১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদ আবার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য বিষয়ে একটি এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিষয়ে অপর একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটি দুটি প্রাথমিক পরিকল্পনার কাজে কিছুদূর অগ্রসর হলেও খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। ১৯৮৩ সালে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনজুরে মওলা আমাকে এই দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন।
আমাকে প্রধান সম্পাদক করে এবং আহমদ শরীফ, কাজী দীন মুহম্মদ, মমতাজুর রহমান তরফদার ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে সদস্য করে সম্পাদকমণ্ডলী গঠিত হয়। আমার পরিকল্পনা-অনুযায়ী ইতিহাসটি বিন্যস্ত হবে পাঁচ খণ্ডে : প্রথম খণ্ডে থাকবে চোদ্দ শতক পর্যন্ত, দ্বিতীয় খণ্ডে পনেরো ও ষোলো শতকের, তৃতীয় খণ্ডে সতেরো ও আঠারো শতকের, চতুর্থ খণ্ডে উনিশ শতকের এবং পঞ্চম খণ্ডে বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের পরিচয়। প্রতি খণ্ডের থাকবে দুটি ভাগ–একভাগে ঐতিহাসিক পটভূমি অর্থাৎ বর্ণিত কালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের আলোচনা থাকবে। দ্বিতীয়ভাগে থাকবে সে-সময়কার বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার পরিচয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এক বা একাধিক অধ্যায় লিখবেন। সম্পাদকমণ্ডলী তাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন-সংযোজন করবেন। আমার প্রস্তাবিত প্রথম খণ্ডের সূচি সম্পাদকমণ্ডলী অনুমোদন করলে লেখকদের রচনা আহ্বান করে পত্র দিলাম।
এরই মধ্যে মনজুরে মওলা একদিন আমাকে চট্টগ্রামে ফোন করে জানালেন, বাংলা একাডেমী বক্তৃতামালা প্রবর্তিত হতে যাচ্ছে এবং তিনি চান খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমি যেন প্রথম বক্তৃতাটা দিই। বক্তৃতার বিষয় তিনি আমার ওপরেই ছেড়ে দিলেন। কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে আমি সম্মত হয়ে গেলাম।
‘পুরোনো বাংলা গদ্য’ শিরোনামে লিখিত বক্তৃতা দিলাম ১৯৮৪ সালের ১৬, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারিতে। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববর্তী বাংলা গদ্য সম্পর্কে আমার সংগৃহীত মালমশলা এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বক্তব্য উপস্থাপন করলাম। বক্তৃতার তিনদিনই অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাবভাবে মনে হলো, নিতান্ত মন্দ হয়নি। কবীর চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে আমার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। আমার কাছে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন কথাশিল্পী শওকত আলী, তাতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরও খানিকটা সায় ছিল।
আমাকে অবাক করে দিয়ে মনজুরে মওলা সঙ্গে সঙ্গেই বক্তৃতাটা ছাপতে অগ্রসর হলেন। তখন ওবায়দুল ইসলাম ছিল বাংলা একাডেমী প্রেসের দায়িত্বে। বইটা বের করায় তার উৎসাহ কারো থেকে কম ছিল না। শিল্পীকে প্রচ্ছদ আঁকতে দিলে দেরি হয়ে যাবে ভেবে সে নিজেই প্রচ্ছদ-পরিকল্পনা করলো, আমার তা ভালো লাগল। সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ প্রুফ দেখে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল। তবু চূড়ান্ত প্রুফ দিয়ে আবদুল হান্নান ঠাকুরকে চট্টগ্রামে আমার কাছে। পাঠালেন মনজুরে মওলা। সে একরাত আমার বাড়িতে থেকে আমাকে দিয়ে প্রুফ সংশোধন করিয়ে ঢাকা ফিরে গেল। অভাবিত ব্যাপার। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পুরোনো বাংলা গদ্য বেরিয়ে গেল।
গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সুধাংশু তুঙ্গ পুরোনো বাংলা গদ্যের কিছু নিদর্শন। আমাকে দিয়েছিলেন-আমার বইতে তার যথাযথ স্বীকৃতি ছিল। তাকে এক কপি বই পাঠালাম। তিনি একাধারে অভিভূত ও বিস্মিত। আমাকে লিখলেন, জানুয়ারি মাসের বক্তৃতা ফেব্রুয়ারিতে বই হয়ে বের হয়, এমন বোধহয় কেবল। বাংলাদেশেই সম্ভবপর। তিনি কবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছেন–তা পড়ে রয়েছে (বইটি বোধহয় ১৯৮৫ সালে প্রকাশ পায়)। বাস্তবিক, পুরোনো বাংলা গদ্য বইটি আমাকে দিয়ে লেখানো এবং অত দ্রুত প্রকাশ করার কৃতিত্ব বা দায়িত্ব মূলত মনজুরে মওলার।
অনেকদিন পরে মনজুরে মওলা আবার আমাকে ফোন করেছিলেন চট্টগ্রামে। সরকার আমাকে একুশে পদক দিতে চাইছে, আমি তা গ্রহণ করবো কি না জানতে চান। তাঁর অনুরোধ, আমার উত্তর যেন হাঁ-সূচক হয়। আমি একদিন সময় নিলাম। একুশে পদক রাষ্ট্রীয় সম্মান–তা পেলে আমি সম্মানিত হবো। কিন্তু যে-সরকার সেটি দিতে যাচ্ছেন, সে-সরকারের ঘোরতর বিরোধী আমি। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্যের কথা বলা হয় বটে, কিন্তু আমাদের মতো দেশে সে-পার্থক্য নিতান্ত ক্ষীণ। তারপরও, রাষ্ট্রীয় সম্মান যে-সরকারই দেয়, আমি নেবো, এমন একটা ভাবা যেতে পারে হয়তো।
পরের দিন মনজুরে মওলা যখন ফোন করলেন, তখন সম্মতি জানালাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমাকে একুশে পদক দেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী আবদুল মজিদ খানের উদযোগ কার্যকর ছিল। আমার সঙ্গে একুশে পদক আরো পেয়েছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। গাফ্ফার চৌধুরী সরকারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট লিখছেন তখন। শুনেছি, মজিদ খান। বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি এরশাদকে : যার গান গেয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির সকাল হয়, তাঁকে একুশে পদক না দিতে পারা লজ্জার বিষয়।
একুশে পদকের ঘোষণার পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে আমার সহকর্মী ও ছাত্রেরা আমাকে সংবর্ধনা জানিয়ে একটি সুন্দর অনুষ্ঠান করেছিল।
২৪.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট উপাচার্য-নিয়োগের জন্য তিনজনের নামের একটি প্যানেল তৈরি করবে। একপক্ষ থেকে মনোনীত হলেন ইংরেজির মোহাম্মদ আলী, রসায়নের এ কে এম শামসুদ্দীন আহমদ ও ইতিহাসের আলমগীর মোহম্মদ সিরাজউদ্দীন। আমরা দলে ভারি নই। তাই স্থির হলো, শুধু আমিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো এ-পক্ষ থেকে। কেউ কেউ প্রস্তাব করেছিলেন, বর্তমান উপাচার্য আবদুল আজিজ খানকে আমার সঙ্গে নিতে। উপাচার্য নিজেও তা চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের মতের মিল খুব সামান্যই। সেক্ষেত্রে • একপক্ষভুক্ত হওয়া আমাদের কারো জন্যেই ঠিক হবে না। উপাচার্যও একাই নামলেন প্রতিযোগিতায়।
