তখন প্যারিসে আমাদের রাষ্ট্রদূত কে এম শেহাবউদ্দীন। তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর উদার আতিথেয়তা উপভোগ করেছি। তবে ইনালকোর সঙ্গে আমাদের দূতাবাসের যোগাযোগ-স্থাপনের চেষ্টায় আমি সফল হইনি। ইনালকো তথা ফ্রাসের ধারণা, বিদ্যায়তনিক বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস উদাসীন। দূতাবাস তথা রাষ্ট্রদূতের ধারণা, বাংলাদেশের বিদ্বজ্জন দেখলে ইনালকোর মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যেমন আগ্রহ দেখান, আসলে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের তেমন। আগ্রহ নেই। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই তারা বেশি উৎসাহী, তাই সেদেশের দূতাবাসের সঙ্গে তাঁদের আদানপ্রদান হয়, আমাদের দূতাবাসের সঙ্গে হয় না। দূতাবাসের কথা যে অগ্রাহ্য করার মতো, তা নয়। তবে বিদেশের বিদ্যায়তনিক ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের দূতাবাসের সম্পর্ক যে খুব ক্ষীণ, তাও সত্য।
প্যারিসে থাকাটা সবদিক থেকে আনন্দদায়ক হয়েছিল আমার পক্ষে। কাজও সম্পন্ন হয়েছিল দ্রুতগতিতেই–কিছুটা আগেরবারের অভিজ্ঞতার ফলে। এবারে মার্কস ব্রাদার্সের কয়েকটা ছবি দেখার সুযোগ হয়। প্যারিসের মিউজিয়মগুলোর সঙ্গে পরিচয়ও আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি প্যারিস থেকে যাই লন্ডনে–এবারও কোচে। শফিউল্লাহ লন্ডনের বাইরে কোথাও গেছেন, আমি উঠলাম জ্যান ড্রাইডেনের বাসায়। ওর ছেলে-বন্ধু অ্যালান ততদিনে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে জ্যানের ফ্ল্যাটেই উঠেছে। তারা খুব শিগগিরই বিয়ে করতে যাচ্ছে–দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। জ্যান তো খুব গোছালো মেয়ে। নতুন সংসার পাততে তার কী কী প্রয়োজন। হবে, তার একটা তালিকা যেখানে তার টেলিফোন থাকে, তার পাশেই টাঙিয়ে রেখেছে। বিয়েতে নিমন্ত্রিত বন্ধুরা সেই তালিকা-অনুযায়ী উপহার আনতে পারবে। তালিকা শুনে যে বলছে সে অমুকটা দেবে, সেই উপহারসামগ্রীর নামের পাশে উপহারদাতার নাম লিখে রাখছে জ্যান। এরপর কেউ জানতে চাইলে ওই বস্তুর নাম সে করবে না।
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি হালে আঠারো শতকের চন্দননগরবাসী ফরাসি ব্যবসায়ী ও কুঠিয়াল ভেরলের পারিবারিক কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে। তার মধ্যে কিছু বাংলা কাগজপত্র আছে। তার একটা তালিকা করে দেওয়ার অনুরোধ এলো। সেই কাজে লেগে গেলাম। তখন কথা উঠলো, কিছু পুরোনো কাব্যের পাণ্ডুলিপি এবং রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তলিখিত গানের যে-সংগ্রহ লাইব্রেরিতে আছে, তাও তার সঙ্গে তালিকাভুক্ত করি না কেন! আমিও সাগ্রহে সে-কাজটা করলাম। একটি ছোটো তালিকাগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। হাকিম নড়ে যাওয়ায় অবশ্য সে-তালিকা আজো প্রকাশিত হতে পারেনি।
ফেরার পথে রোমে থেমে আসবো বলে স্থির করলাম। লন্ডনের ইতালীয় দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে গিয়ে লাইন দিতে হলো ফুটপাতে–একটু ভিজেও গেলাম। সমবেত ভিসাপ্রার্থীগণ সুসভ্য ভাষায় দূতাবাসকে গালাগাল করতে থাকলো–কিন্তু তা দেয়াল ভেদ করে কর্তৃপক্ষের কর্ণগোচর হলো না। এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডন অফিসে যেতেই দেখা হয়ে গেল নূরুল কাদের ওরফে ঝিলুর সঙ্গে। সেও রোম হয়ে দেশে ফিরবে। রোমে পৌঁছোবে আগে, তবে রোম ছাড়বে আমার সঙ্গে একই ফ্লাইটে। রোমে যে-হোটেলে সে থাকবে, তার ঠিকানা দিলো। আগস্টের মাঝামাঝি আমি রোমে পৌঁছোলাম। পরদিন ঝিলু এবং তার ছেলের সঙ্গে সারাটা সময় কাটালাম রোমের দ্রষ্টব্য দেখে। তার পরদিন আমার জিনিসপত্র নিয়ে ওর হোটেলে। আরো কিছু ঘোরাঘুরি করে, লাঞ্চ খেয়ে ফিরতি পথে যাত্রা। ওর জিনিসপত্র এতই বেশি যে স্যুটকেসের ডালা লাগানো ভার। অগত্যা আমি একবার করে সুটকেসের ওপরে চেপে বসি আর ঝিলু স্যুটকেস বন্ধ করে। বিমানবন্দরে এসে বোঝা গেল, আমার জিনিসপত্রও নেহাৎ কম নয়। অতিরিক্ত মালের মাশুল দিতে হবে। কাউনটার যদিও এয়ার ইন্ডিয়ার, তার ব্যবস্থাপনা অল-ইতালিয়ার। তারা মার্কিন ডলার নেবে না, শুধু ইতালীয় লিরা নেবে। আমি দৌড়ে যাচ্ছিলাম মানি-এক্সচেঞ্জে। ঝিলু থামিয়ে দিয়ে পকেট থেকে এক মুঠো লিরা বের করে বললো, ‘সময় নেই টাকা ভাঙানোর।’ ঝিলুকে বোধহয় বাড়তি কিছু দিতে হয়নি–দুটো টিকিট তার বিজনেস ক্লাসের।
বোম্বাইতে যাত্রাবিরতি। এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনায় হোটেলে। সেখানে আমি ঝিলুকে জোর করে ডলার গছিয়ে দিলাম। ঝিলু কেনাকাটি করবে, আমাকেও সঙ্গে নিলো। হোটেলে ফিরে এসে একটা শাড়ির প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বললো, এটা তোমার বউয়ের জন্য।
বিকেলে ঢাকার ফ্লাইট। বাংলাদেশ সরকারের এক প্রতিনিধিদল ফিরছেন। আফ্রিকার কোনো দেশ সফর করে–সম্ভবত কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষে। দলের সদস্যেরা আমার সহযাত্রী। ঝিলু তার কেবিন থেকে বেরিয়ে আমার খোঁজ নিতে এসে তাঁদেরও সাক্ষাৎ পেল। এয়ার হোস্টেসকে বললো, এদের সকলকে ড্রিংকস দাও আমার হয়ে–যে যা খেতে চায়। বিস্মিত এয়ার হোস্টেস পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, উনি কে? আর তোমরা এতজন পরস্পরকে চেনো কী করে?’ বললাম, বাংলাদেশ ছোটো জায়গা। লোকসংখ্যা যদিও অনেক, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমাদের কালে একটাই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল–সুতরাং পরস্পর চেনাজানা থাকা অস্বাভাবিক নয়। দিলদরাজ যে-ব্যক্তি সবাইকে আপ্যায়ন করতে চাইলেন, তিনি এককালে সচিব ছিলেন, এখন বড়ো শিল্পপতি। সবাইকে না হলেও অধিকাংশকে চেনেন। আর তার হৃদয়টা খুব বড়ো।’
