ততদিনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে মোহাম্মদ আলীর নিয়োগ হয়ে গেছে। আমার সম্পর্কে অত্যন্ত রুচিবিগর্হিত একটি প্রচারপত্র ছড়ানো হয়েছে। তার আগে কলা অনুষদের এক সভায় অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীনের সঙ্গে আমার সংঘাত এমন পর্যায়ে গেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কার্যকারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার বাঁধন কাটতে শুরু করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপত্র বোধহয় পেলাম মে মাসে। নিয়োগ গ্রহণ করে চিঠি দিলাম। বললাম, কর্মে যোগদানের জন্যে আমাকে মাসতিনেক সময় দিতে হবে।
সময় চাইবার দুটি কারণ ছিল। রুচি ততদিনে তার নানাবাড়িতে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ছে। শুচির এসএসসি পরীক্ষার সময়। ঘনিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম ছাড়ার কথা উঠলেই সে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়। সুতরাং বিষয়টি সম্পর্কে আমরা সিদ্ধান্ত নিইনি, তাকে এটা বোঝানো দরকার।
দ্বিতীয়ত, ১৯৮৫ সালে আমার মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে তিন হাজার টাকা। অচিরে নতুন বেতনক্রম চালু হবে। কর্মে জ্যেষ্ঠতা-অনুযায়ী অধ্যাপকদের এক-চতুর্থাংশ সর্বোচ্চ বেতনলাভের যোগ্য হবেন। অর্থাৎ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলে জুলাই মাসে আমার বেতন হয়ে যাবে ছয় হাজার টাকা। সেটা নিয়ে ঢাকায় যোগ দিলে আমার মাইনে ছয় হাজারই থেকে যাবে।
অতএব, আগস্টের কোনো এক সময়ে ঢাকায় যোগ দেবো বলে স্থির করলাম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরগ্রহণের আবেদন যখন করলাম–শুভানুধ্যায়ীরা বললেন, অবসর নিলে পেনশনের পুরো সুবিধে পাবো, নইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী পেনশনের জন্যে আমার ২৬ বছরের চাকুরিজীবনের মোট দশ বছর গণ্য হবে হিসেবে; আরো পনেরো বৎসর চাকরি করলে তবে পুরো পেনশন পাবো, পনেরো বছর যে বেঁচে থাকবো, তার নিশ্চয়তা কী–তখন বিভাগের এবং বিভাগের বাইরের অনেক সহকর্মীই চাইলেন, আমি থেকে যাই। শহর থেকে বন্ধু ও অনুরাগীরা এসে অনুরোধ জানাতে থাকলেন, আমি যেন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করি।
আমাকে অবাক করে দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা আমার বাড়ির সামনে অবস্থান ধর্মঘট করতে শুরু করে দিলো। একদিন নয়, দুদিন নয়, বহুদিন–এক ঘণ্টা নয়, দুঘণ্টা নয়, অনেক সময়। একবার তো তাদের সরাতে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে আসতে হলো। আমি তো অভিভূত, অন্য বিভাগের সহকর্মীরাও অবাক। চট্টগ্রামের সংবাদপত্রে এই অভূতপূর্ব ঘটনার সংবাদ বের হলো।
এই ভালোবাসা ঠেলে ফেলে আসতে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি জানি, আমাকে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে আরেকটা চিঠি দিয়ে জানালাম, ১৯ আগস্ট তারিখে ঢাকায় যোগ দেবো।
দু-একদিন পর দুপুরে উপাচার্য মোহাম্মদ শামসুল হকের ফোন এলো। বেশ রাগতস্বরেই বললেন, কী, আমার সঙ্গে কথা না বলেই আপনি জয়েন করার তারিখ ঠিক করে ফেলেছেন!
আমি অবাক। নিয়োগ-প্রস্তাব গ্রহণ করেছি, যোগদানের জন্যে মাসতিনেক সময় চেয়েছি। কাজে যোগ দিতে উপাচার্যের সঙ্গে তারিখ ঠিক করতে হবে কেন?
আমি মিনমিন করে কিছু একটা বললাম। উপাচার্য বললেন, না, ১৯ তারিখে আপনি যোগ দেবেন না। আমি পরে আপনাকে জানাবো, কবে যোগ দিতে হবে।’
বাংলা বিভাগের সভাপতি তখন রফিকুল ইসলাম। দু-একদিন আগেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে এসেছিলেন। তার কাছে এমন কোনো আভাস তো পাইনি। ফোন করলাম তাকে। তিনি বললেন, এ-বিষয়ে তিনি বিন্দুবিসর্গ জানেন না, কেন যে ভাইস-চান্সেলর আমাকে দেরি করে যেতে বলছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
ঢাকায় ফোন করলাম অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে। তিনি রেগেমেগে ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন, কবে থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে হলে ভাইস-চান্সেলরের অনুমতি নিতে হয়?
ড. কামাল হোসেনকে ফোনে সব জানালাম। তিনি বললেন, উপাচার্যের মৌখিক উপদেশ আমি অগ্রাহ্য করতে পারি। আমি যেন ঈপ্সিত তারিখে কাজে যোগ দিই। কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে মামলা করে দেবেন।
ড. মোজাফফর আহমদকেও বলি ব্যাপারটা। তিনি বললেন, এ তো বড়ো অন্যায় কথা। কাউকে দিয়ে বলানো দরকার যে, কাজটা উনি ঠিক। করছেন না।’ মোজাফফরের যাওয়ার কথা ছিল দেশের বাইরে–সেটা তিনি স্থগিত করলেন।
এবার চট্টগ্রামের উপাচার্যকে গিয়ে ধরলাম। সব কিছু খুলে বলে অনুরোধ করলাম, আমাকে অব্যাহতিদানের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করতে (সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অবশ্য হয়ে গেছে, কিন্তু সে-সিদ্ধান্ত তখনো আমাকে লিখিতভাবে জানানো হয়নি)। বোধহয় পরদিন–ছুটির দিনে–ফোন করে উপাচার্য তাঁর বাড়িতে ডেকে নিলেন। দেখলাম, আলমগীর সিরাজউদ্দীন আগেই পৌঁছে গেছেন। তিনি আমার উপস্থিতিতে উপাচার্যকে বললেন, অবসরগ্রহণের তারিখ একবার স্থির হয়ে গেলে আইনত সেটা আর বদল করা যায় না। তিনি ব্যারিস্টার, আইন ভালো জানেন।
উপাচার্য বললেন, ‘শুনলেন তো, তারিখ বদলানো যাবে না।’
ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
শহরের বন্ধুবান্ধবেরা চারুকলা কলেজের প্রাঙ্গণে আমাকে বিদায়-সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করেছেন সেদিনই। আমার ত্রিশঙ্কু অবস্থার কথা দু একজনকে চুপি চুপি বলেছিলাম। তারা ‘বিদায়’ কথাটা উহ্য রেখে আর যা যা করার সবই করলেন। এত ভালোবাসা রাখবো কোথায়!
