জায়গা হলো ৩২ নম্বর বাড়ির তিনতলায়। ওখানে যে-রাস্তা ছিল বাড়ি বানাবার আগে, তার নাম ছিল স্যাভেজ রোড। পরে আমরা বাস করবো ভেবে নয়, কোনো কৃতী সাহেবের নামে রাস্তার নামকরণ হয়েছিল। পাকিস্তানি জোশ থেকে সে-নাম পালটে ঈসা খান রোড করা হয়। আমার ফ্ল্যাটের উলটো দিকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পরিবার, আমার ফ্ল্যাটের ঠিক নিচেই মুনীর চৌধুরীর পরিবার বাস করেন। আমার দুই শহীদ শিক্ষকের পরিবারের সান্নিধ্য আমার পক্ষে আনন্দজনক হলো। তাছাড়া, চারতলায় থাকেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানের আমিনুল ইসলাম ও বাংলার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; দোতলায় ইসলামের ইতিহাসের মমতাজুর রহমান তরফদার; একতলায় লোকপ্রশাসনের নূর মোহাম্মদ মিয়া ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের আহমদ শামসুল ইসলাম–যাঁকে আবাল্য বড় ভাই বলে ডাকি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও তাঁকে ছেলেবেলা থেকে চিনতেন বলে বিশেষ খাতির করতেন। ও-বাড়িতে আমরা বেশির ভাগ সমমনা।
আমি ভেবেছিলাম, মাসপয়লায় ফ্ল্যাটে উঠবো। জাফর বললো, বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়া দরকার, নইলে বেদখল হয়ে যাবে। বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলাম, তাও হয়? সে দৃষ্টান্ত দিলো। আর দেরি করলাম না।
সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখে ফ্ল্যাটে উঠলাম। স্বস্তিটা ছিল অপরিসীম।
তার আগে স্বামীবাগে থেকে দুটি কাজ করেছি বাংলা একাডেমীর তাগিদে। মুনীর চৌধুরী রচনাবলীর চতুর্থ খণ্ডের ভূমিকা লেখা আর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রথম খণ্ডের সম্পাদনা। মনজুরে মওলার অন্তহীন দাবি না থাকলে তা করে উঠতে পারতাম না।
এই সময়ে আরো একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত হই। প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহম্মদ শামসউল হককে সভাপতি করে সরকার একটি পরীক্ষা-সংস্কার কমিটি গঠন করেছিল। মুহম্মদ ফেরদাউস খান, আবদুল্লাহ্ আল-মুতী, এ এম হারুন অর রশীদ ও আমি ছিলাম সদস্যদের মধ্যে। এঁদের সঙ্গে কাজ করা আনন্দদায়ক ছিল। কমিটির সদস্যেরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। আমি কোথাও যেতে চাইনি, যাইওনি। আমরা সর্বসম্মত সুপারিশ দাখিল করেছিলাম। তার একটি বা দুটি মাত্র গৃহীত হয়েছিল।
২.
এতদিনে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতাগ্রহণের সাড়ে চার বছর হয়ে গেল। তিনি প্রথমে সেনানিবাসের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে দেখালেন, তারপর নিজে গাড়ি চালিয়ে শহরের পথে চললেন, তারপর সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে আটরশির পীরের সন্দর্শনে যেতে থাকলেন। তার আগে ক্ষমতাসীনদের কাউকে কাউকে দুর্নীতির দায়ে সাজা দিলেন, তারপর তাকে আসন দিলেন নিজের মন্ত্রিসভায়। ভয় ও লোভ দেখিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল ভাঙলেন, সেসব দলের নেতাদের টেনে নিলেন নিজের কাছে। এক সময়ে ড. কামাল হোসেনসহ বিরোধী দলীয় নেতাদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় সামরিক গোয়েন্দারা–তাতেও সকলে ভয় পাননি। আমাদের দেশে সামরিক শাসন এলেই লোকে তাকে সমর্থন করে। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউর রহমান সে-সমর্থন পেয়েছেন, এরশাদও পেয়েছেন। তারপরে লোকে তাদের শাসনের স্বরূপ বুঝতে পারে, তখন বিদ্রোহ করে। এরশাদ খুনোখুনির পথে না গিয়ে দুর্নীতি অবাধ করার পথ ধরেন। তাতে অনেককে সঙ্গে পান, জনগণকে পান না। তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়–প্রথমে ছাত্রেরাই পথ দেখায়, তারপর রাজনীতিবিদেরা। তিনি রাজনীতি বন্ধ করেন, সময় বুঝে রাজনীতি অনুমোদনও করেন। তিনি গণভোটে জনসমর্থন দেখান, দেশি-বিদেশি সকল সাংবাদিকই বলেন, ভোটের সঙ্গে ফলাফলের কোনো সংগতি নেই।
১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পাটি গঠিত হয়। সেপ্টেম্বরের আগে এরশাদ তাতে যোগ দেন না, কিন্তু প্রথম থেকে সবাই জানে, এটাই তার দল। তিনি সংসদ নির্বাচন দেবেন বলে স্থির করেন। শোনা যায়, বিরোধী দল একজোট হয়েছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ১৫০টি করে আসনে প্রার্থী হবেন। নতুন অধ্যাদেশ জারি হয়, পাঁচটির অধিক আসনে কেউ প্রার্থী হতে পারবে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল, জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে সাতদল এবং স্বতন্ত্রভাবে জামায়াতে ইসলামী এরশাদবিরোধী একই ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর একটা ফল এই হয় যে, দেশের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত বৈধতা পেতে শুরু করে। এরশাদ সংসদ-নির্বাচনের সময়সূচি নতুন করে ঘোষণা করেন। বিরোধী দলগুলো তা বর্জন করবে বলে জানায়। তারপর হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। শুনেছি, আওয়ামী লীগের ড. কামাল হোসেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন এর মূল প্রবক্তা। আওয়ামী লীগের এ সিদ্ধান্ত ১৫ দলের মধ্যেই ভাঙন ধরায়। সংসদ-নির্বাচন হয় ৭ মে। জাতীয় পার্টি সংসদে অর্ধেকের বেশি আসন পায়। কামাল হোসেনকে এবং আরো কাউকে কাউকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টির সেই সংখ্যাধিক্য আরো দৃঢ় হয়। এতদিনে এরশাদ সেনাবাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী এবং মওদুদ আহমদ, ডা. এম এ মতিন ও কাজী জাফর আহমদ উপপ্রধানমন্ত্রী হন।
