মুশারফ হোসেন। খসড়া নিয়ে আলোচনার জন্যে পরে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বাড়িতে বসবার ব্যবস্থা হলো। আমি সেখানে যেতে পারলাম না–হঠাৎ জ্বর হয়ে গেল বলে। বিবৃতির চূড়ান্ত রূপদান এবং তাতে স্বাক্ষরদান সেখানেই হলো–আমি পরদিন সই করলাম। ১৯৮৭ সালের ৩১ মার্চ সব কাগজে বিবৃতিটা প্রকাশ পেলো। স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ৩১ হওয়ায় এটি পরিচিত হলো ৩১ বুদ্ধিজীবী বা ৩১ নাগরিকের বিবৃতি বলে। সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা থেকে বিবৃতির শুরু ও শেষটা তুলে দিচ্ছি :
বাংলাদেশে এখন এক গুরুতর সংকটের মধ্যে আমরা কালাতিপাত করছি। সর্বতোমুখী এই সংকট আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্র স্পর্শ করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক গম্ভীর হতাশা বিদ্যমান, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ব্যাপ্তি ও অসাম্যের বিস্তার, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষাক্ষেত্রে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি, সামাজিক ক্ষেত্রে চরম নৈরাশ্য ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ, তা হলো, দেশের প্রায় সকল পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নামে প্রহসনের অবতারণা করায় রাষ্ট্রপতির আসনের মর্যাদা ও জাতীয় সংসদের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোটদানের মতো প্রয়োজনীয় অধিকার হরণ করে নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের মধ্যেও গণতান্ত্রিক নীতি ও পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে অনেকেই সংশয়গ্রস্ত। তেমনি ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে দল ভাঙাভাঙি ও সুবিধাবাদের যে খেলা চলছে, তাতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের শ্রদ্ধা নষ্ট হচ্ছে।…
এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির পথ অবিমিশ্র গণতন্ত্র। সন্ত্রাসের মাঝে মানুষের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে যে তথাকথিত প্রহসনমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে সংবিধানের পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রকৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এজন্য সংবিধানের অধীনে দলনিরপেক্ষ, চরিত্রবান ব্যক্তিসমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রতিষ্ঠা সহায়ক হবে। সে সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হবে সর্বজনীন গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সর্বনিম্ন সময়ে দলীয় ভিত্তিতে সুষ্ঠু সন্ত্রাসমুক্ত জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, যে জনপ্রতিনিধিরা সংবিধান-পরিবর্তনের মাধ্যমে যে অগণতান্ত্রিকতা আর্থ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে, তার নিরসন করবেন। রাজনীতিকে অস্ত্রমুক্ত এবং সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত করার পদক্ষেপও তারা গ্রহণ করবেন। দলনিরপেক্ষ সরকারের কেউই নির্বাচনে কোনপ্রকার অংশগ্রহণ করবেন না বা অর্থবহভাবে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবেন না। আমরা মনে করি, বর্তমান নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য থেকে মুক্তির এটিই একমাত্র পথ। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠনের জন্য এ ব্যাপারে আমরা দেশের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সমর্থন প্রার্থনা করি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, প্রাক্তন বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, বেগম সুফিয়া কামাল, প্রাক্তন উপাচার্য ও অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিম, প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, প্রাক্তন সচিব এ কে এম আহসান, প্রাক্তন সচিব সানাউল হক, প্রাক্তন সচিব আবদুল খালেক, পুলিশের প্রাক্তন মহাপরিদর্শক এ বি এম জি কিবরিয়া, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুবউদ্দীন আহমাদ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডিন অধ্যাপক জহুরুল হক, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ইকবাল মাহমুদ, অধ্যাপক সজীদা খাতুন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এ এম হারুন অর রশীদ, শিল্পী কামরুল হাসান, কবি শামসুর রাহমান, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, অধ্যাপক মুশারফ হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও ড. ফসিহউদ্দীন মাহতাব।
