ঢাকায় নেমে ল্যান্ডিং কার্ডটাও ঠিকমতো পূরণ করলো না ঝিলু। নাম, পাসপোর্ট নম্বর লিখে আর সই করে ছেড়ে দিলো। ইমিগ্রেশন অফিসারকে বললো, এখন বাড়ি ফেরার জন্যে ব্যাকুল, এত লিখতে পারবো না, বাকিটা আপনি লিখে নেবেন। কাস্টমসের কর্মকর্তা জানতে চাইলেন, তার কাছে। বৈদেশিক মুদ্রা কত আছে। সে বললো, আছে দু-এক হাজার ডলার–এখন গুনতে পারবো না, বাড়ি যাবো। কর্মকর্তা এবারে তার স্যুটকেস খুলতে চাইলো। সে বললো, ‘এই ড. আনিসুজ্জামানকে স্যুটকেসের ওপর বসিয়ে তারপর তালা লাগিয়েছি। এখন খুললে আর বন্ধ করতে পারবো না। এখানে আর ঝামেলা করবেন না–তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে চাই।’
সত্যি আর কেউ ঝামেলা করলেন না।
২০.
চট্টগ্রামে ফিরে আসার পরের একটি স্মরণীয় ঘটনা শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের নামে স্থানীয় বিমানঘাঁটির নামকরণ। সার্জেন্ট জহুরুল হককে আমি সামান্য চিনতাম, তাঁর অগ্রজ আমিনুল হকের সঙ্গেই পরিচয় ছিল বেশি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকাকালে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে তিনি নিহত হন। তাঁর প্রতি ব্যাপক সমর্থনজ্ঞাপন এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ছাত্রেরা তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল রাখে। বিমানবাহিনী এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দেশের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি পরিচিত হবে মুক্তিযুদ্ধের এবং স্বায়ত্তশাসন-আন্দোলনের শহীদদের নামে। যশোরের বিমানঘাঁটির নাম দেওয়া হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটি, চট্টগ্রামেরটা শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক বিমানঘাঁটি।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক বিমানঘাঁটির নামকরণ-অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় দু-এক কথা বলার জন্যে। ঘাঁটির অধিনায়ক স্বাগত ভাষণ জানালেন, অ্যাডভোকেট আমিনুল হক ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করলেন, আমি সামান্য কিছু বললাম, তারপর বিমানবাহিনী-প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ ভাষণ দিলেন। অতি সংক্ষিপ্ত তবে ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শেষে চা-পান। আমিনুল হক ঢাকা থেকে এসেছিলেন সপরিবারে। তার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রী ছিলেন। বহুদিন পর তাঁর সঙ্গে দেখা হলো।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি খুব সম্মানিত বোধ করেছিলাম। এয়ার ভাইস-মার্শাল সুলতান মাহমুদকে তাই সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানালাম। আলাপের এক পর্যায়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কথা উঠলো। দেখলাম, আমাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। তিনি ক্যাডেট কলেজের মতো বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবশ্যকতায় দৃঢ়বিশ্বাসী, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের পক্ষপাতী, উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে উদৃবিগ্ন, তবে শিক্ষাবিস্তারের বিষয়ে খানিকটা উদাসীন। অনেকক্ষণ ধরে আমরা নিষ্ফল তর্ক করলাম।
সুলতান মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে সেই মুহূর্তে তাঁকে এলিট সমাজের বিশেষ প্রতিনিধি বলে মনে হয়েছিল।
২১.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বড়োরকম বিপর্যয় ঘটে গেল।
বিষয়টার শুরু পরীক্ষা পেছানোর দাবি নিয়ে–তা এমন কিছু নতুন নয়। ছাত্রেরা দাবি নিয়ে উপাচার্যের কাছে উপস্থিত হয়, তিনি অনুষদের ডিন, আবাসিক হলের প্রোভোস্ট এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের তাঁর দপ্তরে ডাকেন, কথাবার্তা হয়, কখনো তাৎক্ষণিক মীমাংসা হয়, কখনো আন্দোলন দীর্ঘায়িত হয়। এবারেও সূচনাটা তেমনই হলো। আমরা উপাচার্যের দপ্তরে হাজির হলাম, আলোচনা চলতে চলতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাবৃদ্ধি পেতে থাকলো। উপাচার্যের সচিব একসময়ে এসে আমাদের গাড়িগুলো সরিয়ে রাখার পরামর্শ দিলেন। আমি তার হাতে গাড়ির চাবি দিয়ে বললাম, কাউকে দিয়ে উত্তর ক্যাম্পাসে কারো বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে রাখতে। একটু পরই ছাত্রছাত্রীরা ঘোষণা করলো তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আমাদের ঘেরাও করে রাখবে। আমরা দাবি মানতে রাজি নই–উপাচার্যের অফিসকক্ষেই রাত্রিযাপনের কোনো বিকল্প দেখা গেল না।
এই সময়েই আবিষ্কার করা গেল যে, এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলা বিভাগেরই এক ছাত্র এবং এক ছাত্রী। ছাত্রটি আমার এক ছাত্র ও সহকর্মীর (সে তখন দেশে ছিল না) অনুজ, আমার বিশেষ স্নেহভাজন, আবাসিক হলে জায়গা পাওয়ার আগে আমারই বাড়িতে বাস করেছিল। ছাত্রীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার ভ্রাতুস্পুত্রী, আমার নিকটতম প্রতিবেশিনী, সংগীতে পারদর্শিনী, আমার বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত, বাড়ির সবাই তাকে ভালোবাসে। এরা দুজনেই আমার এত ঘনিষ্ঠ যে, যদি কেউ মনে করেন যে, উপাচার্যকে বিব্রত করার জন্যে আন্দোলনে আমি এদের প্রবৃত্তি দিয়েছি, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না।
আমরা সারারাত উপাচার্যের ঘরে আটকে থাকলাম এবং আমাদেরও রাগের মাত্রা বাড়তে থাকলো। ভোর হতে হতে আমরা সিদ্ধান্ত করলাম যে, ঘেরাও ভেঙেই আমরা বেরিয়ে পড়বো। তার মানে সিঁড়িতে যেসব ছেলেমেয়ে সারারাত ধরে শুয়ে-বসে আছে, আক্ষরিক অর্থে তাদের গায়ের ওপর দিয়ে আমরা নেমে যাবো। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু সবাই একমত হলেন যে, ঘেরাওকারীরা সীমা ছাড়িয়ে গেছে, অতএব আমাদেরও কঠোর হতে হবে।
