আগেরবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগে থেকেই অ্যামবাসাডরে ঘর সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সুতরাং দুদিন দুরাত হংকংয়ে আরামেই ছিলাম। সেখান থেকে ব্যাংকক। ব্যাংককে এবারে এয়ারলাইনসের অতিথি হয়ে এক রাত হোটেলে কাটিয়ে ঢাকায় ফেরা।
একদিনে বলার মতো কিছু ঘটেনি।
১৭.
ফেব্রুয়ারির শেষে পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখতে গেলাম কলকাতায়। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রধান–সহায়তার হাত বাড়িয়েই রেখেছেন। বিভাগের সচিব ড. তুষারকান্তি মহাপাত্র আবার আমার বন্ধু অনিল সরকারের ঘনিষ্ঠ। তিনি কর্তব্যের অধিক করলেন। বাংলা বিভাগের পাণ্ডুলিপি দেখার সুব্যবস্থা তো করলেনই, উপরন্তু পরামর্শ দিলেন, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সুধাংশু তুঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সুধাংশু তুঙ্গ ‘বাংলার বাইরে বাংলা গদ্যের চর্চা (ষোড়শ-অষ্টাদশ শতক)’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন–সেটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। পরে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করায় তিনি আমাকে কিছু মূল্যবান উপকরণ পাঠিয়েছিলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে করতে বাংলা বিভাগের কোনো কোনো শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ হয়–ক্ষুদিরাম দাস, আশুতোষ দাস, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। আশুতোষ দাস একটু বেশি সময় ব্যয় করেন আমার জন্যে, একদিন বিকেলে নিয়ে যান কলেজ স্ট্রিটে তাঁর প্রকাশকের কাছে–সেখানে বসে সিঙ্গাড়া ও মিষ্টিসহযোগে চা খাওয়া হয়। এতটা যে করেন, সে আমি বাংলাদেশ থেকে গেছি বলে। তিনি পূর্ববঙ্গের লোক, এখানকার প্রতি তাঁর প্রাণের টান রয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথোপযুক্ত মর্যাদা পাননি–তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষ বলে। জিজ্ঞাসা করে যখন জানেন আমার পিতৃপুরুষের ভিটে পশ্চিমবঙ্গে, তখন একটু হতাশ হন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে ‘নব চর্যাপদে’র অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে খানিক নকল করে নিই। সুকুমার সেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে যখন সে-কথা জানাই, তিনি আমার নকল-করা পদগুলি পড়ে শোনাতে বলেন–তাঁর দৃষ্টিশক্তি তখন বেশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আমার মুখে শুনে। পদগুলি সম্পর্কে দু-একটি মন্তব্য করেন তিনি, তবে ঈষৎ ব্যঙ্গের সুরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ সম্পর্কে যা বলেন, তাতে বুঝি, বিভাগের প্রতি তিনি খুবই বিরক্ত। পুরোনো গদ্য নিয়ে আমি কাজ করছি জেনে খুশি হন তিনি, পরামর্শ দেন, আলোচনার সঙ্গে যেন বিশদ উদ্ধৃতি দিই।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেও যাই পাণ্ডুলিপি দেখতে। সেখানে বিশ্বনাথ দে বড়ো সহায়। বলেন, ‘আমাদের এখানে বিদ্যুৎ কখন থাকে, কখন থাকে না, তার ঠিক নেই। আপনি অনেকগুলো পাণ্ডুলিপি চাইবেন–কর্মীরা ওপর থেকে নামিয়ে এনে রাখবে–আপনি নিজের সুবিধেমতো পড়বেন। নইলে পাণ্ডুলিপির অপেক্ষায়ই আপনার অনেক সময় কেটে যাবে। সাহিত্য পরিষদৃগ্রন্থাগারে আলাপ হয় প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে তিনি রবিজীবনীর নতুন কোনো খণ্ডের উপকরণ আহরণ করছেন। কী নিষ্ঠার সঙ্গেই না রবীন্দ্রনাথের কবিতার বইয়ের পাঠের সঙ্গে পত্রিকায় প্রকাশিত পাঠ মিলিয়ে চলেছেন শব্দ ও যতিচিহ্ন ধরে ধরে! পরে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনে পাণ্ডুলিপি যদি পাওয়া যায় তার সঙ্গে মেলাবেন। তাঁর সঙ্গে গল্প করতে মাঝে মাঝে চলে যাই রাস্তা পেরিয়ে অপরদিকের ফুটপাতে–সেখানকার চায়ের দোকানে মাটির ভাঁড়ে চা খাই আর তাঁর কাজের বিষয়ে নানা কথা শুনি।
বরুণ দের সৌজন্যে থাকি সেন্টার ফর দি স্টাডিজ অফ সোশাল সায়েন্সেসের অতিথি-ভবনে। রাত দশটায় সেটার দরজা বন্ধ হয়ে যায়, সুতরাং ফিরতে হয় তার আগেই। একদিন দেরি হয়ে গেল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হায়াৎ মামুদের পিএইচ ডি ডিগ্রিলাভ উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল হস্টেলে তাঁর ঘরে পানাহারের আয়োজন হয়েছে–ঢাকার আলমগীর রহমান, চট্টগ্রামের ভূঁইয়া ইকবাল ও লায়লা জামান, যাদবপুরের নবনীতা দেবসেন, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, সুবীর রায়চৌধুরী, অমিয় দেব, শুদ্ধশীল বসু–এঁরা সবাই আছেন। অতিথি-ভবনের দোহাই দিয়ে আমি যতই উঠতে চাই, কেউ না কেউ আটকে দেন। শেষ পর্যন্ত আড্ডা শেষ হলো। নবনীতা, প্রণবেন্দু, অমিয়, শুদ্ধশীল ও আমি এক ট্যাকসিতে অতিথি-ভবনে এসে দেখলাম, যথারীতি দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কলিং বেল বাজিয়ে কোনো লাভ হলো না। আমার অবস্থার জন্যে শুদ্ধশীল নিজেকেই অনেকটা দায়ী মনে করলো। সে অপরিসীম দক্ষতায় পাচিল টপকে ভেতরে গেল এবং সামনের দরজায় করাঘাত ও তারস্বরে ডাকাডাকি করতে লাগলো। ওপরতলার লোকজনের ঘুম ভেঙে গেল, তারা আলো জ্বালালেন, বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন কী হচ্ছে দেখতে, তারপর ভেতরে চলে গেলেন। আমি ধরেই নিলাম, পরদিন ওঁরা নালিশ করবেন। শেষ পর্যন্ত দরজা খুললো। শুদ্ধশীলের তম্বি শুনে যে দরজা খুলেছিল সে বললো, দশটায় দরজা বন্ধ করে দেওয়া নিয়ম। শুদ্ধশীল। খুবই অপমানিত বোধ করে জানতে চাইলো, কোনো ভদ্রলোক রাত দশটার মধ্যে বাড়ি ফেরে? যাহোক, আমি ঘরে ঢুকতে পেলাম। ওরা চারজন ওই ট্যাকসি নিয়ে চলে গেল।
সবাইকে নামিয়ে শুদ্ধশীল শেষে বাড়ি ফিরবে, এমন ব্যবস্থা। বাড়ির কাছাকাছি যখন এসেছে, তখন ট্যাকসি-চালক শুদ্ধশীলের কাছে তার যা আছে তা দিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। ব্যাপারটা বুঝতে শুদ্ধশীল একটু সময় নেয়–তারই মধ্যে চালক তাকে সতর্ক করে দেয় তার কথা অমান্য করার পরিণাম সম্পর্কে। হৃতসর্বস্ব শুদ্ধশীল বাকি পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে।
