এ-প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। আহমদ শরীফ নিয়োগপত্র পেলেন। কদিন দেরি করে তিনি কর্মে যোগ দিতে এলেন। আমাকে বললেন, ‘শোনো। আমি ভেবে দেখেছি, ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে এসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি ঢাকায় বসে নজরুল সম্পর্কে গবেষণা করবো, চট্টগ্রামে এসে তিন মাস পরপর একটি করে বক্তৃতা দিয়ে যাবো। তোমাদের। নিয়োগপত্রেও উল্লেখ নেই যে, আমাকে চট্টগ্রামেই থাকতে হবে।’
উপাচার্যকে বিষয়টা জানালাম। তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। বললেন, ‘আমি আশা করেছিলাম, উনি এখানে থাকলে ছাত্রছাত্রীরা ওঁর সাহচর্য পাবে, তাতে তারা উপকৃত হবে। উনি হয়তো পিএইচ ডি পর্যায়ে গবেষণার তত্ত্বাবধান করবেন। শুধু বক্তৃতা দিতে এলে তার তো কিছু হবে না।’
এ কথা তো আমারও। পরে শুনতে পাই–সত্যমিথ্যা জানি না–আইনের মারপ্যাঁচে সিদ্ধ আমাদের এক ছাত্র-সহকর্মী শরীফ সাহেবকে বুঝিয়েছে, ‘নিয়োগপত্রে তো লেখা নেই যে, আপনাকে চট্টগ্রামে থাকতে হবে কিংবা রোজ সেখানে যেতে হবে। আপনি ঢাকা ছাড়বেন কেন? যে আমাকে কথাটা জানিয়েছিল, তাকে বলেছিলাম, আমাদের নিয়োগপত্রে কি ক্লাস নেওয়ার কথা লেখা থাকে? তাই বলে কি কেউ বলতে পারে, আমি ক্লাস নেবো কেন? সার কথাটা বিবেচনা করলেন না?
আহমদ শরীফকে এ-কথাটা বলতে পারলাম না। কেননা, তিনি ঠিক কাজ করছেন বলে নিজেকে বুঝিয়ে ফেলেছেন। এখন আমি একটা যুক্তি দিলে তিনি পাল্টা যুক্তি দেবেন দশটা। তর্ক করতে গেলে হয়তো বলে বসবেন, ‘তোমাদের চাকরির দরকার নেই আমার–আমি চললাম।
সুতরাং আহমদ শরীফকে আমরা চট্টগ্রামে পেয়েও পেলাম না। তিনি অবশ্য নজরুল-বক্তৃতা দিতে শৈথিল্য করেননি। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল-যে দুবছর তিনি ছিলেন, তখন নির্দিষ্ট সময় অন্তর-অন্তর তিনি বক্তৃতা দিয়ে গেছেন। বক্তৃতাগুলো পরে একালে নজরুল (ঢাকা, ১৯৯০) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন এভাবে : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আজিজ খান প্রীতিনিলয়েষু এবং অধ্যাপক এ. টি. এম. আনিসুজ্জামান প্রিয়বরেষু।’ বইতে কোনো ভূমিকা বা মুখবন্ধ নেই। আখ্যাপত্রের উলটো পৃষ্ঠায় যেখানে ইংরেজিতে বইয়ের পরিচয় দেওয়া হয়, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এতে সংকলিত বক্তৃতাগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম অধ্যাপকরূপে প্রদত্ত।
২৬.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার অব্যবহিত পরে অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন তিনি ক্যাম্পাসে আমার বাড়িতেও এসেছিলেন। আমার প্রতি তাঁর-পরশুরামের ভাষায়–’অহৈতুকী’ প্রীতি ছিল। তাঁর স্ত্রী ও বেবী যে সহপাঠিনী, তাও তিনি মনে রাখতেন। আমাকে তিনি জিগ্যেস করলেন, বলেন তো, আপনাকে ঢাকায় নেওয়ার ব্যাকরণটা কী?’ আমি বললাম, এটা নিয়ে এত কাদা ছোঁড়াছুড়ি হয়েছে যে আপনার আর নিজের হাত নোংরা না করাই উচিত। অধ্যাপক চৌধুরী আরো দু-একবার পরোক্ষে কথাটা তুলেছেন, আমিও এড়িয়ে গেছি। ব্যাপারটা তার বেশি আর অগ্রসর হয়নি।
তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হকও আমাকে বললেন, ‘এবারে ঢাকায় চলে আসেন–এখানে তো অনেকদিন হলো, আর কত? একসময়ে আমাকে বললেন, বাংলার প্রফেসরশিপ অ্যাডভার্টাইজড হবে শিগগির, অবশ্যই অ্যাপ্লাই করবেন।’ বিজ্ঞাপন বের হলো, তারপরও আমি নড়াচড়া করিনি। আমি একবার ঢাকায় এলে বাংলা বিভাগের মোহাম্মদ আবু জাফর একটা আবেদনপত্র নিয়ে এসে বললো, আপনি এখানে সই করে দিন, আর কিছু করতে হবে না। নিয়োগ পেলে তখন আপনি ভাববার সময় পাবেন, আসবেন কী আসবেন না। আমি স্বাক্ষর দিলাম, বাকি কাগজপত্র সে-ই কোত্থেকে জোগাড় করে আবেদনপত্র জমা দিয়ে দিলো। জাফরের অসাধ্য কিছুই নেই।
চট্টগ্রামে ফিরে যখন বেবীকে ঘটনাটা বললাম, মনে হলো, সে বেশ খুশিই হয়েছে। ছেলেমেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, এমন ইচ্ছে সে পোষণ করতো। দুই মেয়ে ঢাকায় পড়তে এলে আমাদেরও চলে আসতে হবে, এটাও সে ভেবে রেখেছিল। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মের জন্যে আমি যে আবেদন করেছি, তা তার ভালোই লেগেছিল।
দরখাস্ত জমা দেওয়ার তারিখ চলে যাওয়ার পরে নির্বাচকমণ্ডলীর সভা আর বসে না। উপাচার্যের কথার সুরও পাল্টে যায়। যিনি আমাকে আনতে ব্যগ্র ছিলেন, তিনি বলেন, ‘ভেবে দেখেন, আসবেন কি না। যদি না-আসার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে অ্যাপ্লিকেশন উইথড্র করে একটা চিঠি লিখে দেবেন। যিনি বলেছিলেন, চট্টগ্রামে আমি আর কত দিন থাকবো, তিনি বলেন, আপনি ওখানেই ভাইস-চ্যান্সেলর হয়ে যাবেন, কী হবে ঢাকায় এসে!’ তাঁর ভাবান্তরে আমি আহত হই, কিন্তু বিস্মিত হই না। জানতে পারি, নির্বাচকমণ্ডলীর সভা দেরি করে ডাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাঁকে–যাতে কর্মে যারা আমার অনুবর্তী, তাঁরা যেন অধ্যাপকপদে নিযুক্তিলাভের ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পান।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচকমণ্ডলীর অধিবেশন ঘটে। বিজ্ঞাপিত পদে এবং পদোন্নতি লাভ করে অধ্যাপক নিযুক্ত হন চারজন : আমি, সৈয়দ আকরম হোসেন, ওয়াকিল আহমদ ও আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ। যেহেতু চট্টগ্রামের পাট চুকিয়ে আসতে আমার সময় লাগবে আর অন্যেরা নিয়োগপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যোগ দিতে পারবেন, সেহেতু আমি হবো কর্মে সবার কনিষ্ঠ।
