হঠাৎ দরজা খুলে ছেলেমেয়েদের একরকম পাড়িয়েই আমরা একযোগে নেমে এলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় তারাও বিমূঢ়, কেউ কেউ আমাদের পা জাপটে ধরতে চেষ্টা করলো, আমরা সজোরে তাদের হাত সরিয়ে দিলাম। আমি বেশ আগের দিকেই ছিলাম। উপাচার্যের দপ্তর থেকে বেরিয়ে আমি চললাম উত্তর ক্যাম্পাসে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরবো। ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিক দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারতাম নিরাপদে। কিন্তু গাড়িতে উঠে মনে হলো, একা না গিয়ে বরঞ্চ আরো কয়েকজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে যাই। গাড়ি নিয়ে উপাচার্যের অফিসের দিকে চললাম, দু-একজন সহকর্মীকে বোধহয় গাড়িতেও তুললাম, তারপরই পড়ে গেলাম বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের সামনে।
তারপর যা ঘটলো, তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও অভাবিত। ছাত্রদের দেখে আমি গাড়ি থামালাম এবং নেমে আসার চেষ্টা করলাম। তখনই লাঠির বাড়ি দিয়ে গাড়ির সামনের ও পেছনের উইন্ডস্ক্রিন ভাঙা শুরু হলো। ছাত্রেরা আমার সঙ্গে অসংগত আচরণ করবে না বলে আমার অহংকারও চূর্ণ হলো। আমি একেবারেই বিমূঢ়। ছাত্রেরা কাঁচ ভেঙে আনন্দিতচিত্তে প্রস্থান করলো। গণিত বিভাগের অধ্যাপক ফজলী হোসেনের চুলের মধ্যে ভাঙা কাঁচ ঢুকে মাথার চামড়া খানিক কেটে গেল। ততক্ষণে পেছনে-পড়া সহকর্মীরা কাছে চলে এসেছেন। আমি কেন অকুস্থলে ফিরে গেলাম, সেজন্যে তাঁরা তিরস্কার করতে থাকলেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছোটো নূরুল ইসলাম সামনের সিটের কাঁচ সরিয়ে গাড়িতে বসলেন। বাড়িতে ফিরলাম গাড়ি নিয়ে এবং গাড়ি গ্যারাজে রেখে নূরুল ইসলাম ও আমি আবার রওনা হলাম অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে যোগ দিতে। তখনই টের পেলাম, আমার পায়ের আঙুলের কাছে কিছুটা কেটে গেছে এবং সামান্য রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
আটকাবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া সহকর্মীরা তাদের দিকে আমাকে যেতে দেখে তিরস্কারই করলেন এবং যার যার বাড়ি না গিয়ে সবাই আমার বাড়িতেই এলেন। যারা আমাদের সঙ্গে রাতে ছিলেন না, তাঁরাও অনেকে এসে যোগ দিলেন। পাড়ার মহিলারাও এলেন সহানুভূতি জানাতে। ডাক্তার এসে আমার শুশ্রূষা করলেন। উপাচার্য একবার নিজের বাড়ি ঘুরে সরাসরি চলে এলেন এবং করণীয় সম্পর্কে সকলের পরামর্শ চাইলেন। খবর পাওয়া গেল যে, নেতৃত্বদানকারী আমার ছাত্র ও ছাত্রী ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছে এবং খুব সম্ভব চট্টগ্রাম ত্যাগ করেছে।
পরদিন থেকে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল আমার কাছে। ওই ছাত্র এবং ছাত্রীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ সম্পর্কে তাঁরা জানতে চাইলেন, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে এই আন্দোলন সম্পর্কে আমি আগে কিছু আঁচ করতে পেরেছিলাম কি না, তাও ছিল তাঁদের জিজ্ঞাস্য। যারা গাড়ির কাঁচ ভাঙলো, তাদের কাউকে আমি শনাক্ত করতে পেরেছি কি না, তাও ছিল তাদের জানবার বিষয়। অনেক প্রশ্নে আমি যথেষ্ট বিব্রত হয়েছিলাম।
তবে ভাগ্য ভালো, সহকর্মীরা আমাকে ভুল বোঝেন নি। উপাচার্য স্বয়ং যথেষ্ট সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে আমার গাড়ি মেরামত করে দেওয়া হয়। ওই ছাত্র ও ছাত্রীকে বহিষ্কৃত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারা আর ক্যাম্পাসে ফিরে আসেনি। তবে ছাত্রের বাবা মনে করেছিলেন, আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই–অর্থাৎ শিক্ষকদের দলাদলির ফলস্বরূপ–হয়তো তার ছেলেকে এমন শাস্তি পেতে হয়েছিল।
২২.
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত সেমিনারের যে-রিপোর্টটি পরের বছরে প্যারিসে বসে তৈরি করেছিলাম, ১৯৮৩ সালের শেষদিকে তা ম্যাকমিলান প্রেস থেকে প্রকাশিত হলো লন্ডনে। প্রকাশক আমাকে যে-কপি পাঠিয়েছিল, তা পেতে সময় নিয়েছিল। শফিউল্লাহ্ লন্ডনে বইটি দেখে এক কপি কিনে এনে চট্টগ্রামে আমাকে উপহার দেন। কী যে আনন্দ হয়েছিল, তা অল্পকথায় প্রকাশ করা যায় না।
বইটির নাম Culture and Thought। দেখলাম, আনোয়ার আবদেল মালেক দুটি পরিবর্তন করেছেন আমার পাণ্ডুলিপিতে। সম্পাদক হিসেবে আমার নামটা আগে দিয়ে নিজের নাম পরে দিয়েছেন। আর অবতারণা অংশে এই গবেষণা-প্রকল্প সম্পর্কে প্রকল্প-পরিচালক আনোয়ার আবদেল-মালেকের ভাষণের একটা খণ্ডিতাংশ আমি উদ্ধৃত করেছিলাম, সেখানে তিনি নিজের লেখা সবটাই তুলে দিয়েছেন। আমাদের এই বইটি ছিল Transformation of the World’ সিরিজের–প্রকল্পের নামই ছিল তাই–তৃতীয় খণ্ড। আনোয়ার ছিলেন সিরিজের জেনারেল এডিটর বা সিরিজ-সম্পাদক। প্রথম খণ্ড Science and Technology বেরিয়েছিল আগের বছরে। দ্বিতীয় খণ্ড Economy and Society প্রকাশ পায় ১৯৮৪ সালে। পরিকল্পিত চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ডের নাম ছিল যথাক্রমে Religion and Philosophy 47° The Making of a New International order: A Prospective-এগুলো কবে বেরিয়েছিল, আমার ঠিক জানা নেই। সবকটি খণ্ডের আরবি অনুবাদ কায়রো থেকে এবং স্প্যানিশ অনুবাদ মেক্সিকো থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা–শেষ পর্যন্ত তা হয়েছিল কি না, বলতে পারি না।
ইংরেজি প্রত্যেকটি খণ্ডের জ্যাকেটেই ছিল জার্মান মানচিত্রকর আরুনো পিটার্সের অভিক্ষেপণে পৃথিবীর নতুন মানচিত্র–তবে কোনো অজ্ঞাত কারণে বইতে তাঁর স্বীকৃতি ছিল না। আর্ননা পিটার্স দাবি করেছিলেন যে, মারূকেটরের অভিক্ষেপণ ইউরোপকেন্দ্রিক, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি তাতে যথাযথ অনুপাতে রূপ পায়নি। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ তাদের প্রকৃত আয়তনের চেয়ে মারূকেটরের মানচিত্রে ছোটো মনে হয়, তুলনায় ইউরোপের বহু দেশকে বড়ো মনে হয় বটে, কিন্তু আসলে তারা তেমন নয়। এই ত্রুটি সংশোধন করে পিটার্স নতুন অভিক্ষেপণ-অনুযায়ী তাঁর মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ভূ-পৃষ্ঠের দেশগুলো তাতে লম্বাটে দেখায়, তবে সেটা আসল নয়, আসল কথা তাদের আয়তনের যথার্থ প্রতিফলন।
২৩.
বাংলা সাহিত্যের মানসম্পন্ন ইতিহাসগুলোয় যেসব উপকরণ অবহেলিত হয়েছে কিংবা ওইসব বই প্রকাশের পরে যেসব উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে, সেসব বিষয়কে যথাযথ স্থান দিয়ে বাংলা সাহিত্যের একটি নতুন ইতিহাস রচনার চিন্তা অনেকদিন ধরে আমাদের অঞ্চলে দেখা দিয়েছিল। ১৯৬৮ সালে অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই আমাকে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেন। বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন পরিচ্ছেদ লিখবেন এবং একটি সম্পাদকমণ্ডলী তা সম্পাদনা করে গ্রন্থের আকার দেবেন, এই ধারণার ভিত্তিতে আমি চার খণ্ডে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা প্রণয়ন করি। হাই সাহেব প্রস্তাবটি পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করলে মন্ত্রণালয় অনুকূল সাড়া দেয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এক লক্ষ টাকার অনুদান মনজুর করে। মুহম্মদ আবদুল হাইকে সভাপতি, মুনীর চৌধুরী ও আহমদ শরীফকে সদস্য এবং আমাকে সদস্য-সচিব করে সম্পাদকমণ্ডলী গঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে হাই সাহেবের মৃত্যুর এবং আমার চট্টগ্রামে চলে যাওয়ার পরে এ-বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
