খানিক পরে তারাপদ আর আমি মেঝেতে বসলাম আসন গেড়ে। নবনীতা চন্দনের বাটি নিয়ে বসলো আমাদের মুখোমুখি। সে ছড়া কাটতে লাগলো, তার শেষটা অনেকটা এরকম : যমের দুয়ারে দিয়ে কাঁটা/ভগ্নি দেয় ভাইকে ফোঁটা’। উত্তরে বোনের কল্যাণকামনায় ভাইকেও কিছু বলতে হয়, কিন্তু তা আমার জানা নেই। তারাপদ বললো, আমি বলছি, তুমি আমার সঙ্গে বলতে থাকো।’ নকল করে পাশ করলাম। রাধারানী দেবী মৃদু মৃদু হাসতে থাকলেন। নবনীতা আমাদের কপালে ফোঁটা দিলো। ফোঁটা মেখে খেতে বসলাম। ভোজ কয় যাহারে।
আরেক সন্ধ্যায় নবনীতার বাড়িতে গিয়ে দেখি অমর্ত্য সেন বসে আছেন। নবনীতার মুখে ঝড়ের আভাস। ওদের বড়ো মেয়ে অন্তরাও রয়েছে সেখানে। ব্যাপারটা এরকম: অমর্ত্য কলকাতায় এসেছেন অল্প সময়ের জন্যে। ও-বাড়ি গেছেন মেয়েদের দেখতে। নবনীতা তাকে রাতে খেয়ে যেতে বলছে, কিন্তু সে অনুরোধ তিনি রাখতে পারছেন না, কেননা তার অন্যত্র খাওয়ার নিমন্ত্রণ রয়েছে। নবনীতার প্রশ্ন, সময়ের যদি এতই টানাটানি, তাহলে আর আসা কেন? এইরকম কথাবার্তার মধ্যে তৃতীয় পক্ষের বসে থাকাটা স্বস্তিকর নয়। সুতরাং এক ফাঁকে বললাম, আমি আসি এখন।’ নবনীতা ঝঝের সঙ্গে বলে উঠলো, ‘তোমারও নেমন্তন্ন আছে নাকি?’ বললাম, না, তা ঠিক নয়, তবে।’ নবনীতা হুকুম করলো, তবে বসে থাকো।’ অন্তরা নিঃশব্দে চোখ বড়ো করে আমাদের সবাইকে একবার দেখে নিলো। সেই মুহূর্তে তার ছোটো বোন টুম্পা ঘরে ঢুকে। কী গো আনিস মামা, কখন এলে?’ বলে জায়গামতো বসে পড়ল–তাতেই আবহাওয়াটা একটু লঘু হয়ে গেল।
অমর্ত্য সেনের সঙ্গে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের লন্ডনের বাড়িতে। আমি তাকে সে-কথা মনে করিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, তার বিলক্ষণ মনে আছে। বস্তুত অমর্ত্য লন্ডনে এলে তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁকে একবার যেতেই হতো। আমি লন্ডনে থাকলে তারাপদ আমাকেও আমন্ত্রণ জানাতেন। সেখানে অমর্ত্যকে কখনো একা, কখনো সস্ত্রীক, একবার তার স্ত্রী ও মায়ের সঙ্গে পেয়েছি। অমিতা সেনের কাছে আমি নবনীতার বন্ধু বলেই নিজেকে পরিচয় দিয়েছি, যদিও তারাপদ আমার পপাশাকি পরিচয় অনেক দিয়েছেন। অমিতা সেনকে এটাও বলেছিলাম যে আমি সত্যেন সেনের স্নেহধন্য। তা শুনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। ঢাকার কথা বলতে তিনি ভালোবাসতেন। তাঁর স্বামী আশুতোষ সেন যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সে-সময়ের স্মৃতি তাঁর চিত্তে অমলিন হয়ে ছিল। তার থেকেই কিছু কিছু আহরণ করে কথা বলতে থাকলেন।
কলকাতার সেই সন্ধেবেলায় অমর্ত্য শেষ পর্যন্ত অন্যত্র নিমন্ত্রণরক্ষা করতে চলে গেলেন। নবনীতা ঘোষণা করলো, সবাই মিলে বাইরে খেতে যাবে। মেয়েরা তৈরি হয়ে এলে নবনীতাই গাড়ি চালিয়ে আমাদের নিয়ে এলো হাজরার মোড়ে এক ঢাবায়। আমি এর আগে আর কখনো ঢাবায় খাইনি। অতএব নতুন একটা অভিজ্ঞতা হলো।
১৯.
এপ্রিলের গোড়ায় কলকাতা থেকে ফিরে এসে সে-মাসের মাঝামাঝি প্যারিস রওনা হলাম। ঢাকা ছাড়ার আগে লন্ডন থেকে লেখা হায়াৎ মামুদের চিঠি পেলাম। রোজীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করে আবদুল মোমেন বিয়ে করেছে। সালমান রুশদীর বোন সামিনকে। যদি সম্ভবপর হয়, প্যারিস যাওয়ার পথে আমি যেন লন্ডনে রোজীর সঙ্গে দেখা করে যাই। আমার টিকিটটা ছিল ঢাকা কলকাতা-বোম্বাই-প্যারিসের। সুতরাং প্যারিসে যাওয়ার পথে লন্ডনে থামা সম্ভবপর নয়। প্যারিসে পৌঁছে প্রথম সপ্তাহান্তেই কোচে করে লন্ডনে এলাম। একরাত থাকলাম বুলুর বাড়িতে। রোজীর বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে এবং একটা রেস্টুরেন্টে মোমেনের সঙ্গে দেখা করলাম। সামিনের সঙ্গে দেখা করিনি। ফলে, তিনি আমাকে তাঁর প্রতি বিরূপ ভাবলেন।
প্যারিসে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল আগেরবারের মতোই সিতে য়ুনিভার্সিতেয়ারের রেজিস রোবের গ্যারিকে। কিন্তু সবটা সময়ের জন্যে সেখানে জায়গা পাওয়া যায়নি। ফলে, ওই চত্বরেই অন্য এক মেজেতে আমাকে চলে যেতে হয়, থাকতে হয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। যেদিন বাসস্থান পালটাবো, তার আগের দিন আনোয়ার আবদেল-মালেকের ফ্ল্যাটে গেছি। খানিক পরে আলজিয়ার্সে দেখা সেই মেয়েটি এলো আবদেল-মালেক যার নাম দিয়েছিলেন নেফারতিতি। মেয়েটি যখন আমার ঠিকানা চাইলো, বললাম, কালই জায়গা বদল করছি। নতুন জায়গার টেলিফোন নম্বরটা জানা হয়নি, পুরোনোটা সঙ্গে নেই। ব্যাপারটা সত্যি, কিন্তু মেয়েটির বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস হয়নি। সে হয়তো ভাবলো, আমি তাকে এড়িয়ে যাচ্ছি। তাই আমি যখন বললাম, তোমার ফোন নম্বর দাও, নতুন জায়গায় গিয়ে তোমাকে ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর জানিয়ে দেবো, তখন সে আমাকে এড়িয়ে গেল। এই পরমাসুন্দরীর সঙ্গে যে আমার আর যোগাযোগ হলো না, সে-ক্ষতিটা আমারই।
এবারে হাসনাত জাহান আর সিতেতে ছিল না, ঘর ভাড়া করেছিল বাইরে। সুতরাং সিতেতে আমার অভিভাবকত্বের ভার সম্পূর্ণই পড়েছিল নাসিমা জামানের ওপরে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার রওশানুজ্জামান প্যারিসে গিয়েছিলেন কোনো এক প্রশিক্ষণ-উপলক্ষে, কিছুদিন তাঁর সঙ্গ পাওয়া গিয়েছিল। হাসনাতের বাসায় জিওভানি-দম্পতির সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হতো, তারাও এক-আধবার সিতেতে এসে আমার সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে গেছে। অন্যদিকে আনোয়ার আবদেল-মালেক ও ক্রিস্টিন কলপা তো ছিলেনই, তবে সানিয়া ছিল না। ফ্রাঁস ভট্টাচার্যও ছিলেন। তাঁর সৌজন্যে ইনালকোতে এবারও কিছু বলতে হলো। দিলীপ ছিল, কিন্তু গতবারে তার যে-ফরাসি বান্ধবীকে দেখেছিলাম, যাকে নিয়ে সে একবার চট্টগ্রাম হয়ে এলো, তাকে দেখলাম না।
