বিভাগে আমাকে দেওয়া হয়েছে কারো পরিত্যক্ত রুটিন। সুতরাং এমন অনেক কিছু পড়াতে হচ্ছে যা আমার নিজের এলাকার নয় এবং যা আমি কখনো পড়াইনি। নিজের বইপত্র থেকে অনেক দূরে আছি–বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ভরসা। বিভাগের আবহাওয়া মোটের ওপর ভালোই। আহমদ শরীফ ও নীলিমা ইব্রাহিমকে নিয়ে যে-দ্বন্দ্ব ছিল সেখানে, তাদের অনুপস্থিতিতে সেটা অনেকখানি দূর হয়েছে। বিভাগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি তেমন সুবিধাজনক নয়। রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে–তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের সঙ্গে সরকারপন্থী ছাত্রদের সশস্ত্র সংঘাত দেখা দিচ্ছে। আমি ক্লাসে বক্তৃতা করছি, তার মধ্যে বোমা বা গুলির আওয়াজ পাওয়া গেল। কোত্থেকে একদল ছেলেমেয়ে এসে হুড়মুড় করে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে গেল এবং বিনা বাক্যব্যয়ে বেঞ্চিতে আসন নিয়ে বক্তৃতা শোনার ভান করতে লাগলো। এই অবস্থায় আমার পক্ষে পড়িয়ে যাওয়ার ভান করা মুশকিল।
১৫ অক্টোবর জগন্নাথ হলের ভবন ধসে ৩৬ জন ছাত্র (পরে আরো চারজন) মারা যায়, দুই শতাধিক আহত হয়। খবর পেয়ে ছুটে এলাম। আমার কিছু করার নেই–বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া। জানতে পারলাম, ওই ভবন সংস্কার করার চেষ্টা একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। ওই ভবনেই ছাত্রদের টিভি রুম। সংস্কারকাজ চললে টেলিভিশন দেখার ব্যাঘাত হবে, তাই ছাত্রেরা নাকি কাজে বাধা দিয়েছে। তাই যদি হয় তাহলে কাজটি আত্মঘাতী হয়েছে। এই দুঃখের দিনে একটা ব্যাপার দেখে ভালো লাগলো–ত্রাণকাজে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রিকশাওয়ালা আহতদের নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে–বিনি পয়সায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, শুনলাম, লম্বা লাইন লেগেছে রক্তদানকারীদের। প্রত্যেকেই আন্তরিকভাবে কিছু করতে চেষ্টা করছেন। জগন্নাথ হল থেকে যখন রাজ্জাক সাহেবের বাসায় গেলাম, তিনি এই দৃষ্টান্তের উল্লেখ করলেন, কী কন আপনেরা সাম্প্রদায়িকতার কথা! দেখেন তো সকলে কেমন করত্যাছে। হিন্দু-মুসলমান বিচার করে নাই।
রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাড়ছে বই কমছে না। জানুয়ারি মাসের একদিনে স্বয়ং উপাচার্যের ভবন আক্রান্ত হলো। সেটি ছিল ছুটির দিন। উপাচার্য ও তার স্ত্রী বাড়ি ছিলেন না। তাঁদের সন্তানেরা ছিল। বাইরে থেকে বিস্ফোরকজাতীয় কিছু ছুঁড়ে দেওয়া হয়। তাতে দোতলার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় আগুন লেগে যায়–দোতলাই তো আবাসিক অংশ। বড়োরকম ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, কিন্তু হুমকিটা বড়ো ধরনের নিঃসন্দেহে। আমি গিয়ে দেখি উপাচার্য-দম্পতি ততক্ষণে ফিরে এসেছেন–শিক্ষক ও কর্মকর্তা অনেকেই এসেছেন সমবেদনা জানাতে। অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক ভয়ানক ক্ষুব্ধ ও বিচলিত। বলছেন, আমার উপর রাগ থাকতে পারে, আমার ছেলেমেয়েদের ওপর তার জন্যে শোধ নেবে নাকি? তার কথায় এমন আভাস পাওয়া গেল যে, এই ঘটনার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির যোগ আছে। পরদিনই তিনি পদত্যাগ করলেন। প্রো-ভাইস চান্সেলর অধ্যাপক আবদুল মান্নান ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পেলেন। মাস ছয়েক পর তিনি উপাচার্য হিসেবে নিযুক্তিলাভ করেন। আহমদ শরীফের বিখ্যাত গুঁড়ি ক্লাবে তার সঙ্গে আমার একদিন পরিচয় হয়েছিল–আমি অবশ্য ওই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, বোধহয় শরীফ সাহেবের খোঁজে গিয়েছিলাম। আমার স্নেহভাজন সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বিয়ে করে অধ্যাপক মান্নানের কন্যা শামীমা নাসরীন ওরফে রোজীকে। সেই সুবাদে মান্নান সাহেবের সঙ্গে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। শাহেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা।
ব্যবসায় প্রশাসন ইনসটিটিউটের সহকারী গ্রন্থাগার পদে বেবী নিয়োগ পেলো। ইনসটিটিউটের পরিচালনা পর্ষদের সভায় নির্বাচকমণ্ডলীর সুপারিশ অনুমোদনের সময়ে উপাচার্য জানতে পারেন যে, যার নাম সুপারিশ করা হয়েছে, সে আমার স্ত্রী। তিনি পরে শাহেদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বেবী যে প্রার্থী, তা আমি তাকে আগে বলিনি কেন। তাতে যে বেবীর বিন্দুমাত্র সুনাম হয়েছিল, তা নয়। ইনসটিটিউটের পরিচালক তখন মোজাফফর আহমদ। তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কথা সুবিদিত। সুতরাং যাঁরা বলতে চাইলেন, তাঁরা ঠিকই বললেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাত ঘটেছে। তাতে যে বেবীর বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়েছিল, তাও নয়। নিয়োগলাভ করায় মোজাফরের প্রতি নিশ্চয় বেবী কৃতজ্ঞতাবোধ করেছিল, আমিও করেছিলাম। এপ্রিল মাসে সে কাজে যোগ দেয়। তাতে বাড়তি একটা সুবিধে এই হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ি পাওয়ার ব্যাপারে আমার আর তার পয়েন্ট যোগ হয়ে আমাদের দাবি অনেকখানি এগিয়ে যায়। উপাচার্য কিছুটা আনুকূল্য করেন। বাড়ি বরাদ্দদাতা কমিটির দুই সদস্য–শিক্ষক সমিতির সভাপতি সাদউদ্দীন এবং কলা অনুষদের ডিন মমিন চৌধুরী–আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে যোগ দেওয়ার তেরো মাস পরে বাসা বরাদ্দ হয় আমার নামে।
