প্রথামাফিক সিনেট-সদস্যদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করতে হলো। ব্যাপারটা আনন্দজনক নয়। ভোট চাইতে না গেলে যিনি স্বতই সমাদর করতেন, তিনি এখন উদাসীনতা দেখালেন। কেউ জানিয়ে দিলেন, অন্য প্রার্থীরাও তাঁর কাছে এসেছিলেন, এ-অবস্থায় তিনি বিপন্ন বোধ করছেন। কেউ বললেন, মুখ ফুটে কিছু বলার দরকার নেই, তিনি মোটের উপর ওয়াকিবহাল এবং যোগ্যকে বঞ্চিত করবেন না। সহকর্মীদের অনেকেই আমার জন্যে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছিলেন আন্তরিকভাবে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশ পেলে দেখা গেল, মোহাম্মদ আলী সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন, তারপর আমি, তারপর আলমগীর সিরাজউদ্দীন।
প্যানেলে যে-তিনজনের নাম থাকলো, এখন চান্সেলর তার একজনকে উপাচার্য নিয়োগ করবেন। তদৃবির শুরু হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে। মন্ত্রী জেনারেল মাহমুদুল হাসানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় রেজাউল হকের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের হামিদা বানুর পারিবারিক সৌহার্দ্য। সেই সূত্রে হামিদা জেনারেলের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করলেন। আমি ঢাকায় এলাম।
জেনারেল বললেন, ‘প্যানেলের যে-কাউকে প্রেসিডেন্ট ভাইস-চান্সেলর নিযুক্ত করতে পারেন। তবে যাঁকে করবেন, তাঁর কাছে তাঁর কিছু প্রত্যাশা থাকবে।
জানতে চাইলাম, ভাইস-চান্সেলরের কাছে চান্সেলরের আবার কী প্রত্যাশা?’
মাহমুদুল হাসান বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট রাজনীতি করেন, তার ছাত্র-সংগঠন আছে।
কথাটা বাড়তে না দিয়ে বললাম, ছাত্রদের মধ্যে নিরপেক্ষ থাকতে না পারলে কোনো ভাইস-চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে পারবেন না।’
জেনারেল বললেন, তার মানে আপনি আমাদের সাহায্য করবেন না?
বললাম, আমি মনে করি, ছাত্র-রাজনীতিতে ভাইস-চ্যান্সেলরকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।’
এরপর চা-মিষ্টি খেয়ে বিদায়গ্রহণ।
অর্থনীতি বিভাগের মাহবুবউল্লাহ আমার পক্ষে চেষ্টা করতে অনুরোধ করেছিলেন বিচিত্রা-সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরীকে। মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শাহাদাত একসঙ্গে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি এরশাদের কাছে।
পরে শাহাদাত আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘আনিস ভাই, এরশাদ আপনার ওপর এত খ্যাপা কেন?’
বলেছিলাম, ‘নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।’
আমি যখন এ-ব্যাপারে ঢাকায়, তখন রাজ্জাক সাহেব আমাকে বলেছিলেন, ভাইস-চ্যান্সেলর হয়ে আমি কী করতে চাই, তা যেন একটা কাগজে লিখে ফেলি।
আমি পরিহাস করে বললাম, আমি যদি ভাইস-চান্সেলর হইতাম শিরোনামে রচনা?
সার বললেন, আপনি যদি অ্যাকাডেমিক কাজকর্ম করতে চান, তাইলে কী করবেন, তার একটা লিস্টি করা ভালো। যদি ফিজিকাল ডেভেলপমেন্ট করবার ইচ্ছা করেন, তয় সেক্ষেত্রে কী করবেন, তার একটা হিসাব করা ভালো। তা না হইলে রোজকার কাজের চাপে কিছুই করতে পারবেন না।
তখন মনে হয়েছিল, ব্যাপারটা গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেলের মতো। এখন। বুঝি, ওটা খুবই দরকারি বিষয়।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যে অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীকে উপাচার্য নিয়োগ করলেন চান্সেলর।
২৫.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপকপদ থেকে নীলিমা ইব্রাহিম ও আহমদ শরীফ অবসর নিয়েছিলেন ১৯৮১ সালের ৩০ জুন। তারপর নীলিমা ইব্রাহিম এক বৎসরের জন্যে এবং আহমদ শরীফ দু বছরের জন্যে পুনর্নিয়োগ পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী তাঁদের পুনর্নিয়োগের কাল আরো বাড়ানো যেতো–সর্বমোট পাঁচ বছর–কিন্তু কারো ক্ষেত্রেই তা আর হয়নি। তার জন্যে কিছুটা দায়ী ছিল বিভাগের অন্তর্কলহ। ফলে নীলিমা ইব্রাহিম ১৯৮২ সালের ৩০ জুন এবং আহমদ শরীফ ১৯৮৩ সালের ৩০ জুন চূড়ান্ত অবসরে চলে যান। এর কিছুকাল পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল আজিজ খান আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, আহমদ শরীফকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা যায় কি না। আবদুল আজিজ খান ব্যক্তিগতভাবে আহমদ শরীফের অনুরাগী এবং তাঁর বিদ্যাবত্তায় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কাজী নজরুল ইসলামের নামে অধ্যাপকের একটি পদ সৃষ্টি করেছিলেন। সেটি উন্মুক্ত ছিল কেবল অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের জন্যে। অধ্যাপক আবুল ফজল ও অধ্যাপক আবদুল করিমের আগ্রহে একবার এই পদে ড. মুহম্মদ এনামুল হককে নিয়োগদানের প্রস্তাব আমি করেছিলাম। তখন ড. হক নিজেও এই পদে যোগ দিতে উৎসাহী ছিলেন। আমাদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে এনামুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অধ্যাপকপদ লাভ করেন। সেটি ছেড়ে চট্টগ্রামে আসতে তাঁর আর ইচ্ছে হয়নি। এসব কথা আগে লিখেছি।
কাজী নজরুল ইসলাম অধ্যাপকের পদটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খালিই পড়ে ছিল। উপাচার্যের ইঙ্গিত পেয়ে আমি যখন এর পরের বার ঢাকায় আসি, তখন আহমদ শরীফের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ি গিয়ে তাঁকে ওই পদগ্রহণের মৌখিক আমন্ত্রণ জানাই। হেনা আপাকে (সালেহা শরীফ) বলি, দেখেন, আপনি আর্মানিটোলার বাড়ি ছেড়ে নীলক্ষেতে আসতে যেমন কান্নাকাটি করেছিলেন, ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম যেতে যেন তেমন কান্নাকাটি করবেন না। হাজার হোক, চট্টগ্রাম আপনার শ্বশুরবাড়ি। কতদিন আগের তাঁর সেই প্রবল কান্নার কথা মনে রেখেছি দেখে হেনা আপা খুশি হলেন, লজ্জাও পেলেন। মুখে বললেন, ‘দ্যাখো, তোমার সার রাজি হন কি না। উনি যদি যান, তখন দেখা যাবে ছেলেদের ফেলে আমি যেতে পারি কি না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ওই পদে তাঁর নিয়োগের প্রস্তাব করার অনুমতি আহমদ শরীফ আমাকে দিলেন।
