শামসুল হক সাহেবকে ফোন করলাম। বললাম, ‘১৮ তারিখেই এখানে। আমার কাজ শেষ। ১৯ তারিখে ঢাকায় যোগ না দিলে আমাকে বেকার থাকতে হবে–চাকরিজীবনে ছেদ পড়বে। ভবি ভুললেন না।
জাফর ফোন করে খবর নিচ্ছে কী হলো। আমি ফোন করলাম আমার বন্ধু ও শামসুল হক সাহেবের ছাত্র–পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক–অজয় রায়কে। তাকে অনুরোধ করলাম উপাচার্যের কাছে যেতে। তিনি গেলেন ঠিকই, কিন্তু কাজ হলো না।
ফোন করলাম বন্ধু নুরুল হককে। তার মাধ্যমেই ১৯৫৩ সালে পরিচয় হয়েছিল তার শিক্ষক শামসুল হকের সঙ্গে। নুরুল হক নিজে গেলেন না, কিন্তু তাঁর বন্ধু এম সাইদুজ্জামানকে আমার দুরবস্থার কথা বললেন। সাইদুজ্জামান। শামসুল হক সাহেবের ছাত্র, তখন অর্থমন্ত্রী।
এবারে কাজ হলো। শামসুল হক সাহেব নিজেই ফোন করলেন। বললেন, ‘আপনি আবার সাইদুজ্জামানকে বলতে গেছেন কেন? ঠিক আছে, ১৯ তারিখে আসেন। আগে আমার সঙ্গে দেখা করবেন, তারপর জয়েন করতে যাবেন। ডিপার্টমেন্টে।
১৮ তারিখ রাতের ট্রেনে ঢাকা রওনা হবো। স্টেশনে লোকে লোকারণ্য। সহকর্মীরা ক্যাম্পাস থেকে এসেছেন, শহরের নানা জায়গা থেকে এসেছেন। ছাত্রছাত্রীরা এসেছে–কোনো কোনো ছাত্রী বা প্রাক্তন ছাত্রীর সঙ্গে তার স্বামীও রয়েছেন।
এ কদিন এ এফ রহমান হলের দারোয়ান-মালিরা–মুনশী মিয়া, আবুল খায়ের, জয়নাল, আমীর হোসেন–বিভাগের পিয়ন আলী অমানুষিক পরিশ্রম। করে আমার জিনিসপত্র বাঁধাবাঁধি করেছে। সেসব রেখে যাচ্ছি পরে নিয়ে যাবো বলে। তবে ওরা সকলেই এসেছে স্টেশনে। অনুষদের কেরানি-পিয়ন এসেছে, বিভাগের সহকারী আবদুর রশীদ এসেছেন।
সাড়ে দশটায় গাড়ি ছাড়লো।
স্বামীবাগে শ্বশুরবাড়িতে এসে উঠলাম। নাশতা খেয়ে ছুটলাম উপাচার্যের দপ্তরে। উপাচার্য সমস্ত ব্যাপারটা হালকা করে উড়িয়ে দিলেন। কেন আমি এত উদৃবিগ্ন হয়েছিলাম, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে ডিপার্টমেন্টে যান-সেখানে জয়েনিং রিপোর্ট দিয়ে সোজা বাড়ি চলে যাবেন।
বললাম, সার, আপনি যদি অনুমতি দেন, আজ রাতেই চট্টগ্রামে রওনা হই। জিনিসপত্র আনতে দুদিন সময় লাগবে।
শামসুল হক বললেন, ‘তা যান। তবে ওদিকে যাবেন না।’
‘কোনদিকে সার?’
‘ওই টিএসসির দিকে।’
এতক্ষণে বুঝলাম। কলা অনুষদের ডিনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টিএসসিতে আজ ভোটদান ও গণনা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে ইতিহাসের আবদুল মমিন চৌধুরীর। মনিরুজ্জামান উপাচার্যের দলীয় লোক। উপাচার্যকে বোধহয় কেউ কেউ বলেছে যে, আমি মমিন চৌধুরীকে ভোট দেবো, সেজন্যে ঠিক নির্বাচনের দিনেই যোগ দিচ্ছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ব্যাপারটা আগে জানলে উনিশের বদলে বিশে যোগ দিতাম। উনিশ-বিশে পার্থক্য যে সামান্য নয়, সে জ্ঞান হলো।
হালখাতা
১.
চট্টগ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ট্রাকে এবং প্রফুল্লরঞ্জন সিংহের সৌজন্যে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের এক ট্রাকে আমাদের সংসারের সব মালপত্র ঢাকায় এলো। বইপত্র সব রাখা হলো আমার ছোটো ভায়রা মোবারকের বাড়িতে, কিছু জিনিস আমার মেজো শ্যালিকা নাজুর বাড়িতে। রুচি তো আগে থাকতেই নানাবাড়িতে ছিল, এখন পরিবারের বাকিরাও সেখানে যোগ দিলাম। একদিন শুনলাম, ও-বাড়ির এক ঠিকে ঝি শুচিকে প্রশ্ন করছে : ‘এ-বাড়ি কার?’
‘আমার নানার।’ শুচির উত্তর।
‘ও, আপনের বাপে ঘরজামাই থাকে?’ তার পুনরপি প্রশ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ি পাওয়ার জন্যে উপাচার্যের কাছে যাই। তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে যদি তিনি কিছু করেন। তাঁর স্ত্রী যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। তবে উপাচার্য নিয়মের বাইরে যাবেন না। আমাকে অপেক্ষা করতে হবে যতদিন না আমার দান আসে। উপাচার্যকে দোষ দিতে পারি না।
বেবী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে চাকরি করে যাচ্ছে। যতখানি ছুটি নেওয়া সম্ভব, নিয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে বাস করে ওর ছোটো ভাই আমের–সে দেখাশোনা করে আজিজের মাছ রপ্তানির ব্যবসা। বেবী তারই সঙ্গে থাকে। বাসে চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের গ্রন্থাগারে চাকরির দরখাস্ত করেছে।
আনন্দকে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি করা সম্ভবপর হয়েছে। অধ্যক্ষা রাজিয়া মতিন চৌধুরী একাধারে আমার ছাত্রী এবং শিক্ষকতুল্য সহকর্মীর স্ত্রী। তিনি প্রথম থেকেই আনন্দকে স্নেহের চোখে দেখছেন। শুচি প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেছে, ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে ভিকারুন্নিসা স্কুল ও কলেজে এবং হলিক্রস কলেজে। ভিকারুন্নিসার ফল প্রকাশ হতেই অধ্যক্ষা হামিদা আলী বেবীকে বললো, আমার সারের মেয়ে আমার কলেজেই পড়বে। হলিক্রসে পরীক্ষার ফলাফল দেখতেও আর যাওয়া হলো না।
ঢাকায় এসে আমার একেবারেই ভালো লাগছে না। চট্টগ্রামের জন্য মন খারাপ করছে। তার ওপর মে মাস থেকে ধূমপান ত্যাগ করেছি–উইথড্রয়াল সিম্পটম খুব প্রবল। চিত্তে সুখ নেই যাকে বলে, জীবন ও জগৎ বিস্বাদ মনে হয়। বেশির ভাগ সময় বিছানায় শুয়ে থাকি। আহসান হাবীবকে মনে পড়ে। জুন মাসে সপরিবারে ঢাকায় এসেছিলাম, তখন সবাই মিলে তাঁদের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেই শেষ দেখা–জুলাই মাসে তিনি চলে গেলেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে মনে পড়ে। তিনি চলে গেছেন দু বছর আগে। আমি যেন কোথাও গিয়েছিলাম। ঢাকায় ফিরে তার মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দু-কলম লিখেছিলাম। ঢাকায় বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মেলামেশা করি ঠিকই, কিন্তু জীবনের ছন্দ ঠিক খুঁজে পাই না। চট্টগ্রামে থাকতে প্রায় রোজ বিকেলে কনট্রাকট ব্রিজ খেলতাম। ঢাকায় এসে একদিনও খেলিনি–তেমন তাগাদাও অনুভব করিনি।
