গর্ডন আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘ইউ অ্যাকাডেমিকস ক্যান বি কোয়াইট ট্রাইং।
আমার প্রশ্নের উত্তরে মূল বক্তা এতক্ষণ ধরে কথা বললেন যে, সঞ্চালক তাঁকে থামাতে পারেন না। গর্ডন ফিস ফিস করে বললো, ঈশ্বরের শপথ, যদি তুমি আরেকটা প্রশ্ন করো, তাহলে তোমার টাই দিয়েই গলায় ফাঁস দিয়ে তোমাকে মেরে ফেলব।
সঞ্চালক বললেন, আমাদের হাতে সময় এত কম যে, আর কাউকে মূল কোনো প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করতে বলতে পারছি না। আলোচিত বিষয়ে যদি কেউ কোনো আলোকপাত করতে চান।
কেউ হাত তুললেন না। সঞ্চালক ভাষণ দিতে শুরু করলেন।
প্রায় ছটা বাজে। আমি একটা কাগজে লিখলাম : ইলেভেন্থ কম্যান্ডমেন্ট : দাউ শ্যাল নট হোল্ড সেমিনারস আফটার সি পিএম। কাগজটা গর্ডনের দিকে এগিয়ে দিলাম।
সে বললো ফিস ফিস করে, গলায় ফাঁসের কথা ভুলো না।
সেদিনের মতো কাজ শেষ।
আয়োজকদের হয়ে যে-ছেলেটি আমাকে আনতে গিয়েছিল, তার সঙ্গে দেখা। একগাল হেসে বললো, ইওর প্রিন্স হ্যাজ অ্যারাইভড।
কিছুই বুঝলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের আবার প্রিন্স কে? বলো তো কে এসেছে জাপানে?
সে আরো একগাল হেসে বললো, জাপানে নয়, বাংলাদেশে। তোমাদের প্রেসিডেন্টের পুত্রলাভ হয়েছে।
মনে মনে বললাম, এ তো বড় রঙ্গ, জাদু, এ তো বড় রঙ্গ। গর্ডন ও তার সহকর্মীর সঙ্গে বাকি সন্ধেটা কাটলো।
পরদিন কোনো নির্দিষ্ট অধিবেশনে উপস্থিত থাকার কথা নয়। পছন্দসই এ অধিবেশনে ও-অধিবেশনে টু দিই। যতক্ষণ ভালো লাগে থাকি, তারপর বেরিয়ে আসি। এক জায়গায় হাসান হানাফির সঙ্গে দেখা। তিনি জানতে চান, তুমি কয় মিনিট কথা বলেছ?
বলি, তিন মিনিট, বড়জোর চার।
জিজ্ঞাসা করেন, তোমার ওই তিন-চার মিনিটের কথার জন্য এদের কত খরচ হয়েছে? তোমার প্রতি মিনিট কথার মূল্য কত?
আমি প্রশ্ন করি, আপনি কতক্ষণ বলেছেন?
হেসে বললেন, বড়জোর পাঁচ মিনিট।
ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখছি। কে যেন ‘সার’ বলে ডাকল। দেখি, আমাদের আর্ট কলেজের মাহমুদুল হক।
মাহমুদুল হক জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতে এসেছেন। আমাকে দেখে অবাক। আগাগোড়া শীতবস্ত্রে আচ্ছাদিত আমাকে ঠাহর করতেও সময় নিয়েছে। কিন্তু একবার চেনামাত্রই আতিথেয়তার অদম্য ঝোঁক মাথাচাড়া দিয়েছে। সুতরাং তাঁর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করতে হলো। সেখানে দেখা পেলাম আরেক শিল্পী জামাল আহমেদের। জামালও বৃত্তি নিয়ে ৎসুকুবায়, সেও অতি অতিথিপরায়ণ। ফলে তার ডেরায় গিয়ে তুলিকে কষ্ট দেওয়া অনিবার্য হয়ে দাঁড়ালো।
ৎসুকুবার পাট চুকিয়ে ট্রেনে এলাম টোকিওতে। বলা যায়, আমার পূর্বপরিচিত সন্দীপ কুমার ঠাকুরের সঙ্গে। তিনি শিক্ষকতা করেন ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর ব্যবস্থাপনায় টোকিওতে দু রাত থাকা গেল ইনস্টিটিউট অফ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অতিথিশালায়। রাতে একটু জ্বর-জ্বর ভাব, পরদিন বিকেলে সেটা ছাড়লো। সন্ধ্যার দিকে বের হলাম। রাতে বাইরে খেয়ে ফিরলাম। জ্বরাক্রান্ত ও বহিষ্ক্রান্ত হওয়ার ফলে সন্দীপের সঙ্গে তেমন আড্ডা হলো না।
আমার শ্যালক আজিজ টোকিওর এক বিশেষ দোকান থেকে তার জন্যে টাই কিনে নিয়ে যাওয়ার ফরমাশ দিয়েছিল। সকালবেলায় মেট্রো করে জায়গামতো পৌঁছে সওদা করলাম। সেখানেই বোধহয় মেট্রোর ইংরেজি নির্দেশিকা ফেলে এলাম। ফেরার পথে তাই ভয় করতে লাগলো, ঠিক স্টেশনে নামতে পারব তো! বলা বাহুল্য, স্টেশনে ইংরেজিতে কোনো সাইনবোর্ড নেই, গাড়ির ভেতরে লাইনের যে-চিত্র দেওয়া আছে তাও জাপানি ভাষায়। আমার উলটো দিকের সারিতে এক মহিলাকে মার্কিন বলে মনে হলো। সাহস করে ইংরেজিতে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার গন্তব্য সম্পর্কে কোনো ধারণা দিতে পারবেন কি না। তিনি ধারণা দিলেন এবং যথাস্থানে ফিরে এলাম।
সন্ধ্যায় টোকিও থেকে প্যানামে যাবো হংকংয়ে। বিমানের দরজায় দুজন বিমানবালা অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করছে। তার মধ্যে একজন সহাস্যে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি আজ সকালে মেট্রোতে অমুক স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলে?
বিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি, তুমিই কি আমার উদ্ধারকারিণী?
সে বলে, হ্যাঁ।
মেয়েটি ইউনিফরমে থাকায় তাকে চেনার উপায় নেই। আমার সকালের পোশাকে সামান্য পরিবর্তন সত্ত্বেও সে চিনতে পেরেছে। অবাক হওয়ারই কথা।
বিমানবালা আমার আসনসংখ্যা দেখে রাখল। বললো, বিমান ছাড়লে দেখা হবে।
মেয়েটি সামনের দিকে একটি কেবিনে কর্তব্যরত। বিমান ছাড়ার পরে সে এলো। দু দণ্ড কথা বলে আমার কিছু প্রয়োজন কি না জেনে ফিরে গেল। আমি যখন বললাম যে, তোমার কেবিনে আমার আসন কিংবা আমার কেবিনে তোমার ডিউটি পড়লে ভালো হতো, তখন সে হাসলো। বললো, বিমান নামার আগে আবার আসবে।
সত্যি সে আবার এলো। হংকংয়ে আমি কোথায় থাকবো জানতে চাইলো। বললাম, অ্যামবাসাডর হোটেলে। সে দলেবলে কোথায় থাকবে, তাও বললো। আমার হোটেল থেকে সেটা খুব দূরে নয়।
ক্ষণিকের অতিথির সঙ্গে তার এমন ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিলাম। হংকংয়ে হোটেলে পৌঁছে একবার ভেবেছিলাম, তাকে একটা ফোন করি। তারপর রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টারের মতো মনে এই তত্ত্বের উদয় হলো, জীবনে এমন কত সাক্ষাৎ, এমন কত বিদায় আছে, ফোন করে ফল কী? পৃথিবীতে কে কার!
