কলকাতায় আমার কাজ প্রায় শেষ। ফাঁকে ফাঁকে ভিকটোরিয়া মেমোরিয়াল ও এশিয়াটিক সোসাইটিতেও কাগজপত্র দেখে ফেলেছি। এখন ফেরার পালা। ফেরত আসার তারিখ বসাতে হবে টিকিটে, যেতে হবে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসে। এক বিকেলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট ও মহাত্মা গান্ধি রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ট্যাকসি খুঁজছি আর খালি দেখলে। তার পেছনে দৌড়াচ্ছি।
একটা খালি ট্যাকসি দেখে আমি তার বাঁ-দিকের দরজার হাতলে হাত দিয়েছি, তারই মধ্যে আরেকজন ডানদিকের দরজা খুলে উঠে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে আহ্বান করলো, ‘উঠে পড়ুন! অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ সামান্যই, আমাকে চিনে ডাকলেন কি
কে জানে! দ্বিতীয়বার তার আহ্বান শুনে উঠেই পড়লাম। ট্যাকসি চলতে থাকলো কলেজ স্ট্রিট ধরে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পায়ের কাছে খবরের কাগজে মোড়া কিছু একটা রাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমা বের হতেই সেটা ধরে মুখের কাছে নিয়ে তিনি বললেন, ‘ট্যাকসিতে খেতে-খেতে যাচ্ছি দেখলে ছেলেমেয়েরা কী মনে করবে, তাই একটু দেরি করলাম। এবারে চুমুক এবং প্রশ্ন, কোথায় যাবেন?’ বললাম, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইসে–আমাকে মোড়ে নামিয়ে দিলে চলবে।’ শক্তি বললেন, তা কী হয়? আমিও যাবো আপনার সঙ্গে। তারপর। বোতলটার দিকে ইঙ্গিত করে, এটা ততক্ষণে শেষ করে ফেলা দরকার।’ এরপর চুমুক এবং প্রশ্ন, ‘ওখানে কী কাজ?’ বললাম, ‘ফেরার দিনক্ষণ এনডোর্স করতে হবে টিকিটে।’ এ আর এমন কী’ বলে শক্তি যথাকৰ্তব্য করতে। থাকলেন। ট্যাকসি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসে এসে থামলো। শক্তি বৃথা চেষ্টা করলেন ট্যাকসিটাকে দাঁড় করিয়ে রাখার। আমি বৃথা চেষ্টা করলাম ট্যাকসিভাড়া দেওয়ার।
আমি একতলায় টিকিট কাউন্টারে যেতাম। শক্তি আমাকে দোতলায় নিয়ে গেলেন পাবলিক রিলেশনস ম্যানেজার কল্যাণ মজুমদারের কাছে। বললেন, ‘ইনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট অধ্যাপক। কফি খাওয়াও এবং যথাশীঘ্র এঁর কাজটি করে দাও।
কাজ হয়ে গেলে কল্যাণ মজুমদারকে ধন্যবাদ দিয়ে নিচে নামি। শক্তি জানতে চান, কোথায় যাবো। অতিথি-ভবনের ঠিকানা বলি। তিনি বলেন, ‘সেখানে পরে গেলে হবে। এখন আমার সঙ্গে চলুন। আর এই আজ্ঞে-আপনি ভালো লাগছে না। আমি তুমি বলব, তুমিও আমাকে তুমি বলবে।’
এবারে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে এক বন্ধ রেস্টুরেন্ট ও বারের সামনে। ট্যাকসি থেকে নামলাম। হাঁকডাক করে দরজা খোলানো হলো। নিচের তলায় এক টেবিল অধিকার করে শক্তি পানীয় আনতে হুকুম করলো আর বললো, ‘সঙ্গে কিছু দিস রে বাপু!’ বেয়ারার বললো, ‘সার, আজ ড্রাই ডে।’ শক্তি সখেদে বললো, বাবা, বাংলাদেশ থেকে আমার বন্ধু এসেছে, তাকে নিয়ে। এসেছি খাওয়াবো বলে, তোরা বন্ধুর সামনে আমাকে অপমান করবি!’ সে বললো, ‘সার, আমি কী করবো! ম্যানেজার সাহেবও নেই।’ শক্তি বললো, ‘টেলিফোনে লাগা ম্যানেজারকে।’ আমি বাধা দিতে চেষ্টা করি, তাতে কাজ হয় না। টেলিফোনে আবার তার কথা, বাংলাদেশ থেকে খুব সম্মানিত একজন অতিথি নিয়ে এসেছি–ওসব ড্রাই ফ্রাই বুঝি না–আমার মানসম্মান নেই বুঝি! এবার টেলিফোন গেল ওয়েটারের হাতে–’হ্যাঁ সার, হ্যাঁ সা’ শুনতে পেলাম। তার মুখে। তারপর দোতলায় প্রাইভেট অফিস’ লেখা এক ঘরে আমাদের বসিয়ে সে গেল রসদ আনতে। আমি শক্তিকে বলি, আমার জন্যে এটা খুব আর্লি। সে বলে, ‘ড্রিংকসের আবার আর্লি-লেট কী! এতক্ষণে সে আরাম করে। বসে। জোড়া আসনের একটায় হেলান দিয়ে বলে, ‘আল মাহমুদের কবিতা আমার খুব ভালো লাগে। শামসুর রাহমানের চেয়েও।
সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে বেরোনো গেল। ময়দানের দিকে কোনো একটা মেলা বসেছে। সেখানে তার যাওয়ার কথা। আমি বিদায় নিতে চাইলাম। সে বললো, ‘কেন এমন কচ্ছ? আমার সঙ্গ কি তোমার খুব খারাপ লাগছে? শশব্যস্তে বলি, না, না, তা নয়; তোমার এখানে কাজ আছে আর আমারও ফেরা দরকার।’ সে বললো, আচ্ছা, ওখানে হয়ে তোমাকে পৌঁছে আমি বাড়ি ফিরবো!’
মেলায় অসংখ্য ছেলেমেয়ে শক্তির সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল। এখানে। তার কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ছিল না, কিন্তু অন্তত বিশ-পঁচিশজনকে সে এখানে আসতে বলেছিল, তা বোঝা গেল। সবাইকে সে আমার পরিচয় দেয় অতিরঞ্জিত করে, কিন্তু তাদের লক্ষ্য তো শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সৌজন্য করে যারা আমার সঙ্গে কথা বলে, তাদেরও মন পড়ে থাকে তার দিকে। ভালোই লাগে দেখতে-কবির জন্যে মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তারা শক্তির কবিতা আবৃত্তি করে, তার কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে চায়। শক্তি বলে, ‘আমি পদ্য লিখি–কবি হলো সুনীল। ওর কবিতা ভালো করে পড়লে তোমরা অনেক কিছু পাবে। মাঝে মাঝে তাগাদাও দিই শক্তিকে, কিন্তু খুব জোরের সঙ্গে নয়। সে বলে, এখান থেকে বেরিয়ে কোথাও একটু বসে তারপর ফেরা যাবে!’ এবারে আমি শঙ্কিত হই। বলি, তেমন মতলব থাকলে তোমাকে একাই যেতে হবে।’
মেলা থেকে বেরিয়ে ট্যাকসি নিই। শক্তি ততক্ষণে মন বদলে ফেলে। বলে, ‘আমাকে বাড়িতে নামিয়ে যদি তুমি ফেরো, খুব অসুবিধে হবে?’ আমি রাজি হই। শক্তি বলে, আমার বউটা খুব লক্ষ্মী। আমি বড়ো কষ্ট দিই তাকে। তারপর খানিক চুপ করে থাকে।
১৮.
একদিন গেলাম নবনীতা দেব সেনের হিন্দুস্থান পার্কের ভালো বাসা বাড়িতে। ডাক পড়ল তার মা রাধারানী দেবীর ঘরে। ওঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না–বিশাল খাটে শুয়ে ছিলেন। সেই খাটের এক প্রান্তে নবনীতা বসে, সেদিন সে একটু সেজেছে। অদূরে একটা চেয়ারে আসীন তারাপদ রায়। তার পাশের চেয়ারটিতে গিয়ে বসলাম। নবনীতা জিগ্যেস করলো, জানো তো আজ ভাইফোঁটা?’ বললাম, ‘তাই নাকি? সে বললো, ‘তোমাদের দুজনকেই আজ ফোঁটা দেবো।’
